Wednesday, December 26, 2018

প্রকৃত মুসলমান কি মিথ্যা বলতে পারে?

বহুদিন আগে কথা প্রসঙ্গে একজন সমাজতন্ত্রী বন্ধুর সঙ্গে বিতর্কর এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, একজন কঠোর স্বৈরশাসক হিসেবে স্ট্যালিনের অপকর্মর প্রতিবাদ করার সাহস কার ছিল বা তার অমানবিক কাজ-কর্মকে বাধা দেবার মত কেউ ছিল কি না? তিনি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন নি। হ্যাঁ, হয়ত বলতে পারতেন তার বিবেকই তাকে থামাতে পারত। কিন্তু বিবেক যখন ঝিমিয়ে পড়ে বা মৃতবৎ হয়ে পড়ে তখন? এই যে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারীকে অন্যায় বা অপকর্ম থামাবার জন্য আসলে কেউ নেই এই দুনিয়ায়। তাই কোন স্বৈরশাসকের মনে যদি পরকালের ভয় বা শেষ বিচারে জবাবদিহির সম্মুখীন হবার ভয় না থাকে তবে তার অন্যায়-অত্যাচার থামাবার মত কেউ থাকে না। ঠিক এ কারনেই একজন মুসলমান অন্যায়-অপরাধ বা অপকর্ম করতে গিয়ে দু’বার ভাবে। কারন সে বিশ্বাস করে যে সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন এবং তিনি তার সকল কাজের হিসাব রাখছেন।
কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মুসলমান আজ আর পাপ-পুণ্য বিচার করে বা হিসাব করে কাজ করছে না। এমনকি ষাটোর্ধ চুল-দাড়ি পাকা মানুষও অবলীলায় সত্যকে মিথ্যা বলছে, দিনকে রাত করছে, রাতকে দিন করছে। ন্যায়-অন্যায় তার কাছে কোন বিষয়ই নয়। তার সকল কাজকর্মর লক্ষ্য অর্থসম্পদ আর ক্ষমতা। তার মনে এতটুকু ভয় নেই যে এই মুহুর্তটিই তার জীবনের শেষ মুহুর্ত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে মহাভারতের একটি কাহিনীর কথা মনে পড়ে। পঞ্চ পান্ডব বনবাসজীবন যাপন কালে একদিন প্রচন্ড পানি পিপাসায় কাতর হয়ে পড়লে পানির খোঁজে বেরুতে হয়। প্রথমে সর্বকনিষ্ঠ ভাই সহদেব গেলেন। অনেক অনুসন্ধানের পর তিনি এক সরোবরের পারে এসে পানিতে নামতে যাবেন; এমন সময় অদূরে দাঁড়ান বকরূপী ধর্মরাজ যম তাকে থামালেন। বললেন তার তিনটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পানি স্পর্শ করলে তাকে পাথর হয়ে যেতে হবে। প্রশ্ন তিনটি শুনে সহদেব বিমূঢ় হয়ে পড়লেন; উত্তর দিতে পারলেন না। কিন্তু তৃষ্ঞায় প্রান ওষ্ঠাগত। তাই বেপরোয়া হয়ে পানিতে নামতেই তিনি পাথর হয়ে গেলেন। এভাবেই নকুল, অর্জুন ও ভীম গেলেন। পরিণতি একই হলো। অতঃপর ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির গেলেন। যে তিনটি প্রশ্ন তাকে করা হলো তার মধ্যে একটি ছিল জগতে সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় কি? যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, ‘প্রতিদিন শত শত লোক মৃত্যু বরন করছে: কিন্তু কেউ-ই মৃত্যু সম্পর্কেএক মুহুর্ও চিন্তা করে না। এটাই কি সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় নয়?’
সত্যিই বড় আশ্চর্য বিষয় যে এই নশ্বর জীবনে মানুষ যা খুশী তাই করছে। তাকে যে যেকোন মুহুর্ত পরলোকে পাড়ি দিতে হতে পারে এবং তাকে শেষাবধি সেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সকল বিচারকের বিচারক মহাবিশ্বের প্রতিপালকের সমক্ষে জবাবদিহি করতে হবে এ কথা তার মনেই পড়ে না।
 এই দেশে নাকি জনসংখ্যার ৮৫% মানুষ মুসলমান। আর একজন মুসলমানকে পরকালে বিশ্বাস করতে হয়; শেষ বিচারের দিনে জবাবদিহি করার বিষয়ে বিশ্বাস করতে হয়। তাই যখন চুলদাড়ি পাকা মুসলমান অবলীলায় মিথ্যা বলে, রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে, অন্যায়কে আর অন্যায় বলে মনে করে না তখন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেতে হয়। এই-ই কি মুসলমানের ফিতরাত? ভেবে পাই না।

Tuesday, December 18, 2018

দেশ কি রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে?

পরের জন্য গর্ত খুড়লে যে নিজেই তার মধ্যে পড়তে হয় এটা এদেশে সুপ্রসিদ্ধ প্রবাদ হলেও আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠি তা মনে রাখার গরজ বোধ করে না। উদাহরন খুঁজতে বেশী দুর যেতে হবে না। এই সাম্প্রতিককালেই দেখুন বিএনপি নানা কারিগরি করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে গিয়ে পুরো তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই যে কার্যতঃ পন্ড করে ফেলেছিল এবং তার খেসারত তাদেরকেই সবচেয়ে বেশী দিতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে তা কি সবাই দেখতে পাচ্ছে না? আজকের ক্ষমতাসীনরাও যে সব কারুকার্য করে সংবিধানে তাদের পছন্দমত বিষয়াদি সংযোজন করেছে তা ক্ষমতার পাশা পাল্টালেই যে তাদেরকেই যাঁতাকলে ফেলবে তাতে কারো সন্দেহ থাকার কোন অবকাশ আছে? যেভাবে সবকিছু দলীয়করন করে লেজেগোবরে করে ফেলা হয়েছে, পাশার দান উল্টে গেলে কি হতে পারে সেটা ভেবেই হয়ত তারা লাখ লাখ লোক মারা যাবে, রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে ইত্যাকার আতংকজনক বাক্যাবলী ব্যবহার করছেন। কিন্তু কেন? যে সব দেশ সত্যিকার গনতন্ত্র লালন করে সেই বৃটেন, আমেরিকা বা ইউরোপের প্রাক্তন ও বর্তমান শাসকেরা তো সব সময়্ই একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে ফটো তোলেন, হাসি-তামাশা করেন, উৎসব অনুষ্ঠানে যোগ দেন। কৈ, তারা তো পরষ্পরের বিরুদ্ধে সর্বদা হাতা গুটিয়ে খাড়া থাকেন না। তো আমাদের দেশে এ অবস্থা কেন? আমরা বেশী সভ্য বলে? নাকি আমাদের চেতনার বাক্স একেবারে ভরভরন্ত বলে? বিশ্বে যে সব দেশ প্রকৃত উন্নয়ন করেছে, জনকল্যানমুলক রাস্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেছে, তারা একটা বিষয়ে সর্বদাই কঠোর থেকেছে। আর সেটা হচ্ছে দুর্নীতি বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং আইনের সঠিক ও নির্মাহ প্রয়োগ। কিন্তু অতীব দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশেএই দুটি বিষয়ে সবচেয়ে বেশী হেলাফেলা করা হয়েছে; সবচেয়ে অন্যায় করা হয়েছে। আর এর তিক্ততম ফল আমাদেরকেই ভোগ করতে হচ্ছে। অনেকেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন হচ্ছে বলে বগল বাজালেও যে উন্নয়নের দাম হাজার টাকা তা লাখ টাকায় সম্পাদিত হচ্ছে। সকল মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য জরিপে উঠে আসছে যে দারিদ্রসীমার নীচে এখনো ১৩% - ১৫% মানুষ: আয় বৈষম্য প্রকটতর এবং আইনের শাসনের ক্ষেত্র অতি বন্ধুর। গত দশ বছরে নাকি দেশ থেকে ছয়লক্ষ কোটি টাকারও বেশী বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। বিদেশী ও দেশী বিনিয়োগের এমনই হাল যে দেশে নাকি প্রায় দেড় কোটি শিক্ষিত (?) তরুন-তরুনী বেকার। এমনকি দেশ থেকে হাজার হাজার নারী কর্মী বিদেশে ‘রপ্তানী’ করে রেমিটেন্সের বদলে নতুন পপুলেশন ও আনা হচ্ছে। এ-ই যদি হয় স্বাধীনতার আটচল্লিশ বছরের পরের অবস্থা, তাহলে এই স্বাধীনতার প্রকৃত মুল্য কত? দেশের মানুষের এসব কথা ভাবার কি সময় এখনো হয় নি? এভাবে চলতে থাকলে আগামী একশ’ বছরেও কি আমরা প্রকৃত উন্নত দেশ হতে পারব?

Tuesday, December 4, 2018

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা

তিনি (শিক্ষামন্ত্রী) বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী কতটা অপমানিত হলে, কতটা কষ্ট পেলে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেয়? যে ঘটনাগুলো আমরা শুনছি, এর পেছনের কথা শুনছি, ঘটনার পেছনে বা ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ --- তবে যদি বলা হয় যে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেবার ব্যপারে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের ব্যর্থতা ও অবহেলার কারনেই বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে তবে হয়ত সবাই ভুরু কোঁচকাবেন। কিন্তু এরকম ট্রাজেডির জন্য অভিভাবকদের দায়ও কম নয়। এর আগে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বলেছিলাম যে উন্নত দেশগুলোর মত অন্ততঃ সেকেন্ডারী লেভেলে খানাভিত্তিক এন্ট্রি বাধ্যতামুলক করা যাতে মোহাম্মদপুরের শিক্ষার্থীদেরকে উত্তরা বা পল্টন অথবা উত্তরা/পল্টনের শিক্ষার্থীদেরকে মোহাম্মদপুর আসতে না হয়। জনাব এন,আই, খান সাহেব সচিব থাকাকালেও এই প্রস্তাব রেখেছিলাম। কিন্তু সেটা করার সুবিবেচনা বা সাহস (?) সরকারের হয় নি। কেন, তা সরকারই ভাল বলতে পারবে। অভিভাবকগনও বিশেষ কোন স্কুলে বাচ্চাদের ভতির জন্য উন্মাদ হয়ে পড়েন। কেন এই পাগলামি? তারা যদি নিজ নিজ এলাকায় বাচ্চাদের ভরতি করেন তো আরো অনেক স্কুল ভাল হয়ে গড়ে উঠতে পারে। কারন যে স্কুল ৫০০০/৭০০০ ভরতিচ্ছুদের মধ্যে ৫০০ জন ভরতি করে, তারা কি করে ভাল স্কুলের তকমা পায়? অথচ কোন স্কুলের এক থেকে দশম স্থান লাভ করা ছাত্রছাত্রীরা সেই স্কুল ছেড়ে ভাল (?) স্কুলে ভর্তী হয় আর সেই স্কুল গড়পড়তা মানের ছাত্রছাত্র নিয়ে খারাপ স্কুলের তকমা পায়। তথাকথিত ভাল স্কুল থেকেও তো অনেকে এ+ পায় না। তাহলে তারা কি আশায় ভাল (?) স্কুলে ভর্তী হয়? এই দেশের দুর্ভাগ্য হচ্ছে যে সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে কারো সাহস বা আগ্রহ কোনটাই হয় না। অথচ তারা বড় বড় কথা বলতে কোন বিবেকদংশন বোধ করেন না।
অথচ বাচ্চাদের ভর্তী করতে অভিভাবকদের যে প্রানান্ত দৌড়ঝাঁপ এবং তার প্রেক্ষিতে শহরে যে যানজট, তার অনেকটাই কমে যেত যদি অন্ততঃ থানাভিত্তিক ভর্তীর বাধ্যবাধকতা থাকত। এর ফলে শহরে একাধিক ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারত। শিক্ষার একাডেমিক পরিবেশও ভাল হতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে উন্নত বিশ্বের উদাহরন টানতে কর্তাব্যক্তিদের ভুল না হলেও তাদের ভাল কাজগুলো দেশে অনুসরন করতে তাদের বড়ই অনীহা। এরাই নাকি আবার উন্নত দেশ গড়বে! হাহ!

Monday, October 8, 2018

আইন বিভাগ কি সন্ত্রাসী, অপরাধী বানানোর ফ্যাক্টরী?

এ প্রশ্নে অনেকেই ভ্রু কোঁচকাবেন। অনেকেই বিরূপ মন্তব্যও করতে পারেন। কিন্তু বিষয়টির একটু গভীরে গেলে যা দেখা যায় তার সাথে বাস্তবের কতটুকু মিল, তা বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে।
এই সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ অনেকেই বিনা বিচারে ১০/১২ এমন কি ১৪/১৫ বছর ধরে জেলে আছেন। সম্প্রতি এরকম একজনকে সদাশয় মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের হস্তক্ষেপে জেলমুক্ত করা হয়েছে। জীবনের সুবর্ন সময় জেলে কাটিয়ে আজ যদি এই লোক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে ওঠে তবে এর জন্য দায়ী হবে কে? একজন খুনী খুন করে হাজতে গেল। দেখা গেল ২/৪ দিনের মধ্যেই সে জামিনে বেরিয়ে এসে তার বিরুদ্ধে মামলাকারীকে বা সাক্ষীকে খুন করে ফেলল। হয়ত এতে তার কঠোর সাজা হবে (অথবা আবারো সে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে সাক্ষীর অভাবে) তখন নিহত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন যদি প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে ঐ খুনীকে খুন করে ফেলে তবে এই সব খুন-খারাবীর দায় কার ঘাড়ে চাপানো উচিৎ?
আজকের দৈনিক প্রথম আলোর এক খবরে প্রকাশ একজন নিরীহ কিশোরকে থানায় নিয়ে খুন করে ফেলার পর নানা অজুহাতে সেটাকে ক্রসফায়ারে হত্যা বা আরো নতুন কোন অজুহাত বের করে মামলাকেই ভিন্ন খাতে নেওয়া হয় নি, মামলার বাদী নিহত কিশোরের মা-সহ তার পরিবারকে প্রচন্ড ভয়ভিিত দেখিয়ে সেই মামলা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। বাদী এখন একমাত্র আল্লাহতায়ালার কাছে বিচার চাওয়া ছাড়া আর বিকল্প খুঁজে পান নি। খুনের মামলায় নাকি রাস্ট্র বাদী হয়। খুনের মামলাকে নাকি কোনভাবেই ধামাচাপা দেওয়া যায় না। তাহলে নামকাওয়াস্তে তদন্ত কমিটি করে যে নৃশংস খুনের এই মামলাটিকে আদালত বাতিল করে দিল তাতে কি বিচারের বানী হাসছে না কি নিরবে কাঁদছে? এই বাদী যদি অর্থে-বিত্তে শক্তিশালী হতো তবে কি বিচারের নামে এরকম অবিচার সম্ভব হতো? আদালতে ন্যায়বিচার না পেয়ে বাদী যদি পাল্টা একটা খুন করে ফেলত তবে তাকে কি আইন কঠোর দন্ড দিত?
জমাজমি নিয়েও বিচারের নামে চরম অবিচার চলে আসছে। একজন জমির মালিক যে পুর্বপুরুষের আমল থেকে ৬০/৬৫ বছর কোন এক টুকরো জমি ভোগ-দখল করে আসছে, হঠাৎ দেখা গেল একজন কোথা থেকে জাল দলিলাদি বের করে তাকে গায়ের জোরে উৎখাত বা বেদখল করে ফেলল। সেই ব্যক্তি আদালতে গেল। কিন্তু ট্যাঁকের জোর না থাকায় সে মামলায় হেরে গিয়ে পিতৃপুরুষের জমি থেকে চিরতরে উৎখাত হয়ে গেল। এখন সে ন্যায় বিচার বঞ্চিত হয়ে যদি ঐ জবরদখলদারকে খুন করে ফেলে তবে কার উপরে এই খুনের দায় চাপানো হবে?

এরকমভাবে এই দেশে আইনের মাধ্যমে অপরাধের যথাযথ প্রতিকার না হওয়ায় খুন-জখম, নির্যাতন-ধর্ষণ ইত্যাদি যে বেড়ে গেছে একথা সবাই স্বীকার করেন। কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থায় মারাত্মক ত্রুটি থাকার কারনে অপরাধীদের অধিকাংশ, বিশেষ করে যাদের অর্থকড়ির জোর কম, তারা ন্যায় বিচার পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই একথা বললে হয়ত অত্যুক্তি হবে না যে আমাদের আইন-আদালত সজ্ঞানে হোক আর যেভাইে হোক, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী বানানোর ফ্যাক্টরীতে পরিণত হয়েছে।

দেশের উন্নয়ন ও নেতৃত্ব

একটি দেশকে প্রকৃত উন্নতির দিকে টেনে নিতে সেই দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে অবশ্যই একাধিক গুনের অধিকারী হতে হয়। সে সব গুনের মধ্যে সর্বপ্রথম দেশপ্রেম, তারপর সততা, দুরদৃষ্টি এবং কঠোর সংকল্প গ্রহন ও তা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। এ ছাড়াও দরকার জ্ঞান ও দক্ষতা এবং ঠিক ব্যক্তিকে ঠিক জায়গায় বসানোর মত অন্তর্দৃষ্টি। যে সব দেশের নেতৃত্বে মধ্যে এসব গুন নেই তাদের দ্বারা দেশের উন্নয়নের বদলে গোষ্ঠিস্বার্থ ও পকেটস্বার্থ উন্নয়নই কেবল সম্ভব। যেসব নেতৃত্ব উপরোক্ত গুনের অধিকারী তাদের দ্বারা দেশ বড় জোর ১৫/২০ বছরের মধ্যেই উন্নতি লাভ করেছে। যে দেশের সে সৌভাগ্য হয় নি তারা আমাদের মতই অর্ধ শতাব্দী ধরে মার্ক টাইম করে যাচ্ছে। কিন্তু তারই আড়ালে বিদেশে সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া ইত্যাদিও গড়ে উঠছে। এটা কিভাবে সম্ভব? তা আমাদের দেশের উদ্াহরন দেখলেই বোঝা যাবে। কথাটা একটু কর্কশ শোনালেও সত্যি হচ্ছে এই যে আমাদের দেশের রাজনীতিতে ’চোঙা ফোঁকা’ নেতাদেরই জয়জয়কার। গলাবাজিতে যে যত দক্ষ সে ততটাই বড় রাজনীতিক। নিজেদের দায়িত্ব তারা কতটা পালন করেছেন বা করছেন সেটা বলার আগে তারা বিরোধী পক্ষকে ধোলাই করতেই ব্যস্ত থাকেন। তাদের বক্তৃতায় সেই তিন চার দশক আগের বাক্ধারা ও শব্দাবলীর হুবহু ব্যবহার দেখা যাবে। তাদের নতুন কোন চিন্তাভাবনা বা দেশ গড়ার কাজে দলের কর্মীদেরকে নতুন কোন দিকনির্দেশনা দেবার দরকার পড়েনা। দল ঠিক রাখার জন্য তারা কর্মীদের যাবতীয় অপকর্মকেও নজরআন্দাজ করে থাকেন। খুবই বড় মাপের একজন তো বলেনই যে তার দল ক্ষমতায় থাকলে কর্মীরা ’কিছু’ পায়। এর ফলে দেখা যায় যে দেশ কিছু পাক না পাক, তার দলের নেতা-কর্মীরা প্রতি বছর তাদের সম্পদ ৩/৪ গুন বাড়িয়ে ফেলেছে। পাঁচ বছরে তাদের অনেক নেতার সম্পদ ২৫০ থেকে ৩০০ গুন বেড়েছে বলে একাধিক সংবাদে প্রকাশ। কিন্তু দেশের উন্নতি ঘটতে অর্ধ শতাব্দী লেগে যাচ্ছে। হয়ত অনেকে বলবেন যে তারা ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় ছিলেন না। কিন্তু অন্য দল ক্ষমতায় আসলেই দেশ পিছিয়ে পড়ে কেন? কারন তারাও তো একই গুরুর শিষ্য। তাদেরও তো ফিলসফি একই। ’নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকীর খাতায় শুন্য থাক, দুরের বাদ্য লাভ কি শুনে মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক।’ মহাকবি ওমর খৈয়ামের এই অমর কবিতাই তো তাদের আদর্শ। সে কারনেই নানা রকম ’ভবন’ ইত্যাদি গজিয়ে ওঠে আর অদৃশ্যভাবে প্যারালাল সরকারও কাজ চালায়। তাই এই দেশে বারবার ক্ষমতার হাত বদল হলেও দেশ এগিয়ে না গিয়ে কেবল পিছিয়েই যায়। কারন নতুন কিছু করবার যোগ্যতা বা দক্ষতা যেখানে অনুপস্থিত সেখানে মার্ক টাইম করা ছাড়া তো অন্য কিছু আশা করা যায় না। এ কারনেই দেখা যায় দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু দেশে উচ্চশিক্ষিত (?) বেকারের সংখ্যা ২২/২৩ লাখ। আর দক্ষ লোক বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। একটি সংবাদে প্রকাশ দেশের নাগরিক প্রবাসীরা ২২ জন যা আয় করে মাত্র একজন বিদেশী দক্ষ (?) লোক তা নিয়ে যায় দেশের বাইরে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ পাওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৯%-১০% কৃতকার্য হয়। উন্নয়ন কাজের ঢাক জোরেশোরে বাজান হয় কিন্তু এক বছরের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয় না; হাজার টাকার প্রকল্প লাখ টাকা খেয়ে ফেলে। দালান-কোঠা নির্মানে রডের বদলে বাঁশ দেওয়া হয়; রাস্তায় বিটুমিনের বদলে পোড়া মবিল দেওয়া হয়; মানসম্মত ইট-সিমেন্টের বদলে ৩নং ৪নং জিনিস ব্যবহার করা হয় যার ফলে নির্মানাধীন ভবনও শ্রমিকদের মাথার ওপর ধ্বসে পড়ে। কিন্তু এরই বিপরীতে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ, সোনা লুট-লোপাট হয়ে যায় নানাভাবে, বাংলাদেশ বিমানের ৭২০ টাকা চুরি, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে প্রায় সোয়া দুইশ’ কোটি টাকার কয়লা চুরির বিপরীতে বিদেশে সেকেন্ড হোম বেগমপাড়া বানানো হয়, সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমে ওঠে। ওদিকে বছরে বার মাসে তের পার্বনের মত অমুক সম্বর্ধনা তমুক অভিনন্দনের প্রতিযোগীতা, তমুক দিবস পালন ইত্যাদির মহা আড়ম্বরে জনগনের দৃষ্টিকে প্রকৃত সত্য থেকে আড়াল করার যাবতীয় আয়োজন চলতে থাকে।
উপরোক্ত কথাগুলিতে হয়ত অনেকেই ক্ষুব্ধ বোধ করতে পারেন। বলতে পারেন দেশে অনেক উন্নয়নই তো হয়েছে। উড়ালপথ হয়েছে; বেশ কিছু রাস্তাঘাট হয়েছে; বড় বড় স্থাপনা হয়েছে ইত্যাদি। নিশ্চয়ই হয়েছে এবং সে জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কত টাকার কাজ কত টাকা লাগাচ্ছে? কত বছরের উন্নয়ন কত বছর খেয়ে ফেলছে? যেখানে আমাদের অনুšনত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তকমা পেতেই তিন চার যুগ পার হয়ে যায় সেখানে উন্নত দেশ হতে আর কতদিন লাগবে? আমাদের অর্থের অভাব আছে এটাতো সত্য নয়। নইলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কিভাবে বলতে পারেন যে ’চার হাজার কোটি টাকা কিছুই নয়?’ কিভাবে সম্ভব যে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা ব্যক্তিকে দুদক চায়ের দাওয়াত দিয়ে আদর-আপ্যায়ন করে? সংসদে দাঁড়িয়ে শেয়ার বাজার কেলেংকারীর বা রাস্ট্রীয় ব্যাংক থেকে আটশ’ কোটি টাকা চুরির নাটের গুরুদের নামও উচ্চারন করতে পারেন না মাননীয় অর্থমন্ত্রী? অথচ তিনি নানা রঙের কর শুল্ক ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যপক জনগনকে দুয়ে ছাড়ছেন যদিও সেই টাকার যে বেপরোয়াভাবে নয়ছয় ঘটছে সে জন্য জবাবদিহিতার কোন ধারই ধারছেন না।
তাই দুঃখের সাথে বলতে হয় যে কেবল নেতা হলেই দেশের উন্নয়ন করা যায় না। বড় বড় অনলবর্ষী বক্তা হলেও দেশের প্রকৃত কোন লাভ হয় না যদি না সেই নেতার মধ্যে সর্বোপরি সবার উপরে দেশপ্রেম না থাকে। সততায়, সংকল্পে অটলতা, কার্য সম্পাদনে নিষ্ঠা ও দৃঢ়চিত্ততা না থাকে তবে সে নেতৃত্ব যতই আপাতঃ জনপ্রিয়তার দাবীদার হোন না কেন, তার কাছ থেকে দেশ আসলেই টেকসই কিছু পায় কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।

গণপূর্ত অধিদফতরে বদলি আতঙ্ক

গণপূর্ত অধিদফতরে বদলি আতঙ্ক--অভিযোগ ওঠেছে, এসব বদলির বেশির ভাগই হচ্ছে আর্থিক লেনদেনে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের মেয়াদ সরকারের মেয়াদের সাথে সাথেই (ডিসেম্বর) শেষ হচ্ছে। যে কারণে, প্রধান প্রকৌশলী মো: রফিকুল ইসলাম বাণিজ্য করে নিজের পকেট ভর্তি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে থাকা কর্মকর্তাদের ঢাকায় বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়ে আসা হচ্ছে। আবার অনেকের পোস্টিং দিচ্ছেন তাদের পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রিপাড়া, সংসদ, গণভবন, বঙ্গভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। আর এসব পদ ফাঁকা করতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কর্মরতদের সরিয়ে দিচ্ছেন অন্যত্র। শুধু টেন্ডারে অনিয়ম ও জালিয়াতি করেই তিনি সরকারের কয়েক শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপরের সংবাদ প্রতিবেদনের অংশবিশেষ আজকের দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত হয়েছে। ঐ প্রতিবেদনেই প্রকাশ এই রমরমা দুর্নীতির কায়কারবার কেবল আজকারের নয়, বেশ অনেক দিন থেকেই চলছে। প্রশ্ন জাগে, এই গনপূর্ত ভবনটি তো দুদক-এর দপ্তর থেকে হাজার মাইল দুরে নয়। তাহলে এখানে এই যে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে এ বিষয়ে তারা কি কেবল ঘুমিয়েই আছেন নাকি ভান করে আছেন? দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজধানীরই একটি দপ্তরে দুর্নীতির মচ্ছব চলবে আর তারা তাকে পাশ কাটিয়ে কবিরোধী দলের কে ছোটখাট দুর্নীতি করছে তার পেছনে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে এটা একটা স্বাধীন গনতান্ত্রিক দেশে, যেখানে সরকার গর্ব করে বলে যে এখানে 'আইনের শাসন বহাল আছে, - সেখানে চলে কিভাবে? দেশে কি দুর্নীতির মচ্ছব এবাবেই চলবে? লাখো কোটি টাকার খান খেলাপীদেরকে কিছু বলা যাবে না। লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার কারীদের কিছু করা যাবে না। এভাবেই দেশ চলবে? এর পরও ভাবতে হবে দেশ ঠিক ভাবেই চলছে?

তারা মানুষকে আর মানুষ মনে করে না।

রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেছেন, ‘এ দেশের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, বড় বড় আমলা, বিচারপতি পুলিশের আইজি, সেনাবাহিনী প্রধান, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারী, কেবিনেট সেক্রেটারী, সচিব এবং এই ধরণের যারা আছে তারা একটু বড় হইয়া গেলে, নামিদামি হয়ে গেলে, মানুষকে আর মানুষ মনে করে না। এটা একদম ঠিক না। মানুষকে মানুষ মনে করতে হবে এবং জনগনের প্রতিনিধি যারা তাদেরকে আরো বেশি মানুষকে মানুষ মনে করতে হবে। কারণ জনগনের ভোটেই তারা প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। জনগনের ভোটে প্রতিনিধি হইয়া তাদের উপরেই আবার মাতাব্বরি দেখাইবা বেডাগিরি দেখাইবা এটাতো হতে পারে না। জনগনের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে।’ --- দৈনিক নয়া দিগন্ত। মহামান্য রাসট্রপতির এসব কথার সাথে নীতিগতভাবে দ্বিমত করার কোন সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে কারা জনগনকে পরোয়া করবে? তাদেরকে মানুষ মনে করবে? যারা মনে করেন যে ক্ষমতায় আসার জন্য পাবলিকের ভোট তাদের না হলেও কোন সমস্যা নেই, যারা মনে করেন যে পাবলিকের টাকায় বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা আকন্ঠ ভোগ করলেও তারা তাদের প্রজা ছাড়া আর কিছু নয়, তারা জনগনকে মানুষ মনে করবেই বা কেন? মহামান্য রাস্ট্রপতি এই যে সদ্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিলে স্বাক্ষর করলেন, এর বিরুদ্ধে জনমতকে তিনি কি যথাযথ গুরুত্ব দিতে পেরেছেন? তাকেও তো এক ধরনের 'লাইনে' পড়েই নিশ্চয়ই ঐ বিলে স্বাক্ষর দান করতে হয়েছে। জনগনের আবেগ অনুভুতি বা আপত্তি কোন গুরুত্বই পায়নি। তাই এদেশে বলা সহজ অনেক কিছুই, কিন্তু তার বাস্তব রুপ দেওয়াটা খুবই কঠিন। কারন আমাদের মনমানস সে রকমই যেমন সেই আবু হোসেনের এক দিনের খলিফাগিরি-তে দেখেছি। গরীব আবু হোসেনের পুর্বের অবস্থা ভাল থাকলেও প্রচুর অপব্যয় তাকে গরীবই করে ফেলেছিল। অনেক আক্ষেপ করে সে বলছিল একবার খলিফা হতে পারলে সে অনেক কিছুই করতে পারত। খলিফা হারুনুর রশীদ তাঁর নিয়মিত নৈশভ্রমনকালে আবু হোসেনের এই উক্তি শুনে তাকে কৌশলে প্রাসাদে নিয়ে আসেন। তাকে একদিনের জন্য খলিফা হিসেবে ক্ষমতা দান করেন। আবু হোসেন ভাবতেই পারেনি এরক কিছু হতে পারে। রাত্রে সে জাগ্রত হয়ে তার কামরা ও তার চাকচিক্য আসবাব ইত্যাদি দেখে তার মাথা বিগড়ে যায়। সে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। তার উন্মাদের মত কোপাকুপিতে বিছানার গদী, বালিম, ঘরের পর্দা ইত্যাদি কেটে যা তা অবস্থা হয়ে যায়। এই যে অবস্থা, এটার সাথে আমাদের 'হঠাৎ-নবাবদের' কি খুব বেশী গরমিল আছে?হঠাৎ-নবাবেরা তাদের 'মেন্টাল ব্যালান্স' ঠিক রাখতে পারেনা। তাই তাদের কাছে ন্যায় ও ৗচিত্যবোধ আশা করা যায় না।

Friday, September 14, 2018

প্রশ্নফাঁসের এই মহোৎসবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং নীতিহীন চরিত্রহীন কুশিক্ষিত একটি শ্রেনী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। তবে এজন্য কেবল এরাই দায়ী ভাবলে বড় ধরনের ভুল হবে। পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র বা এমসিকিউ জাতীয় প্রশ্নপত্র এর আগেও তো ছিল। কিন্তু এখনকার মত মহামারী তো ছিল না। তাহলে এই ধ্বস নামার কারন কি? এই বাংলায়ই একটা প্রবাদ আছে। ’রাজার পাপেতে হয় রাজ্য ছারখার; সুখ নাহি থাকে প্রানে রায়েত প্রজার।’ বিগত ১২/১৪ বছর ধরে এদেশে বিপুল অংশের মানুষের মধ্যে যে নৈতিকতার যে দুর্ভিক্ষ ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যপকতর হয়েছে তা ধারাবাহিক কু-শাসন ও অপশাসনের ফলশ্রুতিতেই ঘটেছে। নীতি-নৈতিকতা ও মুল্যবোধের বিকল্প কোন ধরনের চেতনা বা ্েশ্লাগানের গালভরা বুলি হতে পারে না। ’বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ই হোক আর ’বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ই হোক, নীতি-নৈতিকতা ও মুল্যবোধের ব্যাপারে এর কোন প্রভাব যে এই সমাজে পড়েনি সেটা সাদা চোখেই দেখা যায়। নইলে ক্রমাগত ধারাবাহিকভাবে দেশটি দুর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড করতে পারত না। যারা এখন ’গনতন্ত্র নাই’ বলে বুক চাপড়াচ্ছে, তারা তাদের সময়ে পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের যে প্রশংসনীয় কাজটা করেছিল, পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনীতির পাঁক ঢুকিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। গনতন্ত্রকে ভয়াবহভাবে ঝুঁকিগ্রস্থ করার জন্য বিজয়োৎসবকে প্রতিপক্ষকে হামলার শিকারে পরিনত করা, গ্রেনেড হামলা চালানোকে ঠাট্টার বিষয় বলে ভাবা, মারাত্মক অস্ত্র পাচারে প্রশ্রয় দেওয়া, বিশেষ ভবনের মাধ্যমে প্যারালাল সরকার চালানো ইত্যাকার কর্মকান্ডকে ’নজরআন্দাজ’ করেছে। অবশেষে তত্বাবধায়ক সরকারের অস্তিত্বকেই নানা অপকৌশল করে চরমভাবে ভংগুর করে দিয়েছে। অপরদিকে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা পেয়েই বিশেষ বিশেষ চেতনার নামে ক্রমাগত জাতিকে বিভক্ত করে নানা রকম অপশাসনের দৃষ্টান্ত এমনভাবে রেখেছে যে গত ৮/৯ বছরে কয়েক লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুট, গুম-খুন, নিষ্ঠুরভাবে প্রতিপক্ষকে দমন রাস্ট্রের বিভিন্ন বিভাগকে চরমভাবে দলীয়করন ইত্যাদির মাধ্যমে একটা বিশেষ শ্রেনীকে আংগুল ফুলে বটগাছ হবার সুযোগ করে দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ কেবল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে বিনাপুঁজির ব্যবসাকেন্দ্র ও সাথে সাথে রাজনীতির মল্লযুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে একদিকে যেমন গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে ছ্যারাবেরা করে ফেলা হয়েছে, তেমনি শিক্ষদের মধ্যে নৈতিকতা ও মুল্যবোধেরও কবর রচনা করা হয়েছে। নীতিহীন চরিত্রহীন মানুষ জাগতিক উন্নতিকেই জীবনের মুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে যে কারনে ঘুষ-বানিজ্যের মাধ্যমে হোক আর প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমেই হোক, আর খাদ্যে ভেজাল দিয়েই হোক বা মুনাফাখোরী সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই হোক - মোট কথা যেন তেন প্রকারেন রাতারাতি পকেট ভারি করতে যা কিছু করা দরকার তা-ই করা হচ্ছে। আর এসব করতে একটা শ্রেনী যার মধ্যে উঁচু মানের ডক্টরেট ডিগ্রীধারী থেকে স্কুল-কলেজে পাঠরত শিক্ষার্থী, মুদী দোকানী থেকে শিল্পপতি কেউ পিছিয়ে নেই। এসব কিন্তু দু’একদিনে হয়নি। কিন্তু একদল দলকানা আঁতেল বিশেষ বিশেষ চেতনার নাম নিয়ে ক্রমাগতভাবে এইসব অপকর্মের চুলায় ফুঁ মেরে এসেছেন। আজ যখন চুলোর আগুন চালে ধরেছে তখন তারা নানা নোসখা বাতলাচ্ছেন। শিক্ষানীতি প্রনয়নের সময়েও দেখা গেছে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষার মুল বিষয়গুলোকে কিভাবে অবহেলা করা হয়েছে। কোন ধর্মই যে ভিন্ন ধর্মকে অবজ্ঞা করে না বা কোন ধর্মেই যে খারাপ কাজকে সমর্থন করে না সেটা জানা সত্বেও তথাকথিত প্রগতিশীলতার নামে জাতীয় ও সমাজ জীবনে ধর্মের প্রভাবকে সনিষ্ঠভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছে। অন্য দিকে ’ডিজিটাল’ ’ডিজিটাল’ বলে দেশকে উথাল পাথাল করার বাতিক চললেও সকল কাজে আঠার মাসে, এমনকি চব্বিশ মাসে বছরের এনালগ সিস্টেম ঠিকই চলছে।


তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখে টোটকা ব্যবস্থা নেবার কোন সুযোগ নেই; আর নিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। বরং টপ-টু-বটম নতুন করে দেশপ্রেম ও নীতি-নৈতিকতাকে আরো বহুগুন দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। এবং বর্তমান সরকারী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সকল প্রকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিহাদ ঘোষনা করেছিল তার প্রকৃত ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। নইলে কেবল প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, কোন ক্ষেত্রেই এই জাতির ভবিষ্যত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পরিনতি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।।

Thursday, July 26, 2018

দেশে মামলাজট

দেশে মামলাজট বলে একটা কথা বহুল প্রচলিত হয়েছে। বর্তমানে জটবদ্ধ মামলার সংখ্যা নাকি চৌত্রিশ লক্ষ। এই জটবদ্ধ মামলার ৮০% নাকি জমিজমা সংক্রান্ত। তবে কেন এই জটের সৃষ্টি হয়েছে তা পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় এর বিরাট অংশ একশ্রেনীর মামলাবাজ ব্যক্তি, উকিল, এবং পেশকারের অর্থলোভ এবং ক্ষেত্রবিশেষে খোদ কিছুসংখ্যক বিচারকের অনভিজ্ঞতা ও অন্যবিধ কারনও এর জন্য দায়ী। আমরা জানি বিচারককে ’বিজ্ঞ’ বলে সম্বোধন করতে হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় এই ’বিজ্ঞ’ কথাটার ভেতরেই বেশ সমস্যা রয়েছে। একটি মামলার মেরিট কতটুকু সেটা আরজি ও তার জবাবের মধ্যেই একজন প্রকৃত ’বিজ্ঞ’ বিচারকের প্রথম দৃষ্টিতেই ধরা পড়ার কথা। কিন্তু দেখা যায় যে যে কোন মামলা আসলেই কোন রকম আপাতঃ পরিবীক্ষণ ছাড়াই দিনের পর দিন সেই মামলার তারিখ দিয়ে মামলাবাজ বাদীকে উতসাহিত এবং উকিল, মুহুরী ও পেশকারকে বিবাদীকে দুয়ে নেবার সুযোগ করে দেওয়া হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় কোন একটি জমিসংক্রান্ত মামলা রুজু হলো সাজানো কারন উদ্ভবের ৩০/৩৫ এমনকি ৬০/৬২ বছর পরে ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে। এই দীর্ঘ সময়ে সেই বাদীর সংশ্লিষ্ট জমির দখল তো দুরে থাক, সিএস, এসএ, আরএস, বিএস - কোন খতিয়ানেই তার নাম নেই, কোন দাখিলা নেই। এই দীর্ঘ সময় পরে হঠাত কোথা থেকে কিছু বানানো কাগজপত্র নিয়ে মামলা রুজু করা হয়েছে। এরকম মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে আর এর মধ্যে অনেক বাদী বা বিবাদী মারা গেলেও সেসব মামলার সুরাহা হয় না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদেরকে নতুন করে মামলার পক্ষ করে তা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবেই মামলার জট জমে ওঠে। বিচারক বদলী হয়ে যান, হয়ত উকিলও মারা যান; কিন্তু তাদের উত্তরসুরীরা সেই মামলা চালাতেই থাকে। আবার এমনও দেখা যায় যে কোন একটুকরো জমির একবার নাম ও জমা খারিজ হবার পর ৮/১০ বছর খাজনা ইত্যাদি দেবার পর হঠাৎ কিভাবে যেন একরকম ভৌতিকভাবেই সে জমির দাগ-খতিয়ান, চৌহদ্দী বা পরিমান বদলে গেল প্রকৃত মালিকের অজ্ঞাতসারে। কিংবা কানুনগো বা জরিপকারীর ভুলে - তা সে ইচ্ছাকৃতই হোক আর অনিচ্ছাকৃতই হোক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয় সেটাও বাস্তব সত্য), সে ভুল সংশোধন করার সহজ বা সুলভে কোন সমাধান নেই। এর জন্য দীর্ঘকালীন মামলায় জড়িয়ে থাকতে হবে, যা অবিশ্বাস্য সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। হ্যাঁ, ভুল হতেই পারে; কিন্তু সে ভুল সংশোধন করার পদ্ধতি এতই জটিল যে সে ধরনের মামলাও মামলাজটের অন্যতম কারন হয়ে থাকে।
এসব বিষয় যদি আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বের সাথে বিচেনা করা না হয়; যদি প্রকৃত যৌক্তিক কারন ছাড়াই দিনের পর দিন সেই মামলার তারিখ পড়তে থাকে আর সেই মান্ধাতার আমলের আইন দিয়েই এসবের বিচারের (?) সিলসিলা চালু থাকে তবে চলমান মামলাজট কমানোর কোন প্রচেষ্টাই সফল হবে বলে মনে হয় না। মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয় যদি এ ব্যপারে একটু দৃষ্টি দেন তবে এই মামলাজট এবং এর সাথে বাদী-বিবাদীর হয়রানি ও অনর্থক অর্থনাশ - দুটোরই ইতিবাচক সমাপ্তি হতে পারে।

Tuesday, July 3, 2018

Political leaders of Bangladesh - Quality and opportunity

বিশ্বে সম্ভবতঃ বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজ এবং লাভজনক পেশা হচ্ছে রাজনীতি।  যে কোন চাকুরী-বাকরীতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষন, মেধা ইত্যাদি অত্যাবশ্যক। কিন্তু দেখা যায় রাজনীতিই এই দেশে এমন একটি পেশা যাতে উপরোক্ত কোনটিরই দরকার নেই। হ্যাঁ, একটি বিষয়ে বিশেষ গুন থাকা অত্যাবশ্যক এবং সেটা হচ্ছে কিছু গৎবাঁধা মুখস্ত বহুল উচ্চারিত বুলি, গলার জোর এবং মারদাঙ্গায় পটুত্ব। গোলাগুলি চালাতে পারলে আরো ’উন্নতি’। এতে ’নেতা’ হওয়াটা আরো সহজ হয়ে যায়। রাজনীতি অন্যান্য দেশে করে জনগনের সেবা করা দেশকে কিছু দেওয়ার জন্য। এসবই করা হয় দেশকে ভালবেসে, দেশের প্রতি দায় এবং দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই প্রয়োজন নেই। কারন এখানে রাজনীতি করা হয় বিনা পুঁজিতে অতি স্বল্প সময়ে কোটিপতি হবার জন্য। বস্তুতঃ অতি স্বল্প সময়ে ধনী হবার জন্য রাজনীতির চেয়ে আর কোন পন্থা এদেশে নেই। একটু লক্ষ্য করলেই এ কথার যথার্থতা মিলবে। দেখুন, ছাত্রাবস্থা শেষ হয়নি; এমন সময়েও ব্যাংকমালিক হওয়া যায়, হেলিকপ্টারে দাওয়াত খেতে যাওয়া যায়, রাজধানী শহরের সবচেয়ে পশ এলাকায় হাইরাইজ বিল্ডিং করা যায় এমনকি বিদেশে সেকেন্ড হোমও করা সম্ভব। কারন রাজনীতি করলেই, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করলেই এসব যেন আপনাআপনিই এস পায়ের কাছে জমা হয়। যে ব্যক্তি এই কিছুদিন আগে সামান্য বিড়ি চেয়ে খেত, বা চোরাচালানের বাহক ছিল, মাদকের ক্যারিয়ার ছিল, বা এমনকি গাড়ী চুরির সাথেও জড়িত ছিল, রাজনীতিতে আসার পরপরই, অথবা রাজনীতির ব্যক্তিদের সাথে ’গ্লাসফ্রেন্ড’ হবার সুবাদেও শুধু কোটি নয়, হাজার কোটি টাকার মালিক হতে পারে। এটা এ দেশ ছাড়া, যেখানে দিবারাত্র বিশেষ বিশেষ চেতনার ধুয়া তুলে চারদিক ’আন্ধার’ করে তোলা হয়, সেখানে ছাড়া আর কোন দেশে সম্ভব? এখানে রাজনীতিতেও মেধা, যোগ্যতা বা আদর্শবাহী ব্যক্তিত্বও কোন কল্কে পায় না।  একেবারে মৌরসী পাট্টার মত এখানেও জমিদারের ছেলেমেয়েকেই জমিদার হতেই হবে, সে বোবা-কালা-অন্ধ-বধির যেই হোক। এ কারনেই ঠিক যেমন বটগাছের নীচে আর কোন ছোট গাছ বাড়তেই পারে না তেমনি সর্বোচ্চ নেতার ছায়ায় আর কোন নেতা উঠতেই পারে না। অথচ এ সবই করা হয় গনতন্ত্রের নামে। এর কারন সুবিধাবাদের রাজনীতি কেবল সেই তন্ত্রেরই ধারক-বাহক হয়ে তাকে যে তন্ত্র তাদেরকে অবাধ ক্ষমতা চর্চা ও প্রয়োগ করতে কার্যকরভাবে সহায়তা করে।
এবং উপরোক্ত কথাগুলির সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিনিয়তই এদেশে দৃশ্যমান। কারন এদেশই এমন একটি দেশ যেখানে কোন রকম পরিকল্পনা ছাড়াই যে কোন কিছু করা সম্ভব। এখানে শহর গড়ে ওঠে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই, যা অল্প দিনের মধ্যেই আর বাসযোগ্য থাকে না। ’উন্নয়ন’ পরিকল্পনা করা হয় কোন সুবিবেচনা, দুরদর্শিতা ও সু-পরিকল্পনা ছাড়াই যাতে শত টাকার কাজ হাজারেও শেষ হয় না; বছরের কাজ যুগেও শেষ হয় না। শিক্ষা একটি জাতির মেরুদন্ড হলেও তা নিয়ে গিনিপিগসুলভ এক্সপেরিমেন্ট যুগের পর যুগ চলতেই থাকে আর দেশ একদল তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বেকার শ্রেনী উৎপাদন করে। যেখানে মেধার কোন কদর নেই, অ-মেধাবী/মেধাহীনদেরকে গুরুত্বপুর্ন সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এমনই শাসন-প্রশাসন চলে যে ডাক্তারকে ব্যাংকার, ব্যবসায়ীকে শিক্ষাব্যবস্থার কর্নধার, নকলবাজ ও নীতি-নৈতিকতাহীনদেরকে শিক্ষক ইত্যাদির মাধ্যমে সর্বত্র  ’স্কয়ার পেগ ইন এ রাউন্ড হোল’ অবস্থা সৃষ্টি হয়। প্রকৃত আদর্শ না থাকার ফলেই রাজনীতির নামে যে সুবিধাবদিতা বা ’অপরচ্যুনিজম’ চলে তাতে আজকের ’friend  (বন্ধু) কালকে ’foe (শত্রু)-তে পরিনত হয়। আজকে যা ভাল অবস্থান বদলে গেলে কালকে তা সবচেয়ে অপছন্দনীয় হয়ে পড়ে। হ্যাঁ, শিক্ষা-ই যে সব কিছু সেটা না হলেও মানুষের অন্তর্নিহিত গুনকে বোঝার ক্ষমতা তো অবশ্যই থাকতে হয়, নইলে অতি সাধারন একজন বিড়ি ব্যবসায়ী বা সামান্য একজন সাব-কন্ট্রাক্টরও গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির মালিক হতে পারতেন না। স¤্রাট আকবর নিরক্ষর হলেও তিনি ’রতন’ চিনতেন। তাই তিনি ’আকবর দি গ্রেট’ হতে পেরেছিলেন। কিন্তু ব্যতিক্রম তো আর নিয়ম নয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলির যথার্থতা কতটুকু সেটা আমাদের দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে তাকালেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি প্রকৃত কোন কমিটমেন্ট না থাকায়, প্রকৃত ভালবাসা না থাকায় দেশ দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। মাৎসান্যায় প্রবলপ্রতাপে রাজত্ব করে। শাসকদের জবাবদিহিতা বলতে কোন বস্তুর অস্তিত্ব থাকে না। আর এসব না থাকলে গনতন্ত্র গনতন্ত্র বলে যতই গলা ফাটানো হোক, দেশকে অমুক স্তরে তমুক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে যতই বাগাড়ম্বর করা হোক, কোন কিছুতেই দেশের সাধারন মানুষের কোন উপকার হয় না। দেশও উন্নয়নের রাস্তায় গো-শকটের চেয়ে বেশী গতি পায় না।
আজকে এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, এটা তদানীন্তন অধিকাংশ রাজনীতিক নেতা ভাবেন নি। ভাবলে একটা নতুন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পরিচালনা করতে সক্ষম এমন অন্ততঃ একটি শ্রেনী বা গ্রুপ তো তৈরী থাকত। মহামতি (?) লেনিনের ভাষায়, ’Give me thirty professional revolutionaries and I will turn Russia upside down - এই কথাটার মর্মার্থ আমাদের নেতারা উপলব্ধি করতেন। এরকম প্রস্তুতি ছিলনা বলেই সদ্যস্বাধীন দেশটি অনতিবিলম্বেই লুটেরাদের দারুন মৃগয়াক্ষেত্রে পরিনত হয় যা বঙ্গবন্ধুর মত ’monumental'  ব্যক্তিত্বও সামলাতে পারেন নি । ইতিহাস সাক্ষী সম্পুর্ন বিধ্বস্ত জার্মানী বা জাপান সে রকম নেতৃত্ব পেয়েছিল বলেই তারা মাত্র ২৫/৩০ বছরের মধেই সেই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে ফিনিক্স পাখীর মত পুনর্জীবন লাভ করে এবং ঐ সময়ের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক শক্তিতে উন্নীত হয়। এমনকি মহাযুদ্ধোত্তর সোভিয়েট ইউনিয়নও একটি কৃষিপ্রধান দেশ থেকে শিল্পোন্নত পরাশক্তিতে পরিনত হয়। দেশপ্রেমিক, দৃঢ়সংকল্প ডিক্টেটররাও অনেক ক্ষেত্রে এমন উদাহরন রেখে গেছেন যে কারনে প্রথম মহাযুদ্ধে প্রায় সর্বস্ব হারানো জার্মানী ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল – মাত্র এই দশ বছরের মধ্যে এমন অকল্পনীয় উন্নতি করে যে তাকে থামাতে আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্সের মত শক্তিকেও বিপুল ক্ষতির শিকার হতে হয়। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উদ্গাতা লেনিনের মৃত্যুর পর জোসেফ স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে ৪/৫ মাস আগেই সমাপ্ত করেছেন এবং তাঁর দেশকে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের প্যারালাল একটি শক্তিতে পরিনত করেছেন। তাদের লক্ষ্য সুদুর হলেও ছিল সুনির্দিষ্ট। তাই তাদের কাছে সময়ের মুল্য ছিল সবচেয়ে বেশী, যার জন্য তাদের কাজকর্ম ছিল ’Race against time’।  আর আমাদের দেশে? স্বাধীনতার দু’তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে এক নির্মম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়। হতে হয় ’তলাবিহীন ঝুড়ির’ তকমাধারী এক ছ্যারাবেরা দেশ। আজও এক বছরের কাজ শেষ হতে চার/পাঁচ বছর লেগে যায়, হাজার টাকার প্রকল্প কোটি টাকা খেয়ে ফেলে। অথচ ’উন্নয়নের জোয়ারে’ দেশ ভেসে যাচ্ছে বলে আমরা নিজেরা নিজেদের পিঠ নিজেরাই চাপড়াই। এসবই ঘটে তখনই যখন অদুরদর্শী, অ-দেশপ্রেমিক, অ-জনবান্ধব এবং অদক্ষ নেতৃত্ব সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়।
উপরোক্ত কথাগুলি হয়ত অনেকের কাছেই অগ্রহনযোগ্য এমনকি কট’ও লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা তাতে বদলায় না। আজ স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছরেও আমাদের দেশ যে কেবল ’উন্নয়নশীল’ তকমা পেল এতে খুশী হবার চেয়ে দুঃখিত হওয়ারই কথা। কিন্তু আমাদের স্বভাব বৈপরীত্যের কারনে আমরা দেশ ডিজিটাল বলে গর্ব করি অথচ আমাদের আঠার মাসে নয় বরং চব্বিশ মাসে বছর হচ্ছে এটা মনে আসে না।

Friday, June 29, 2018

বৈষম্য দূরের আশা জোগাচ্ছে না বাজেট

বৈষম্য দূরের আশা জোগাচ্ছে না বাজেট ---জনাব তুহিন ওয়াদুদের এই লেখাটির প্রেক্ষিতে বলতেই হয় এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে যদি সত্যিকারের কোন আদর্শ থাকত তবে এ অবস্থা হবার কোনই কারন ছিলনা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা দৃষ্টে আজ একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে এদেশের স্বাধীনতার পেছনে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্পৃহা কতটা ছিল সেটা নিশ্চিত বলা না গেলেও অবাঙালীদের সম্পদ লুটপাট এবং এদেশের কিছু সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদীদেরকে তাদের স্থলাভিসিক্ত করা যে উদ্দেশ্য ছিল সেটা অস্বীকার করার বোধহয় আজ উপায় নেই। নইলে যে আদমজী জুটমিল নিয়ে বাঙালীদের এত গর্ব, এত ক্ষোভ যে এই সোনার ডিম পাড়া রাজহংসটির সব ডিম পাকিস্তানীরা নিয়ে যাচ্ছে আর তা দিয়ে তাদের রাস্তাঘাট সোনা দিয়ে বাঁধাচ্ছে, সেই আদমজী জুট মিল এই বাঙালী পুঙ্গবদের হাতেই তেরশ' কোটি টাকা দেনা মাথায় নিয়ে ডুবে যেত না। স্বাধীনতার পরপরই যে অবাঙালীদের সহায়-সম্পত্তি ব্যপক লুটপাট হয়ে গেল, কোন রকমের সু-আদর্শের অনুপস্থিতিই যে তার জন্য দায়ী ছিল সেটা আজ অকাট্য বাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের মধ্যে কোটিতে হয়ত একজনও নেই যিনি সত্যি কথাটা বলবেন। এই যে উত্তরাঞ্চলের দারিদ্রের বর্তমান অবস্থা সেটা দুর করার জন্য কোন সরকারই কি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে? আজও যে নিচ্ছে না সেটা তো জনাব তুহিনের লেখায়ই ফুটে উঠেছে। কিন্তু কেন এই অবস্থা, যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধেই এদেশের মানুষ প্রানপণ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল?
স্বাধীনতার পেছনে সঠিক আদর্শের যে ঘাটতি ছিল সেটার ফলশ্রুতিতে আজ এদেশ দুর্নীতির পঙ্কে প্রায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে দেশের তরুন সমাজ আজ ধুঁকছে। সর্বত্র ন্যায়, সত্য ও সাম্যতার প্রকট অভাব। অথচ ঐসমস্ত অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতেই তো মুক্তিযুদ্ধ, নয় কি? আদর্শের উপস্থিতিতে দেশকে মানুষ কি দিতে পারে সেটা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখেছি। তিনি বলেছেন যে সদ্য পাওয়া পাকিস্তানে অফিস নেই, চেয়ার নেই, টেবিল নেই তবু মানুষ তাঁবুতে সামান্য একটা দুটো ভাঙ্গা টেবিল নিয়ে অফিসের কাজ করেছেন। স্টেশনে টিকিট না পেয়ে ট্রেনে চড়ে মানুষ টিটি-কে টিকেটের টাকা দিয়েছে। দুর্নীতি যেন ভোজবাজির মত উধাও হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দেখা গেল যে হরিল্লুটের মচ্ছব। কিছুদিন আগে সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহেবের লেখায় দেখেছি যে লোক কম ভাড়ায় থাকার জন্য গোপীবাগের ঘুপচি ঘরে থাকতো, বাজারের থলে হাতে বাসের হ্যান্ডেলে ঝুলে যাতায়াত করত, স্বাধীনতার পরে তিনি দেখেছেন সেই লোক মীরপুর কি মোহাম্মদপুরে বাড়ীর মালিক হয়ে তাঁর সাথে বেশ গর্ব করে বলেছে যে তিনি এখন বাড়ীর মালিক। এর পরে বঙ্গবন্ধুর আমলে যাদেরকে তিনি বিশ্বাস করে জাতীয়করনকৃত মিল-কারখানার প্রশাসক হিসেবে বসিয়েছিলেন, তারা সেই সব মিল-কারখানার যন্ত্রপাতি পর্যন্ত বিক্রী করে দিয়ে নিজেদের পকেট ভর্তি করেছে। অতি দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে তাঁকে বলতে হয়েছিল 'লোকে পায় সেনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। ' এসবই ছিল আদর্শহীনতার বিষময় ফল। এসব অবস্থার কি আজো কোন পরিবর্তন হয়েছে? হ্যাঁ, অনেকেই বলবেন যে দেশ তো 'এগিয়ে চলেছে।' সত্যিই, দেশে পদ্মা সেতু হচ্ছে, বড় বড় ফ্লাইওভার হয়েছে ও হচ্ছে, ডিপ-সী পোর্ট হচ্ছে। তবে যদি গত ১০/১২ বছরের তথ্যগুলো দেখা যায় তবে দেখতে হয় ৫০/৬০ হাজার কোটি টাকার শোয়ার বাজার লুট, ব্যাংকের খাণখেলাপীর অংক লাখো কোটি টাকার উপরে উঠেছে; কয়েকটি ব্যাংক ঘোরতর লুটপাটের কারনে লালবাতি জালিয়েছে আর সরকার সেগুলোকে কোরামিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। এমনকি রাস্ট্রীয় ব্যাংকের কোষাগার থেকেও অনায়াসে আটশ' কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেল কিন্তু তার উদ্ধারের আর কোন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলো না। আবার তার তদন্ত রিপোর্টটিও আলোর মুখ দেখতে পেল না। এরপর দেখা যাচ্ছে হাজার টাকার প্রজেক্ট দশ হাজার টাকা খেয়ে ফেলছে এক বছরের জায়গায় ৪/৫ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে বাড়িয়ে। দেশে প্রায় পঁয়ষট্টি লাখ বেকার যার মধ্যে বিশ লাখ শিক্ষিত বেকার। ঐ লুটপাট হওয়া অর্থ দিয়ে আরো ৪/৫ টা পদ্মা সেতু বানানো যেত। নতুন নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করে লাখো বেকারের বেকারত্ব ঘোঁচানো যেত। এসবই কি আদর্শহীনতার বিষময় ফল নয়? যে বৈষম্য এই ছোট্ট দেশটিতে ক্রমবর্ধমান, সে বৈষম্যও প্রকৃত কোন আদর্শের অভাবেই ঘটছে। তাই মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সাহস নেই যে তিনি কোটারী স্বার্থের বাইরে গিয়ে প্রকৃত জনবান্ধব কোন বাজেট দেবেন। এত এত লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা লুট হয়ে গেছে, লাখো কোটি টাকা খান-খেলাপী হয়ে পড়েছে, কিন্তু অর্থমন্ত্রী তাদের নাম পর্যন্ত সংসদে উচ্চারন করার ক্ষমতা রাখেন না। স্বাধীনতার পর বাইশ পরিবার বেড়ে বাইশ হাজার পরিবার হয়েছে। বিদেশে সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া ইত্যাদি হয়েছে। আগে মানুষ রাজনীতি করত মানুষের কল্যানের লক্ষ্যে। তাঁরা ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানোর ব্রত নিয়েই রাজনীতি করতেন। আর আজ? আজ নাকি সংসদে ৭৫% - ৮০% ব্যবসায়ী, যারা কয়েক কোটি টাকা খরচ করে নমিনেশন কেনেন আর ইলেকশন (?) করেন। তারপর সেই বিনিয়োগের দশগুন উসুল করেন সংসদ বা মন্ত্রী হয়ে। কিন্তু স্বাধীন দেশে বঞ্চিত, শোষিত মানুষের কি লাভ হয়েছে?

Wednesday, May 30, 2018

আমাদের বদভ্যাসসমূহ ও এর কারন
বর্তমান সমাজে নানা অসঙ্গতি, নানা অনাচার, অনাকাংখিত ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব ঘটনায় অশিক্ষিত মূর্খ দের চেয়ে শিক্ষিত লোকদেরই সংশ্লিষ্টতা বেশী। কারন কি? কারন খুবই সহজ ও বোধগম্য। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করে বলা যাক।
শিক্ষার অর্থ হচ্ছে ’আচরনের কাংখিত পরিবর্তন।’ ইংরেজীতে বলা যায়, ডেজায়ার্ড চেঞ্জ অব বিহেভিয়ার। এই ’বিহেভিয়ার’ নিত্য অভ্যাসেরই সামষ্টিক রূপ। আবার এই অভ্যাস একটা শিশুর শৈশবকাল থেকেই  নিত্য জীবনাচরনের মধ্যেই গড়ে ওঠে। সে সেটা তার পরিবার, পারিপার্শ্বিকতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্রমাগত আয়ত্ব করে থাকে। এটা হঠাৎ একদিনকার বিষয় নয়। তাহলে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিষয় নয়; বরং শিক্ষা এমনই একটি বিষয় যা মানুষের জীবনাচরনকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন সাধন করে। এখন মিলিয়ে দেখুন তো এই কথাটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বা সিলেবাসের কোন অংশে আছে? আজকে শিক্ষার চেয়ে জিপিএ-৫/এ+ পাওয়াটাই শিক্ষার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন স্কুল বা কলেজের মান নির্নীত হচ্ছে সেখান থেকে কতজন জিপিএ-৫ বা এ+ পেয়েছে। সেইসব শিক্ষার্থী আসলেই কিছু শিখেছে কি না, তার আচরনের কাংখিত পরিবর্তন হয়েছে কি না সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। এইসব শিক্ষিত (?) নামীয় মানুষগুলো কি আদৌ শিক্ষিত? তাহলে তারা সামান্য কমনসেন্সের অধিকারী নয় কেন? কেন তাদের সিভিক সেন্স বলে কোন বিষয় তাদের মনের মধ্যে নেই? কেন তারা শেখেনি কিভাবে নাগরিক জীবন যাপন করতে হয়; কিভাবে সামষ্টিক জীবন বা ’collective living’-এ অভ্যস্ত হতে হয়? কেন একজন শিক্ষিত মানুষ স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, মর্ষকামী বা ধর্ষকামী হয়? কারন তাকে কেউ এসব শেখায় না। না পরিবার, না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তার মনমানসে থাকে কেবল কিভাবে ভাল স্কোর করতে হবে; কিভাবে জিপিএ-৫/এ+ পেতে হবে। অথচ বিদেশে শিক্ষার সাথে সাথে সহমর্মিতা ও অন্যের সাথে অংশীদারী হওয়া - ইংরেজীতে যাকে বলে ’fellow-feeling and sharing - পারষ্পরিক সাহায্য ও সহযোগীতার মনোভাব, সহপাঠীদের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে টীমস্পিরিট হিসেবে নিজের সাফল্য ও ব্যর্থতা বলে মেনে নেওয়া ইত্যাদি বিষয় পাঠ্যসূচীর সাথে সমানভাবে গুরুত্বসহকারে শেখানো হয় যাতে শিক্ষার্থী স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা না শেখে। এসব বিষয় কি আমাদের পাঠ্যসূচীতে আছে, এমনকি শ্রেনীকে কোন শিক্ষক আলোচনা করেন? বাড়ীতে কি শিক্ষার্থীদের বাবা-মা তাদেরকে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কিছু বলেন?
তাই শিক্ষিত লোকেরা যত্রতত্র কেবল থুথুই ফেলে না, যত্রতত্র প্রাকৃতিক কর্ম সারতেও ইতস্ততঃ বা লজ্জা বোধ করে না, আশেপাশের ফুলগাছগুলোকে দুমড়েমুচড়ে ফেলতে কার্পন্য করে না, ফুটপাতে মটরবাইক চালানো তো কোন ব্যাপারই না। এই শিক্ষিত লোকেরা রাস্তার বামপাশে গাড়ী রেখে অন্যকে বামে যাবার সুযোগ দেবার বদলে পুরো রাস্তাই ব্লক করে রাখে। দ্রুত ছোটার জন্য অনায়াসে লেন পরিবর্তন করে পিছনে নিকটেই আর কোন গাড়ী কোন গাড়ী আছে কি না তা বিচার-বিবেচনা ছাড়াই। এমনই ভাব যেন রাস্তাটা তার একার জন্যই তৈরী করা হয়েছে। ফুটপাত হাঁটার জায়গা হলেও অবলীলায় সেখানে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে গালগল্প করছে অন্য পথচারীদের সুবিধা-অসুবিধা তার পরোয়া না করেই। শৃংখলা বলতে একটা বিষয় আছে, সেটা বিদ্যালয়ে মুখ¯থ করানো হলেও তাদের কাজে তার কোন প্রতিফলন দেখা যায় না। তথাকথিত উচচশিক্ষিত লোকেরা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সাহেবরাও হাতা গুটিয়ে মারামারি করতে বা আপন কন্যাসম শিক্ষার্থীকে যৌন হেনস্তা করতেও ইতস্ততঃ করেন না; সামান্য বৈষয়িক লাভ বা আপন সুবিধার্থে বিশেষ বিশেষ শিক্ষার্থীকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া তো অতি সাধারন ব্যাপার। নিজেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহনযোগ্য, আদর্শ ও অনুকরন-অনুসরনযোগ্য করে তোলার বদলে বিশেষ রাজনৈতিক ছাতার নীচে আশ্রয় নিয়ে নানা রঙে রঙিন হতেও তারা কুন্ঠিত হন না। আবার তারাই কোন ছাত্র-ছাত্রী তাদেরকে যথাযথ সম্মান করল না বলে তাদের ওপর ক্ষোভও প্রকাশ করে ফেলেন। কি আজব ব্যাপার!
তো পুরো বিষয়টা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের আচরনের কাংখিত পরিবর্তন আনতে পারে, সে শিক্ষা বর্তমানে এদেশে দুর্লভ বা নেই বললেই চলে। আর এর বিষময় ফল আমরা নিত্যই প্রত্যক্ষ করছি। তাই অশিক্ষিত গাড়ীচালক, মুটে-মজুর, রিক্সাচালক ইত্যাদিকে আমরা দোষারোপ না করে নিজেদের দিকে একটু তাকালেই অনেক বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের গন্ডাগন্ডা ডক্টরেট ডিগ্রীধারীগনও যে কমনসেন্স ও সিভিকসেন্সের প্রচন্ড অভাবে ভোগেন তার ভুরি ভুরি উদাহরন আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। আমাদের যারা ভাগ্যবিধাতা, তারা নিজেরা কতটা দায়িত্বশীল, কতটা সত্যিকার দেশপ্রেমিক, কতটা জনকল্যানকামী, কতটা সৌন্দর্যপিপাসু সেটা তাদের প্রশাসন, পরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি, তাদের জীবনাচরনের মধ্যেই প্রকটভাবে প্রকাশমান। তাই তাদের যারা অনুসারী, তাদের কাছ থেকে ভিন্ন কিছু আশা করাটা অসঙ্গত ও অযৌক্তিক। যারা জানেই না একটা দেশ বা একটা শহর পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকরভাবে, জনবান্ধব ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হয়, কিভাবে তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, তাদেও দ্বারা আর যাই হোক কোন শহরকে সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য করে রাখার আশা মোরগের কাছে ডিম পাবার মতই একেবারে নিরর্থক।

Bangladesh & Development

বাংলাদেশ ও উন্নয়ন
বাংলাদেশ নাকি বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে আছে। কিন্তু উন্নয়ন আসলে কাকে বলে? চতুর্দিকে অরাজক পরিস্থিতি বহাল রেখে দেশ উন্নয়ন করছে বলে যারা বগল বাজাচ্ছেন তাদেরকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। কোন উন্নয়নকামী দেশে ঘরে ঘরে অলিতে গলিতে বিশ্ববিদ্যালয, এমনকি স্কুল কলেজ থাকে? অলিতে গলিতে খেয়ালখুশীমত দোকান-পশারী, গ্যারেজ-কারখানা থাকে? সম্পুর্ন অপরিকল্পিত বাড়ীঘর, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, কোন রকম পার্কিং প্লেস বিহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক, শপিংমল, কমিউনিটি সেন্টার  থাকে? শহরে ব্যস্ত রাস্তার পাশেই অবাধে হকার বা কাঁচামালের বা মাছ-মাংসের দোকান থাকে? 
সরকার প্রতি বছর নানা ভাবে নানা রঙের করারোপের মাধ্যমে সরকারী খাজাঞ্চখানা ভরছে। অথচ সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা এজেন্সীর নাকের নীচে পিওন-দারোয়ান-মিটার রীডার-ড্রাইভার রাজধানীসহ নানা শহরে গ্রামে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাসাদ বানাচ্ছে; কিন্তু তাদেরকে কেউ জিজ্ঞাসা করছে না ১০/১৫ হাজার টাকা বেতন পেয়েও এত টাকা তারা ব্যয় করে কিভাবে, এত টাকা পায় কিভাবে।  সরকার তার কর্মচারীদের বেতন বর্তমানে সাধারন মানুষের আয়-ইনকামের তুলনায় কয়েকগুন বেশী প্রদান করছে। এতে বাজারে দ্রব্যমুল্যের উর্দ্ধগতিতে সাধারন মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও সরকারের তাতে কিছু এসে যাচ্ছে না। বর্তমানে আয় বৈষম্য এতটাই বেড়েছে যে তাতে অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মানুষের মাথাপিছু আয় দেখানো হচ্ছে ১৬৭০ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় $=১,৩৭,০০০/= (এক লাখ সাঁয়ত্রিশ হাজার টাকা)। কিন্তু এই অংক যে বিরাট শুভঙ্করের ফাঁকি সেটা যে কোন সাধারন জ্ঞান সম্পন্ন মানুষও বোঝে। দেশের ৮৫% মানুষের এই মাথাপিছু আয়ের সাথে কোন সম্পর্ক আছে?
বর্তমান সময়ে উন্নয়নের যে মচ্ছব চলছে তাতে এই উন্নয়নের মুল্য যে কত বেশী সেটা বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া থেকেই প্রকট হয়ে ওঠে। যেখানে প্রকৃত ব্যয় হাজার টাকা সেখানে ব্যয় বরাদ্দ করা হয় দশ হাজার। তাও আবার নির্দিষ্ট সময়ে তা শেষ হয়না বলে তার বরাদ্দ ও মেয়াদ বারবারই বাড়ানো হয়। এ ব্যাপারে কারো কোন জবাবদিহিতা নেই।
দেশের যত্রতত্র ইচ্ছামত বাড়ীঘর বানানো, দোকান-পশারী বসানোর ওপরে কারো নিয়ন্ত্রন নেই। ব্যস্ত রাস্তার পাশে লাখো লাখো দোকানপাট বসছে। যেখানে সেখানে বাড়ীঘর নির্মান করা হচ্ছে। হাইওয়ের ওপর নানা রকম বাজার-হাট বসছে। দেশের এক হাজার মাইল রাস্তাকে নিরাপত্তাহীন করে তার  দুপাশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দোকানপাট বাড়ীঘর বানানো হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে ফ্রি-স্টাইল চলছে।
এসবই কি উন্নয়নের মহাসড়কে চলার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়? অথচ উপরোক্ত সব অনিয়ম ও অনাচারের গতি থামানো সম্ভব যদি সত্যিকার উন্নয়ন করার দৃঢ় সংকল্প সরকারের তাকে।  বর্তমানে দেশ ডিজিটাল হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সুবিধাকে কাজে লাগানো হচ্ছে না। আবার সেই সুবিধাকে জায়গামত কাজে না লাগিয়ে অ-জায়গাতে লাগানো হচ্ছে। ডিজিটাল সুবিধা কি কেবল মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকীর্ন করার জন্য?  অথচ এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি দোকানপাট, গ্যারেজ-ওয়ার্কশপ, হাসপাতাল-ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার, এমনকি গ্রাম্য হাটবাজার দোকানপাট ইত্যাদিকেও ডাটাবেজের আওতায় আনা যায়। দেশে চলমান প্রতিটি যানবাহন ডাটা বেজের আওতায় আনা যায়। এর মাধ্যমে দেশে গাড়ীচোরদের অপকর্মকেও ৯০% নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মকান্ড, আয়-ব্যয় মনিটর করা যায়। প্রতিটি টাকার গতিবিধি মনিটর করা যায়। বর্তমান অবস্থায় শতভাগ সম্ভব না হলেও ৮০% সম্ভব সেটা। উন্নত দেশগুলোতে এমনকি একটা মোবাইল স্টলও ডাটাবেজের আওতায় আছে যেটার সরকারের দৃষ্টি এড়ানো বা দেয় ট্যাক্স ফাঁকি দেবার কোন উপায় নেই। দেশকে প্রকৃত উন্নয়নশীল বা উন্নত করতে হলে ওইসব উদাহরনকে কাজে লাগিয়ে সবরকম প্রতিষ্ঠান, সে ছোট হোক আর বড় হোক, ডাটাবেজে এন্ট্রি ও রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বসানোর কোন রকম সুযোগ থাকা প্রকৃত উন্নয়নের পথে বিরাট বাধা বলে বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটা দেশের ইউনিয়নকে ও ওয়ার্ডকে সক্ষম করে তুললে এ কাজ কঠিন হবার কথা নয়। যে দুর্নীতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা, এই সব প্রক্রিয়াকে যথাযথভাবে কাজে লাগালে বহুলাংশে দুর্নীতি দুর করা সম্ভব।
তাই বলতে হয় উন্নয়ন উন্নয়ন করে ঢাকঢোল পেটালেই দেশ উন্নয়নশীল বা উন্নত করার কোন সুযোগ নেই। সেটা করার জন্য বুদ্ধি, মেধা, আন্তরিক প্রচেষ্টা, দৃঢ় সংকল্প ও সর্বোপরি নিখাদ দেশপ্রেম অত্যাবশ্যক। নইলে কিছুদিন মানুষকে চমক দেওয়া গেলেও আসলে কাজের কাজ কতটুকু হবে সেটা সাধারন জ্ঞান সম্পন্ন সবাই জানে।  ---- ৩০/৫/২০১৫ইং

Saturday, April 28, 2018

সমাজে ধর্মীয় মুল্যবোধের অভাব - নারী নির্যাতনের মুল কারন

কথায় বলে কচু কাটতে কাটতে মানুষ খুন করা। এক কবিও বলেছেন
’ছোট বালুকার কণা বিন্দু বিন্দু জল,
গড়ি তোলে মহাদেশ সাগর অতল।’
বক্ষ্যমান লেখিকা বলেছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর নান রকম যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের কথা। পুরুষ মানুষ নারীকে ভোগ্যবস্তু বলেই মনে করে ইত্যাদি। কিন্তু কেন এই জঘন্য মানসিকতা তৈরী হয় সেটা তিনি কেন, কেউ-ই বলেন না। এ যেন গোড়া কেটে আগায় জল ঢালা। রোগের কারন না জেনে ওষুধ দেবার ব্যবস্থা। বস্তুতঃ ধর্মীয় মুল্যবোধই যাবতীয় মানবিক মুল্যবোধের উৎস। ভিনদেশীয় সমাজে, ভিন্ন ধর্মে নারীদের যে মর্যাদা সেটা প্রায় শিক্ষিত সকলেই জানেন। ইউরোপীয় কোন কোন দেশে বিবাহ নামের বিষয়টি একটি ’অপশনাল’ বিষয়। উত্তর ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে অবৈধ বা খারাপ, কোনভাবেই দেখা হয় না। বয়ফ্রেন্ড ও বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাবা-মায়ের সাথে এক টেবিলে খেতেও সেখানে কোন বাধা নেই। নারীদের স্বাধীনতা সেখানে এমনই যে বিয়ে-শাদী বা পরিবার বলে কোন বিষয় মোটেই গুরুত্বপুর্ন নয়। ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধা, আরাম-আয়েসই বড় কথা। সেখানে যেহেতু ফ্রি-মিক্সিং স্বাভাবিক বিষয়, নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক যেহেতু একেবারেই স্বাভাবিক বিষয় তাই সেখানে নারী নির্যাতন বলে কোন কিছুই নেই। কিন্তু যেখানে পারিবারিক বন্ধনের ব্যাপারে বিবাহের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ন, সেই প্রাচ্যদেশীয় আবহে নারী নির্যাতন কথাটা খুবই প্রাসঙ্গিক। তো আমাদের সমাজে যখন সেই পাশ্চাত্যধারা অনুকরনকেই প্রগতিশীলতার নিয়ামক বলে মানা হচ্ছে, তখন তাদেও মত ফ্রি-মিক্সিং বা বিবাহ-বহির্ভুত যৌন সম্পর্ককে মেনে নিতে বাধা থাকবে কেন? নাচতেই যদি নামতে হয় তবে আর ঘোমটা দেওয়া কেন?
কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটাকে আরেকটি দৃষ্টিকোন থেকে যদি দেখা যায় তবে একথা বলতেই হয় যে আমাদের কালচারে যেটা গুরুত্বপুর্ন, সেটা হচ্ছে ধর্ম। এই দেশের ৮৫% মানুষ মুসলমান । তারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী, সে নামে হলেও ।আর ইসলামে নারীকে যে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তা আর কোন ধর্মে দেওয়া হয়নি। এটা যারা অন্য ধর্মের অআকখ জানেন তাদেরও জানা আছে। সে বিষয়ে ভুরি ভুরি উদাহরন দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের সমাজে ইসলাম আজকে কোন গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করে কি? দুই যুগ আগেও যেভাবে পরিবারে আমাদের ধর্মের গুরুত্ব ছিল, আজ সেটা আর আছে কি? আগে ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা প্রায় ৯০% পরিবারে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পরিবার থেকেই শিশুরা ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক পাঠ পেতে পারত। সব পরিবারে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কুরআন পড়তে না পারলেও ধর্মের সাধারনভাবে পালনীয় বিধিবিধানগুলো প্রায় সবাই জানত। কিন্তু আজকের অবস্থা কি? হ্যাঁ, অনেকেই বলবেন প্রাইমারী ও সেকেন্ডারী লেভেলে ধর্মীয় শিক্ষা তো আছে। কিন্তু পাশ করার জন্য শিক্ষা আর কার্যকরী শিক্ষার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক সেটা তো অস্বীকার করার যো নেই। তাছাড়া ক্লাশে ধর্মীয় যে তালিম শিক্ষার্থী পেল, সেটা পরিবারে গৃহ পরিবেশে যদি না থাকে তবে তো ক্লাশের সে তালিম তাকে দারুনভাবে বিভ্রান্ত করবে। আর তার ফল যে উল্টো ফলতে বাধ্য সেটাও নিশ্চিত। তাই ধর্মীয় মুল্যবোধকে যদি যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া হয় তবে ধর্ম যে মানবিক মুল্যবোধ, পারষ্পরিক শ্রদ্ভাবোধ যথা বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি ভালবাসা ইত্যাদি শেখায় সেগুলো শেখার সুযোগ কোথায়?
আজকে কিশোর-তরুনদেরকেও দেখা যাচ্ছে ইভটিজিং, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষনের মত গ ুরুতর অপরাধে লিপ্ত হতে। কিভাবে এটা সম্ভব, যদি সে পরিবারে সঠিকভাবে ধর্মীয় মুল্যবোধের শিক্ষা পেয়ে থাকে? পরিবার তো তাকে শেখাবে কার সাথে কি আচরন করতে হয়। যে শিশু মা-কে সম্মান করতে, মর্যাদা দিতে শিখলনা সে নারী হিসেবে আর কাকে সম্মান করবে? যে বোনকে সুস্থভাবে ভালবাসতে শিখলনা সে অন্য মেয়েকে কিভাবে সুস্থভাবে ভালবাসবে? তার মধ্যে সুস্থ চিন্তা আসবেই বা কেমন করে?
আসলে কেবল নারীদের প্রতি লোভাতুর দৃষ্টিই নয়, যে কোন কিছুর প্রতি অশোভন বা অবৈধ লোভ না করাাটা পরিবারের ভেতর থেকেই শিখতে হয়। এটা শিশুকে তার মা-বাবাই দিয়ে থাকেন। কিন্তু আজকের অবস্থা কি? আজকে দরিদ্র পরিবারে নয়, বরং ধনী ও স্বচ্ছ্বল পরিবারের সন্তানরাই অকল্পনীয় অপকর্মের সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে। এর কারন হচ্ছে সহায়-সম্পদের সাথে সাথে ধর্মীয় মুল্যবোধ ’ফেড আউট’ হয়ে যাওয়া। যে সন্তান শিখেছে যে ’মায়ের পায়ের তলায় সন্তানের বেহেশত’, যে সন্তান শিখেছে যে ’ব্যাভিচার কবীরা গুনাহের কাজ’, যে সন্তান শিখেছে ’কবীরা গুনাহ আল্লাহ সহজে মাফ করবেন না’, যে সন্তান শিখেছে যে ’প্রকৃত মোমিন (মুসলমান) তারাই যাদের মুখ ও হাত থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ’, তারা কোনো খারাপ কাজ করতে দশবার ভাবে। যে শিশু পরিবারে শেখে আল্লাহ সুন্দর; আর তিনি সুন্দরকে ভালবাসেন, সে শিশু সুšদরকে ভালবাসবে। সুন্দরকে দলা-মোচড়া বা বিকৃত করতে সে কখনোই আগ্রহী হতে পারে না। যে শিশু শিখেছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ, সে কখনো এখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নোংরা করবে না। তবে হ্যাঁ, এ ছাড়াও আমাদের শৈশবে নৈতিক শিক্ষামুলক নানা কবিতা, গল্প ইত্যাদি যেসব পাঠ্য ছিল সেগুলোর কোন কিছু বর্তমানে আর চোখে পড়ে না।
প্রকৃতপক্ষে আজ সমাজে কেবল নারীর প্রতি সহিংসতা নয়, সকল বিষয়ই সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। সব কিছুকে লোভাতুর দৃষ্টি দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত চোখ কেবল নারীকেই না, সব কিছুকেই বৈধ অবৈধ যে কোন ভাবে পাবার জন্য লালায়িত হবে এটাই সত্য। এই অপকর্মে ধর্ম সবচেয়ে দৃঢ় ও কার্যকর প্রতিবন্ধক। সেই ধর্মীয় শিক্ষা সে যদি না পায়, সে যদি পরিবার থেকে একজন ভাল মানুষ হবার শিক্ষা না পায়, তবে তার কাছ থেকে ভাল কছিু পাবার আশা করা একান্তই নিরর্থক। আমাদের দৃষ্টি যে কেবল নারী নির্যাতনের উপর নিবদ্ধ সেটা এক রকমের ভ্রান্তি। যে সুন্দরকে দলিত-মথিত করতে, রাস্তার পাশে প্রকাশ্যে প্রাকৃতিক কর্ম সারতে, মানুষের প্রতি খারাপ আচরন করতে, দুর্নীতি করতে লজ্জা পায় না, সে কেবল নারীর প্রতি সু-আচরন করবে, তাকে সম্মান করবে এটা ভাবাই এক ধরনের মূঢ়তা ছাড়া আর কিছু নয়। যতক্ষন আমাদের সমাজের দায়িত্বশীল মানুষদের এই দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন না হবে ততক্ষন কেবল নারী নিপীড়নের বিষয়ে হা-হুতাশ করাই সার হবে। কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না।


Monday, April 23, 2018

দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার হাল বর্ননা করতে হলে সংযুক্ত গল্পটি একটু ভাল করে পড়ার জন্য মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ জানাচ্ছি। গল্পটি সম্ভবতঃ বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে কোন শ্রেনীতে পাঠ্য নেই।   সম্ভবতঃ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা বর্ননা করতে বিশ্বকবির এই গল্পটির চেয়ে উৎকৃষ্ট আর কোন কিছু নেই।   তাই খোদ বিশ্বকবির পূজারীরাও আর এই গল্পটি পাঠ্যসূচীতে রাখতে সাহস করে নি। 
                              তোতা কাহিনী
                                          রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এক যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ; সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দাকানুন কাকে বলে। রাজা বলিলেন এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়। মন্ত্রী কে ডাকিয়া বলিলেন, ’পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’

রাজার ভাগিনাদের উপর পড়িল পাখিটাকে শিক্ষা দেবার দায়িত্ব। পন্ডিতেরা বসিয়া অনেক বিচার করিলেন। প্রশ্নটা এই যে উক্ত জীবের অবিদ্যার কারনটা কি? সিদ্ধান্ত হইল সামান্য খড়কুটা দিয়া পাখি যে বাসা বাঁধে সে বাসায় বিদ্যা বেশী ধরে না। তাই সকলের আগে দরকার ভালো করিয়া খাঁচা বানাইয়া দেওয়া।
রাজ পন্ডিতেরা দক্ষিনা পাইয়া খুশী হইয়া বাসায় ফিরিলেন।

স্যাকরা বসিল সোনার খাঁচা বানাইতে। খাঁচাটা হইল এমন আশ্চর্য যে দেখিবার জন্য দেশবিদেশের লোক ঝুঁকিয়া পড়িল।কেহ বলে, শিক্ষার একেবারে হদ্দমুদ্দ।কেহ বলে, শিক্ষা যদি নাও্র হয় খাঁচা তো হইল। পাখির কি কপাল!
স্যাকরা থলি বোঝাই করিয়া বকসিস পাইল। খুশী হইয়া সে তখনি পাড়ি দিল বাড়ীর দিকে। পন্ডিত বসিলেন পাখিকে বিদ্যা শিখাইতে। নস্য লইয়া বলিলেন, ’অল্প পুঁথির কর্ম নয়।’
ভাগিনা তখন পুঁথি লিখকদের তলব করিলেন। তারা পুঁথির নকল করিয়া এবং নকলের নকল করিয়া পর্বতপ্রমান করিয়া তুলিল। যে দেখিল সেই বলিল, ’সাবাস! বিদ্যা আর ধরেনা।’
লিপিকরের দল পারিতোষিক লইয়া বলদ বোঝাই করিয়া তখনি ঘরের দিকে দৌড় দিল। তাদের সংসারে আর টানাটানি রহিল না।
অনেক দামের খাঁচাটার জন্য ভাগিনাদের খবরদারির সীমা নাই। মেরামত তো লাগিয়াই আছে। তার পরেও মোছা পালিশ করার ঘটা দেখিয়া সকলেই বলিল, ’উন্নতি হইতেছে।’
লোক লাগিল বিস্তর এবং তাদের উপর নজর রাখিবার জন্য লোক লাগিল আরো বিস্তর। তারা মাস-মাস মুঠামুঠা তনখা পাইয়া সিন্দুক বোঝাই করিল। তারা এবং এবং তাদের মামাতো খুড়তুতো, মাসতুতো ভাইরা খুশী হইয়া কোঠা-বালাখানায় গদি পাতিয়া বসিল।

সংসারে অন্য অভাব অনেক আছে, কেবল নিন্দুক আছে যথেষ্ঠ। তারা বলিল, খাঁচাটার উন্নতি হইতেছে কিন্তু পাখিটার খবর কেহ রাখে না।
কথাটা রাজার কানে গেল। তিনি ভাগিনাকে ডাকিয়া বলিলেন, ’ভাগিনা, একি কথা শুনি?’
ভাগিনা বলিল, ’মহারাজ, সত্য কথা যদি শুনিবেন তবে ডাকুন স্যাকরাদের, পন্ডিদের, লিপিকরদের এবং যারা মেরামত করে এবং যারা মেরামত তদারক করিয়া বেড়ায়।নিন্দুকগুলি খাইতে পায় না বলিয়াই মন্দ কথা কয়।’
জবাব শুনিয়া রাজা অবস্থাটা পরিষ্কার বুঝিলেন। আর তখনই ভাগিনাদের গলায় সোনার হার চড়িল।শিক্ষা যে কি ভয়ঙ্কর তেজে চলিতেছে রাজার ইচ্ছা হইল স্বয়ং দেখিবেন। একদিন তাই পাত্র-মিত্র অমাত্য লইয়া শিক্ষাশালায় তিনি স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত। দেউড়ির কাছে অমনি বাজিল শাঁখ-ঘন্টা, ঢাক-ঢোল কাড়া-নাকাড়া, ত’রী ভেরী, দামামা, কাঁসি, বাঁশি, কাঁসের খোল, করতাল, মৃদঙ্গ, জগঝম্প। পন্ডিতেরা গলা ছাড়িয়া টিকি নাড়িয়া মন্ত্রপাঠে লাগিলেন। মিস্ত্রি মজুর স্যাকরা লিপিকর তদারকনবিশ আর মামাতো, পিসতুতো খুড়তুতো ভাইয়েরা জয়ধ্বনি তুলিল।
ভাগিনা বলিল, মহারাজ, কান্ডটা দেখিতেছেন? মহারাজ বলিলেন, আশ্চর্য, শব্দ কম নয়। ভাগিনা বলিল, কেবল শব্দ নয়, অর্থও কম নাই।
রাজা খুশি হইয়া দেউড়ি পার হইয়া যেই হাতিতে উঠিবেন এমন সময় নিন্দুক ঝিল ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়া, সে বলিয়া উঠিল, ’মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি?’
রাজার চমক লাগিল, ’ঐ যা, মনে তো ছিল না। পাখিটাকে দেখা হয় নাই।’ ফিরিয়া আসিয়া পন্ডিতকে বলিলেন, ’পাখিকে তোমরা কেমন শেখাও তার কায়দাটা দেখা চাই।’ দেখা হইল। দেখিয়া বড় খুশি। কায়দাটা পাখির চেয়ে এত বেশী বড় যে পাখিটাকে দেখাই যায় না। মনে হয় তাকে না দেখিলেও চলে। রাজা বুঝিলেন আয়োজনের ত্রুটি নাই। খাঁচায় দানা নাই, পানি নাই। কেবল রাশি রাশি পুঁথি হইতে রাশি রাশ পাতা ছিঁড়িয়া কলমের ডগা দিয়া পাখির মুখে ঠাসা হইতেছে। গান তো বন্ধ, চিৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোঁজা। দেখিলেই শরীরের রোমাঞ্চ হয়। এবার রাজা হাতিতে চড়িবার সময় কানমলা-সর্দারকে বলিয়া দিলেন, নিন্দকুটাকে যেন আচ্ছা করিয়া কানমলা দেওয়া হয়।

পাখিটা দিনে দিনে ভদ্র, দস্তুরমত আধমরা হইয়া আসিল। অভিভাবকেরা বুঝিল, বেশ আশাজনক। তবু স্বভাবদোষে সকালবেলার আলোর দিকে পাখি চায় আর অন্যায়রকমে পাখা ঝটপট করে। এমনকি এক-একদিনে দেখা যায় সে তার রোগা ঠোঁট দিয়া খাঁচার শলাকা কাটিবার চেষ্টায় আছে।
কোতোয়াল বলিল, ’একি বেয়াদবি!’
তখন শিক্ষামহলে হাপর হাতুড়ি আগুন লইয়া কামার আসিয়া হাজির। কী দমাদ্দম পিটানি! লোহার শিকল তৈরী হইল। পাখির ডানাও গেল কাটা। রাজার সম্মন্ধীরা মুখ হাঁড়ি করিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল, এ রাজ্যে পাখিদের কেবল যে আক্কেল নাই তা নয়, কৃতজ্ঞতাও নাই। তখন পন্ডিতেরা এক হাতে কলম এক হাতে সড়কি লইয়া এমনি কান্ড করিল যাকে বলে শিক্ষা! কামারের পসার বাড়িয়া কামার গিন্নির গায়ে সোনাদানা চড়িল এবং কোতোয়ালের হুঁশিয়ারি দেখিয়া রাজা তাকে শিরোপা দিলেন।     

পাখিটা মরিল। কোনকালে যে তা কেউ ঠাহর করিতে পারে নাই। নিন্দুক লক্ষীছাড়া রটাইল, পাখি মরিয়াছে। ভাগিনাকে রাজা ডাকিয়া বলিলেন, ’ভাগিনা একি কথা শুনি?’ ভাগিনা কহিল, ’মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।’
রাজা শুধাইলেন, ’ওকি আর লাফায়?’ ভাগিনা বলিল, ’আরে রাম!’
’আর কি নড়ে?’
’না।’
’আর কি গান গায়?’
’না।’
’দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়?’
’না।’
রাজা বলিলেন, ’একবার পাখিটাকে আনো তো দেখি।’
পাখি আসিল। সঙ্গে কোতোয়াল আসিল, পাইক আসিল, ঘোড়সওয়ার আসিল। রাজা পাখিটাকে টিপিলেন। সে হাঁ করিল না, হুঁ করিল না। কেবল তার পেটের মধ্যে শুকনো পুঁথির পাতা খস্খস্ গজ্গজ্ করিতে লাগিল।
বাহিরে নববসন্তের দক্ষিন হাওয়ায় কিশলয়গুলি দীর্ঘনঃিশ্বাসে মুকুলিত বনের আকাশ আকুল করিয়া দিল।

Thursday, April 19, 2018

দুর্নীতি দমনই গুরুত্বপুর্ন কাজ' শিরোনামে জনাব আ,ই,মজুমদার সাহেবের একটি নিবন্ধ দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।   তার সাথে একটু দ্বিমত প্রকাশ করে বলতে হয়দুর্নীতি দমন নয় বরং নির্মুল করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যই এই দেশের জন্য অত্যাবশ্যক।   তবে দুর্নীতি নির্মুলই হোক আর দমনই হোক তার জন্য যে শক্ত মেরুদন্ড ও দৃঢ়চিত্ত মানুষের দরকার সে ধরনের মানুষ বাংলাদেশ সম্ভবতঃ জন্ম দিতেই ভুলে গেছে।   দাঁত ভাঙ্গা সিংহ যে শিকার করতে পারে না সেটা কে না জানে? তাই যে দেশে রাজনৈতিক সর্বাধিকারীর সে রকম মনোভাব নেই যে তিনি বা তাঁরা দুর্নীতির মুলোৎপাটন করবেন, সে দেশ থেকে দুর্নীতি দুর হবার কোন সম্ভবনা নেই।   আমাদের দেশের আশেপাশেই সিংগাপুর।   সেখানকার নেতা লি কুয়ান ইউ ছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত 'জিরো টলারেন্স' কার্যকর করার একজন আদর্শ পুরুষ।  তাঁর নীতি ও আদর্শে সিংগাপুর এখনো পরিচালিত হচ্ছে বলে সেখানে করাপশন  দৃশ্যমান নয়।  তেমনই জার্মানী ও জাপান বা ইউরোপের প্রায় সব দেশেই দুর্নীতি প্রায় শুন্যের কোঠায়।   কদাচ কোথাও দুর্নীতি হলে তাতে দুর্নীতিবাজদের ছাড় পাবার কোন উপায় নেই।   কিন্তু আমাদের দেশটি দুর্নীতিকে সাথে নিয়েই জন্মেছে।   যে কারনে খোদ বঙ্গবন্ধুকে পর্যন্ত বলতে হয়েছে লোকে পায় সোনার খনি আর তিনি পেয়েছেন চোরের খনি।   তিনি আরো বলেছেন, সাত কোটি কম্বল আসল;কিন্তু আমারটা গেল কোথায়? কিন্তু এসব বলেই তিনি কাজ সমাপ্ত করেছেন।   তখন যদি একজন দুর্নীতিবাজও ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের সম্মুখীন হতো তবে আজ এই অবস্থা হতে পারত না।  দুর্নীতি দুর করার জন্য সর্বাগ্রে দরকার মুক্ত, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, যেখানে মানুষ তাদের পছন্দমত দুর্নীতিমুক্ত একজনকে ভোট দিতে পারে।   সেটারই কোন অবকাশ এই দেশে এখন নেই।   জনমত যাচাইএর যে একটি পথ ছিল 'গনভোট' ব্যবস্থা, তার বিধানটাই বর্তমান সরকার উঠিয়ে দিয়েছে।  তাই প্রথমেই বলা যায় যে দুর্নীতি দুর করার কোন আগ্রহ বা ইচ্ছা বর্তমান সরকারের (বরং বলা যায় কোন সরকারের) আছে সেটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।   তো এই যে দেশের অবস্থা সেই দেশ থেকে দুর্নীতি দুর করবার জন্য বর্তমান প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থা সেই দাঁতভাঙ্গা সিংহের মত।   এর শিকার করার ক্ষমতা নেই।   বড়জোর একটু গর্জন করতে পারে বুড়ো গলায়।  --- 20/4/2018

Friday, April 13, 2018

শিক্ষা শিক্ষা শিক্ষা
শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এদেশে শোরগোল হৈ চৈ চলছেই। তবে এই হৈ চৈ শোরগোল যে সবটাই কেজো তা বোধ হয় বলা যাবে না। যেমন অভিভাবকদের উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের ওপর অনাবশ্যক পাঠ্য-পুস্তকের বোঝা কমানোর জন্য কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা। কিন্তু অভিভাবকরা সে দিকে যান নি, যাচ্ছেনও না। তারা প্রাইভেট টিউশনির সিস্টেম বন্ধ করে স্কুলে যাতে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়া হয়, তার জন্য আন্দোলন করতে পারতেন। কিন্তু সেটা তারা করছেন না। মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক দরকার। সেই শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না; হচ্ছে টাকা-পয়সার বিনিময়ে বা দলবাজির গুনে গুনান্বিত শিক্ষক নিয়োগ। সেটা বšধ করার জন্য যে আন্দোলন দরকার ছিল সেটা তারা করছেন না। কথায় বলে পাহাড় থেকে নেমে আসা ¯্রাোতস্বিনীকে মাঝপথে আটকানো অসম্ভব। উপরোক্ত সব কিছুকে মেষসুলভ নমনীয়তায় মেনে নেবার পর অভিভাবকদের এই শোরগোল কেবল পানি ঘোলা করতে পারে; কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না।
শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য, বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ফিস আদায়ের কথায় আসা যাক। শিক্ষকরা তো তবু গতর খাটিয়ে পড়িয়ে কিছু টাকা-পয়সা আয়-রোজগার করেন। কিন্তু হঠাত করে সরকারের অসীম বদান্যতায় ডাবল বেতন পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যে ফাইল আটকিয়ে  জনগনের ট্যাঁক খসাচ্ছেন সেটা সম্মানিত অভিভাবকদের চোখে পড়ে না কেন? নাকি শিক্ষকগন ’নরম জায়গা’ বলে? জনগনের ০.০১% সরকারী কর্মচারীদের বেতন ডাবল হলেও আম জনগনের তো আর সেই হারে আয় বাড়েনি। কিন্তু তাদের জন্য তো কোন আলাদা হাট-বাজার নেই। তাই শিক্ষকগন, যারা সেই আম জনতারই অংশ, তারা প্রাইভেট পড়িয়ে যদি দু’পয়সা আয় করেনই তবে অভিভাবকদের তাতে গা জ্বালা করে কেন? তারা কি এ সমাজের বাইরে থেকে আসা ভিনগ্রহের মানুষ? শিক্ষামন্ত্রনালয় তো এর আগে দুর্নীতিতে প্রায় পয়লা নম্বরে স্থান করে নিয়েছিল। সেটা তো আর এমনিতে না। সরকারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত 'nurse the baby, protect the child, free the adult.’ কিন্তু সরকারের কাজই হচ্ছে তেলা মাথায় তেল ঢালা। এই শহরে যে সব স্কুল নিজে স্বয়ং সম্পুর্ন তাদের জন্য এমপিও কেন? তারা তো তাদের শিক্ষকদের মুল বেতনের ৩/৪ গুন পর্যন্ত বেশী বেতন দিচ্ছে। অথচ এই শহরে এমন স্কুলের সংখ্যাই প্রায় ৮০% - ৮৫% যারা স্কুল থেকে মুল বেতনের অর্ধেকই দিতে পারে না। সরকারের কি এসব দিকে খেয়াল দেওয়া উচিত ছিল না? তাছাড়া যে বেতন কাঠামো নির্ধারন করা হয়েছে, সেই একই কাঠামোতে মফস্বলে ও রাজধানী শহরে একই হারে বেতন দেওয়া হচ্ছে। অথচ মফস্বলে যেখানে একটা তিন কামরার সুন্দর মানসম্পন্ন বাড়ীর ভাড়া তিন থেকে চার হাজার টাকা, সেখানে এই শহরে ঐ একই বাড়ীর ভাড়া অন্ততঃপক্ষে বিশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা। সরকারের কি এদিকটাও দেখা উচিত নয়? কিন্তু না; এসব কিছুই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সাহেব বা অর্থমন্ত্রী সাহেবদের মাথায় ঢোকেই না।
এসবই এ দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবিচনা ও অবিচারের নীতি। শিক্ষামন্ত্রনালয় নি¤œপর্যায়ে অনাবশ্যক বিষয় চাপিয়ে সেগুলোর জন্য যেসব শিক্ষক নির্দেশিকা ইত্যাদি চালু করছে, সেসব বি,এড, বা এম, এড পর্যায়েই শিক্ষদের শেখানো হয়ে তাকে। যেটা দরকার সেটা রিফ্রেসারস ট্রেনিং কোর্স হিসেবে করানো যেতে পারে। আর সেটাই বেশী দরকার। কিন্তু এই সব নির্দেশিকা টির্দেশিকা করতে যে অনাবশ্যক বিপুল অংকের অর্থব্যয় হচ্ছে সেটা তো জনগনের পকেট থেকেই আসছে। অথচ এর উপযোগীতা কতটুকু? প্রকৃতপক্ষে থিওরী আর প্র্যাকিটসের মধ্যে যে বহুত পার্থক্য সেটা এই মহামহিমগন কতটুকু বোঝেন তা বোঝা বেশ কঠিনই বটে। এ বিষয়ে বেশী বলা অনাবশ্যক; কারন দেশের জনগনের অর্থনৈতিক অবস্থার সার্বিক মান এবং শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের কতরকমের ক্যাটাগরী সেটা বিবেচনায় নিলে শ্রেণীতে একজন শিক্ষক কতটুকু কি করতে পারেন সেটা যারা ফিল্ডে কাজ করেন তারাই অনেক বেশী বোঝেন। গাছের মগডালে বসে বার্ডস্ আই ভিউ নিয়ে তা বোঝা অনেকটাই কঠিন। কিন্তু সে কথা কে কাকে বোঝাবে?
 যাহোক, শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ম্যা-লা কথা হয় ও হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কতটুকু হচ্ছে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অবস্থা দেখে অনেকটাই ধারনা করা যায়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সাহেব এ-প্লাস পাওয়া নিয়ে যে লড়াই-কসরত করছেন, বাস্তবতার ভিত্তিতে শিক্ষার প্রকৃত মান উন্নয়ন সম্পর্কে তার অর্ধেক চিন্তাও যদি তাঁর থাকত তবে হয়ত পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতে পারত না। কিন্তু কি আর বলা।

এদেশে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এত রকমের এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে যে এদেশটা এক্ষেত্রে সম্ভবতঃ একটা বিশ্ব রেকর্ড গড়তে পেরেছে। সেই পাকিস্তান আমল থেকে এদেশে প্রতিবারই এক একটা শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে আর তার বিরুদ্ধে একশ্রেনীর আঁতেল আদাজল খেয়ে লেগে সেটাকে বস্তাবন্দী করতে বাধ্য করেছে। অনেক কসরত করে শেষাবধি এই হালে ২০১০ সালে একাট শিক্ষানীতি হয়েছে তবে সেটাও সমালোচনার উর্দ্ধে উঠতে পারেনি। বস্তুতঃ শিক্ষানীতিতে যত বেশী কথা বলা হয়েছে কাজ ততটাই কম হয়েছে ও হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ’বুশ আমেরিকা ২০০০ এডুকেশন প্ল্যান’-এর কথাটা এখানে উল্লেখ করা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এই প্ল্যানে বলা হয়েছে ---
Bush ‘America 2000 Plan’ for Education:-
1.       That all children must be physically and mentally ready to learn.
2.       That the graduation rate must rise to 90%, the international standard.
3.       The American students will leave grades 4th, 8th and 12th having demonstrated the highest competency in challenging subjects including English, mathematics, science, history and geography and have a meaningful set of examinations to measure whether they know what they are supposed to know at those levels.
4.       That the American students will be the first in the world in science and mathematics achievements.
5.       That every adult American will be literate and will possess the knowledge and skills necessary to compete in the global economy and exercise the rights and responsibilities of citizenship; and

6.       That every school in America will be free of drugs and violence and offer a disciplined environment conducive to learning.
এখানে ৩ ও ৬-নং উদ্দেশ্যটি কি আমাদের শিক্ষানীতিতে কোন গুরুত্ব পেয়েছে? আজকে শিক্ষার মান নিয়ে যে হাহুতাশ চলছে সেটার পেছনে কারন কি? মোটা দাগে একাধিক কারনের মধ্যে বিশেষ তিনটি কারনই প্রধান। এক, রাজনৈতিক বিবেচনা তথা দলবাজি ও টাকা-পয়সার বিনিময়ে অযোগ্য, অদক্ষ ও আদর্শহীন শিক্ষক নিয়োগ; দুই, শিক্ষাক্ষেত্রে সফ্ট্ওয়্যার (ট্রেনিং, পদোন্নতির জন্য ট্র্যাক রেকর্ড ও পিরিওডিক স্কিল টেস্ট, মোটিভেশন ইত্যাদি)-এর পেছনে ব্যয় না বাড়িয়ে হার্ডওয়্যার (বিল্ডিং ইত্যাদি জাতীয় অবকাঠামো)-এর পেছনে সিংহভাগ ব্যয় এবং সরকারী সিদ্ধান্তের লিকুইডিটি। আমাদের সামগ্রিক শিক্ষার ’goal-ই বা কি? উচ্চ-ডিগ্রীধারী বেকার সংখ্যা বাড়ানো, না কি প্রকৃত কর্মদক্ষ জনসম্পদ বাড়ানো? যদি দ্বিতীয়টিই goal বা উদ্দেশ্য হয় তবে দেশে এত এত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা কি?  দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়িয়ে উচ্চ ডিগ্রীধারীর সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে কোন জাতীয় দুরদর্শিতা বা দেশপ্রেম (?!) কাজ করছে? বিগত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে যে মাননীয় শিক্ষমন্ত্রী শিক্ষার মান বাড়ানোর বদলে পাশের হার বাড়ানোর এক মহাপরিকল্পনা নিয়েছেন। বিভিন্ন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সাহেবগন নাকি পরীক্ষকদের নির্দেশ দিচ্ছেন কাউকে ফেল করানো যাবে না।এই রকম তোগলোকি ব্যবস্থা বহাল রেখে দেশে শিক্ষার মান উন্নত করার যে হাস্যকর ব্যর্থ চেষ্টা সেটা বুঝমান মানুষকে কেবল হাসানো ছাড়া আর কি-ই বা করতে পারে? দেশের শিক্ষার মান এমনই উন্নত হয়েছে যে দেশের লক্ষ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত (??) তরুন-তরুনী থাকা সত্বেও দেশের কর্পোরেট বিজনেসগুলোকে নাকি বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করে আনতে হচ্ছে। এবং সেই পথ দিয়ে দেশ থেকে বছরে নাকি ৩৪/৩৫ হাজার কোটি টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। কি তামশা! এই যদি অবস্থা হয় তাহলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি ধরনের ’মাল’ উৎপাদন করছে? এই প্রশ্নেরও সম্ভবতঃ জবাব দেবার কেউ নেই।

Wednesday, April 4, 2018

Unabated incidents of rape

ইদানিং ধর্ষণ নিয়ে বেশ তোলপাড় হচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়াতে। অনেক প্রগতিশীলদের মত হচ্ছে পোষাক নয় পুরুষের মানসিকতাই এই ন্যাক্কারজনক অপরাধের জন্য দায়ী। কথাটা একেবারে ফেলনা নয়। তবে আরো বেশ কিছু বিষয় অবশ্যই আছে। মানুষ মুলতঃ একটি এনিম্যাল বা প্রাণী। তবে সে র‌্যাশনাল এনিম্যাল। তার বিবেক আছে; আছে লজ্জা। এজন্যই সে অন্য প্রাণীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। প্রাণীরা প্রকাশ্যে প্রাকৃতিক কর্ম সারে, এমনকি যৌনকর্মও। কিন্তু মানুষ তা করে না; করতে পারে না। তাহলে তার ও প্রানীদের মধ্যে আর পার্থক্য থাকে না। তবে এই বিবেক কিভাবে জাগ্রত হয় এবং সঞ্জীবিত থাকে? প্রধানতঃ তা তিনটি কারনে। এক, তার পারিবারিক পরিবেশ ও শিক্ষা; দুই, তার মনের মধ্যে রোপিত ধর্মীয় বিধি-নিষেধের প্রতি অটল শ্রদ্ধা এবং তিন, রাস্ট্রীয় আইনের শাসন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এর কোনটি আমাদের সমাজে বিরাজমান? কাগজে কলমে থাকলেও বাস্তবে কোনটিই নেই। এদেশে এক শ্রেনীর আঁতেল ধর্মীয় বিধি-নিষেধকে পশ্চাৎপদতা বলে তথাকথিত প্রগতিশীলতার ধ্বজা ধরে আছেন। তারা নাকি পাশ্চাত্য ও পৌত্তলিকতার চাদরে মোড়ানো সভ্যতা ও কালচারকে এদেশে চালু করার নিরন্তর চেষ্টায় নিরত। কিন্তু তারা পাশ্চাত্যের ’পারমিসিভনেস’ বা ফ্রি-সেক্স-কে বা কুমারী মাতৃত্বকে পছন্দ করেন না। এ যেন সেই জলে নামব, জল ছিটাবো কিন্তু জল তো ছোঁবনা-র মত আব্দার! সামজিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ধর্মীয় বিধি-নিষেধ মেনে চলার যে কতটা আবশ্যকতা, সেটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন এইডস্-এর ব্যপক বিস্তারের বিষয়ে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন যে ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতা মেনে চলাটা এই দুরারোগ্য ও প্রাণঘাতি রোগের বিস্তারের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। বিল ক্লিন্টন সাহেবকে তো আর প্রগতিবিরোধী বা প্রতিক্রিয়াশীল বলার সাহস ঐ সব আতেঁলদের নেই। প্রকৃতপক্ষে যখন থেকে ধর্মীয় বিধি-বিধানকে পদদলিত করে নিজেদের দুরাকাংখা ও দুশ্চারিত্র্যকে প্রগতিশীলতা বলে চালানোর অপচেষ্টা শুরু হয়েছে, লক্ষ্য করলে পরিষ্কার দেখা যাবে যে তখন থেকেই এই লাম্পট্য ও ধর্ষণকান্ড দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। পবিত্র কোরআন বলে, তোমরা (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) যখন রাস্তায় চলবে তখন যেন তোমাদের দৃষ্টি নত থাকে। আরো উত্তম উদাহরন হচ্ছে মনে মহান আল্লাহতায়ালার ভয় লালন করা। কারন মুসলমান রোজা রাখে এমনকি সারাদিন এক ফোঁটা পানিও না খেয়ে। অথচ গোপনে পেট পুরে খেলেও তো তাকে কেউ দেখছে না। তবুও কেবল আল্লাহতায়ালার ভয়েই সে পানাহার থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখে। এই একটি বিষয়ই কি অনেক কিছু বোঝার জন্য যথেষ্ঠ নয়? যদি মানুষের মনে খোদাভীতি কাজ করে তবে সমাজে বহু পাপ ও দুষ্কৃতি দুর না হয়ে পারেই না। কিন্তু এ কথাটা কে কাকে বোঝাবে?

Thursday, March 22, 2018

নি¤œতম উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরন
বাংলাদেশ গতকাল নি¤œতম (লীস্ট বলতে নি¤œতম-ই বোঝায়) উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের খেতাব পেয়েছে। এটা খুবই আনন্দের সংবাদ বটে। তবে আজ আবার এক খবরে দেখা গেল এর জন্য বেশ কয়েকটি শর্ত, একটু ভদ্র ভাষায় চ্যালেঞ্জ, আরোপ করা হয়েছে, যা পুরন করতে পারলে ২০২৪ সাল নাগাদ বাস্তবিকই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরন ঘটবে। এসব চ্যালেঞ্জ সত্বেও বাংলাদেশের মানুষের যে উচ্ছ্বাস সেটা ছোট করে দেখা যায় না। তবুও কয়েকটি বিষয়ে মনে প্রশ্ন জাগে। যখন বর্তমান ঘোষিত ডিজিটাল উন্নয়নের জন্য রকেট গতিতে না হলেও অন্ততঃ মেল ট্রেনের গতিতে ছোটা অত্যাবশ্যক, সেখানে আমরা কি এখনো গরুর গাড়ীর চেয়ে বেশী গতিতে এগুতে পারছি? নাকি সেই পুঁথির পয়ারের মত ’ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ - এমন অবস্থা আমাদের? সরকারী উন্নয়নের ফিরিস্তিতে যে লাখো কোটি টাকার ঝনঝনানি শুনতে পাওয়া যায় তা কি সেই পুঁথির মতই ’লাখে লাখে লোক মরে কাতারে কাতার, হিসাব করিয়া দেখে চল্লিশ হাজার’ - মত অবস্থা?
এসব বিষয় ভাবতে গেলে অনেক দিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে। সম্ভবতঃ ১৯৭৮/৭৯ সালের দিকে। মহকুমা শহর ঝিনাইদহে (তখনো মহকুমা থেকে জেলায় উত্তরন ঘটেনি) তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা আসবেন স্বানির্ভর আন্দোলন বিষয়ে বক্তব্য দেবার জন্য। মহকুমা প্রশাসককে  সে লক্ষ্যে এক সুধী সমাবেশের আয়োজন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারী কর্মকর্তাদেরকে বেলা দশটার মধ্যেই যথাস্থানে উপস্থিত থাকতে বলা হ’ল। আমরা সকল কর্মকর্তা যথাসময়ে হাজির হ’লাম সেখানে। এরপর সময় যেতে লাগল। জরুরী দাপ্তরিক কাজকর্ম ফেলে সবাই অপেক্ষা করছেন। এক ঘন্টা, দু’ঘন্টা, আড়াই ঘন্টা চলে গেল। শেষে শোনা গেল উপদেষ্টা মহোদয় আর আসবেন না। মহকুমা প্রশাসক দু’একজনকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সুযোগ দিয়ে সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষনা করবেন এ সময় আমি বললাম আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিতে, কিছু বলার জন্য। অনেকটা অনিচ্ছা ও বিরক্তি সত্বেও আমাকে বলার সুযোগ দেওয়া হ’ল। আমি বললাম স্বনির্ভর আন্দোলন কেবল ভাষন ও বক্তৃতাবাজি করে সফল করার কোন সুযোগ নেই। মাত্র মাসখানেক আগে চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং মারা গেছেন। কিন্তু তার মত বিশ্ব কাঁপানো নেতার মৃত্যুতেও চীন মাত্র এক মিনিট কর্মবিরতি দিয়েছে। কাজকর্ম বন্ধ করে তারা বক্তৃতা বা ভাষন দেবার ও শোনার জন্য বসে থাকেনি। স্বনির্ভর হতে গেলে কাজ করতে হয়। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। আর যারা কাজ করেন তারা বক্তৃতা বা ভাষনে সময় নষ্ট করেন না। এ বিষয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বৃটিশ প্রাইম মিনিষ্টার উইনস্টন চার্চিল সবচেয়ে ক্ষুদ্র বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ’লেডিজ এন্ড জেন্টলমনে, লেটস্ গেট টু ওয়ার্ক।’ এটুকু বলেই তিনি বক্তৃতা সমাপ্ত করে কাজে নেমে পড়েছিলেন। আর আমরা এখানে দু’আড়াই ঘন্টা কাজকাম ফেলে বসে আছি স্বনির্ভর হবো বলে।
বস্তুতঃ আমার এ বক্তৃতায় মহকুমা প্রশাসকসহ দু’একজন একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেও বেশীরভাগ লোকই তাতে সমর্থন করলেন। অবাক হতে হয় সেই ঐতিহ্য আজও সমানে চলছে দেখে। এর কারন খুঁজতে গেলে দেখা গেছে যখন শাসকদের কাছে কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে না, থাকে না আদর্শ, তখন সেই ফাঁকা জায়গা নানা ভেল্কি দিয়ে জনগনের একটা শ্রেনীকে মোহগ্রস্থ করে এবং অপর শ্রেনীকে উন্মাদনাগ্রস্থ করে পুরন করতে হয়। এই পদ্ধতি হিটলার ও মুসোলিনি বেশ ভালভাবেই কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। ধর্মকে হিটলার প্রতিস্থাপন করেছিলেন তার নাজী দর্শনকে এক উন্মাদনার বিষয় হিসেবে কাজে লাগিয়ে। তার বিরাট নাৎসী বাহিনীকে ঘন্টার পর ঘন্টা ’হেইল হিটলার’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকতে হ’তো। তার এই উন্মাদনা জনমানসে এমনই উন্মাদনা সুৃষ্টি করেছিল যে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে রে‌্যাম ও রিবেনট্রপকে ফাঁসির মঞ্চে উঠানোর পর তারা ’হেইল হিটলার’ বলে চীৎকার দিয়ে ছিলেন। জোসেফ গোয়েবল্স তো ফ্যুরার নেই যে পৃথিবীতে সে পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার কোন মানেই নেই বলে তার স্ত্রী ও এগার জন সন্তানসহ বিষপানে আত্মহত্যা করেছিলেন। এদেশেও দেখা যাচ্ছে যখন যখন সুনির্দিষ্ট কোন আদর্শ নেই, লক্ষ্য নেই, সময়ের কোন মুল্য নেই, যখন একদিনের কাজে এক মাস, এক মাসের কাজে বছরের ধাক্কা লাগছে, চারদিকে লুটপাটের মচ্ছব চলছে, চলছে সুশাসনের অনুপস্থিতি; চারিদিকে যখন ’নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’, তখন সেদিক থেকে দৃষ্টি ফেরানোর জন্য নানা অজুহাতে উন্মাদনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আর সেই উন্মাদনায় সতের কোটি মানুষের ক্ষুদ্র একটি অংশ ভেসে যাচ্ছে আর অপর বৃহত্তর অংশটি যেন কি এক মাদকতায় মোহগ্রস্থ হয়ে আছে।
উপরোক্ত বিষয়গুলিকে নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায় আমরা সত্যি সত্যিই মোহগ্রস্থতার এক ঘুর্নিপাকে পড়েছি। স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর পরেও আমরা সেই পুরান ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে চলেছি। এমনই সে ঘুির্নপাক যে তার থেকে বেরুনোই যেন অসম্ভব হয়ে দাঁিড়য়েছে। সামনের দিকে তাকানোরও ক্ষমতা, সাহস বা যোগ্যতা কোনটাই যেন নেই। একটা দেশকে দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিতে যে জাতীয় ঐক্যমত, সহযোগীতা ও একাত্মতাবোধ অত্যাবশ্যক, সেগুলো পাশে ঠেলে নানা রকম বিভক্তির ফাটলে নিজেদেরকে আটকে ফেলেছি। আমাদের অবস্থা সেই বানরের মত, যে একফুট উপরে উঠতে গেলে দ’ুফুট পিছলে নীচে নেমে যায়। প্রকৃতপক্ষে দেশকে উন্নত করে গড়তে আমাদের দ্বিগুন তিনগুন গতিতে কাজ করা দরকার। যে কাজ এক বছরে শেষ হবার জন্য নির্ধারিত, সে কাজ যেন এক দু’মাস আগেই শেষ করা যায়। অফিসিয়াল কাজে ফাইলের গতি যেন শামুকের মত না হয়ে খরগোসের গতিতে চলতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে যেন তিনবার চারবার রিভাইজ না করতে হয়। দুর্নীতির বিষয়ে যেন প্রকৃতই ’জিরো টলারেন্স’ কার্যকর হয়। এসব না হলে কেবল কল্পিত ’জয়োল্লাসে’ উন্মাদনাগ্রস্থ হয়ে পড়লে কোন ’ভিশনই’ সময়মত সফল করার আশা করা যায় কি?

Wednesday, February 28, 2018

গনতন্ত্র এবং বাংলাদেশ


স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে বাংলাদেশের গনতন্ত্রের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে হতাশ না হয়ে পারা যায় না। মুখে আমরা গনতন্ত্র গনতন্ত্র বলে যতই চেঁচামেচি করি না কেন, গনতন্ত্রের সত্যকার চেহারা আমাদের মনে হয় অজানাই থেকে গেছে। এর কারন খুজতে গেলে দেখা যাবে যে আমাদের গনতন্ত্র কেবল পাচ বছর পর একদিন ভোট দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অত:পর এই পাচ বছরের মধ্যে ভোটারদেরকে আর কেউ পাত্তা দেবার কথা ভাবত্ওে চায় না; তাদের সুখ-দু:খের কথা, সুবিধা-অসুবিধার কথা ভাবা দুরে থাক। কিন্তু এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কি নেই? নিশ্চয়ই আছে। তবে তার জন্য কতিপয় ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে সংযুক্ত করা অতি আবশ্যক ছিল। আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। তব্ওু দু:খের সাথে বলতে হয় তাড়াহুড়ো করে সংবিধান রচনা করার কৃতিত্ব লাভের আকাংখায় সেই অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির দিকে যথাযথ মনোযোগ দ্ওেয়া হয়নি। আমাদের সংবিধান পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি লক্ষ্যনীয় সেটি হলো গনতন্ত্রের ছদ্মাবরনে একধরনের স্বৈরতন্ত্র কায়েম করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা রাখা। সন্দেহ জাগে হয়ত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি অতিআনুগত্যের মনোভাবই এই মারাত্মক ত্রটির কারন ছিল। আজ অবধি সংবিধান যেভাবেই সংশোধন করা হয়ে থাকুক না কেন - প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিরই হোক আর পার্লামেন্টারী পদ্ধতিরই হোক - সরকারপ্রধানই সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক । তার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করার কোন মসৃন পথ রাখা হয়নি। মহামান্য প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিক প্রধান। কিন্তু সাবেক বিচারপতি জনাব শাহাবুিদ্দন সাহেবের ভাষায় মিলাদ পড়া আর ’উদ্বোধন’ ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা তাকে দ্ওেয়া হয়নি। সংবিধানের এই মারাত্মক ত্রুটির জন্যই এদেশে গনতন্ত্র জনগনের কল্যানে কার্যকর কোন ভ’মিকা পালন করতে সম্পূর্ন ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েকশ’ বছর্ওে এই গনতন্ত্র জনগনকে যে কিছু দিতে পারবেনা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই সংবিধানে নি¤েœাক্ত বিষয়গুলি সংযুক্ত করা অত্যাবশ্যক; অবশ্য আদৌ যদি আমরা গনতন্ত্রকে কার্যকর অবস্থায় দেখতে চাই। বিষয়গুলি নি¤œরূপ:
১. ব্যক্তিভিত্তিক নির্বাচন নয় বরং দলভিত্তিক নির্বাচন হবে। দলীয় মেনিফেস্টো রেড্ওি এবং টিভিতে প্রয়োজনে এক মাস ধরে প্রচারিত হবে। যে কোন রকম আঞ্চলিক ্ও ব্যক্তিগতভাবে প্রচার-প্রচারনা নিষিদ্ধ করতে হবে।
২. সাধারন নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পার্লামেন্টে বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্য নির্ধারিত হবে। কোন দল প্রদত্ত মোট ভোটের অন্যুন ৩% ভাগ পেতে ব্যর্থ হলে সেই দল বিলুপ্ত বলে ঘোষিত হবে।
৩. নির্বাচনের দুই বছর পর বিশ্বাসযোগ্য জনমত যাচাইএর মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধির জনপ্রিয়তার পরিমাপের ব্যবস্থা রাখা। এই জনমত কমপক্ষে ৫০% এর কম হলে ঐ প্রতিনিধিকে রি-কল করার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং সেই শুন্য পদে গ্রহনযোগ্য নতুন ব্যক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। সেটা স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য বা গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নেত্ওা হতে পারে।
৪. প্রেসিডেন্ট ও/বা স্পীকার নির্বাচিত হবার পর তাকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে ই¯তফা দ্ওেয়া বাধ্যতামুলক করা এবং পরবর্তীতে তাকে ভোটপ্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবার বিধান রাখতে হবে।
৫. এক ব্যক্তি একই সাথে দলীয় প্রধান, সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। অর্থাৎ একই ব্যক্তি একাধিক পদে থাকতে পারবেন না।
৬. প্রেসিডেন্ট সংখ্যাগুরু দলের মনোনীত হল্ওে বিরোধী দলের অন্তত: ২/৫ অংশ সদস্যের সমর্থন লাভ আবশ্যিক করতে হবে।
৭. ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদের দেশের মত উন্নয়নশীল দেশে অতীব প্রয়োজন এবং এ বিষয়টি বিভিন্নভাবে প্রমানিত হয়েছে বিধায় প্রেসিডেন্টকে যে কোন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিল ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
৮. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হল্ওে আইনের দৃষ্টিতে কাউকেই কোন রকম প্রিভিলেজ না দ্ওেয়ার বিধান রাখতে হবে। সকল প্রকার ট্যাক্সের টাকা জনগনের টাকা; তাই ’ট্যাক্স-ফি’্র প্রথা স¤পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
৯. সংবিধানের বিধি অনুযায়ী ’আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমান অধিকার’কে কেবল কাগজে না রেখে বাস্তবে সুনিশ্চিত করতে হবে।
১০. বিচার, শিক্ষা, এক্সিকিউটিভ বিভাগ এবং আইন-শৃংখলা বাহিনী দলীয়করনকে শা¯িতযোগ্য অপরাধ হিসেবে  গন্য করার আইন পাশ করতে হবে।
১১. সরকারী চাকুরীবিধির মাথায় পা দিয়ে রাজনৈতিক দলের লেজুড় হবার সুযোগ কঠোরভাবে
নিষিদ্ধ করতে হবে। এহেন কর্মকান্ডের জন্য সংক্ষিপ্ত তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি(দের)কে কোন রকম সুযোগ-সুবিধা ব্যতিরেকে বরখাস্ত করার বিধান করতে হবে।
১২. পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সকল সাংবিধানিক পদে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিল্ওে জাতীয় সংসদে শুনানীর মাধ্যমে তাকে স্থায়ী করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলি এদেশে বর্তমানে প্রচলিত গনতন্ত্রের খোলসে ছদ্ম স্বৈরতন্ত্রকে বিদুরিত করার জন্যই অপরিহার্য্য বিধায় অবিলম্বে জনসচেতনতা ্ও জনমত তৈরী করার লক্ষ্যে সকল ধরনের মিডিয়াকর্মীসহ সকল স্তরের জনগনকে এগিয়ে আসতে হবে। আরো একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। দেশে ’সমাজতš’¿ বলতে কিছু নেই, এটা পরিষ্কার। তাই মুক্তবাজার অর্থনীতি বহাল রেখে সংবিধানে সমাজতন্ত্র চার মুলনীতির একটি হিসেবে রাখা যে চরম স্ববিরোধী তা সুস্পষ্ট। এতদসত্ব্ওে ’সমাজতন্ত্র’ ’সমাজতন্ত্র’ বলে চেঁচামেচি করাটা জাতির সাথে প্রতারনা করা কি না সেটা ভেবে দেখা দরকার। আর একটি বিষয়। ইসলামকে রাস্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে রাখার ব্যপারে যারা যুদ্ধংদেহী তাদেরকে পন্ডিত নেহরুর সার্বজনীন ভোটাধিকারের গনতন্ত্র স¤মন্ধে আসক্তির বিষয়টি মনে রাখতে অনুরোধ করি। ’এক ব্যক্তি এক ভোট’ - এই নীতির ভিত্তিতে ভারত যদি ঐক্যবদ্ধ থাকত তবে আজ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার যা করছে তাই কি হতো না? এবং সে ক্ষেত্রে মুসলমানদের কোন বক্তব্য বা মতামত পাত্তা পেত কি? তাছাড়া মহাত্মা গান্ধীকে সত্যিই ’মহাত্মা’ বলে মানেন  এমন ’বিদগ্ধ’ ব্যক্তির অভাব এদেশে নেই। ধর্মের সাথে রাজনীতির সম্পর্কের বিষয়ে মহাত্মা বলেছেন, ’যারা বলেন রাজনীতির সংগে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই তারা জানেনই না ধর্ম জিনিসটা আসলে কি।’ আশা করি এ বিষয়েও দেশের বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ কিছু আলোকপাত করবেন। তাছাড়া মহান আল্লাহ-র ওপর আস্থা ও বিশ্বাস যারা রাখতে নারাজ, তারা আসলেই কোন ধর্ম অনুসরন করেন বা আদৌ করেন কি না তাও দেশের আম জনগন জানতে পারলে কৃতার্থ হতো।  যারা দেশের প্রথম সংবিধান রচনার কৃতিতের অধিকারী, তাদের কাছ্ওে সনির্বন্ধ অনুরোধ, আপনার্ওা উপরে বর্ণিত যুক্তিগুলির গ্রহনযোগ্যতা বিচার করবেন এবং এগুলি আমাদের সংবিধানে সন্নিবেশিত করার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করবেন। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনাদের কাছে জাতির ভবিষ্যত মঙ্গলের জন্য এই আহ্বান জানাচ্ছি।
১৫.০৩.২০১২        এম, শ্ওকত আলী (X-Headmaster); উত্তরা; ঢাকা - ১২৩০। 
পুুনশ্চ: লেখাটি অনেক আগেকার হলেও এর প্রাসঙ্গিকতা আরো বেড়েছে বলেই আমার ধারনা। তাই এটা ছাপলে বাধিত হবো। 

Saturday, February 10, 2018

দেশ এগিয়ে চলছে।


ইদানিং আঁতেল শ্রেনীর অনেককেই বলতে শোনা যায় ’দেশ এগিয়ে চলছে।’ কথাটা শুনে মাঝে মাঝে ভাবতে হয় এগিয়ে চলা আসলে কাকে বলে। শামুকও এগিয়ে চলে, গরুর গাড়ীও এগিয়ে চলে আবার মোটরকারও এগিয়ে চলে। এখন তুলনা করা যায় কি যে কোনটি আসলে এগিয়ে চলে?  গরুর গাড়ী ঘন্টায় বড়জোর ৪/৫ মাইল যায় অথচ মোটরগাড়ীর গতি কমপক্ষে তার দশগুন। দেখা যায় গরুর গাড়ী চালানোর জন্য কোন লাইসেন্স লাগেনা। কিন্তু মোটরকার চালানোর জন্য লাইসেন্স অত্যাবশ্যক। একটা দেশের এগিয়ে চলার বিষয়ে যদি গরুর গাড়ীর এগিয়ে চলার কথাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় তবে সেটা কি প্রকৃতই এগিয়ে যাওয়া বলা যায়? বিষয়টি খোলসা করার জন্য নি¤œবর্নিত কিছু বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষন করা যেতে পারে।
দেশের প্রানভোমরা যেখানে সেই রাজধানীর কথাই ধরা যাক। এখানে কোন প্রশাসন, কোন সিস্টেম, কোন পরিকল্পনা কি কার্যকর আছে? সরকার আছে, আইন-শৃংখলা বাহিনী আছে, আমলা-ফয়লা, মন্ত্রী-সান্ত্রী আছে, কিন্তু এই শহরের বাসিন্দারা এইসব থাকার জন্য কোন সুবিধা কি পাচ্ছে? রাস্তায় এক ঘন্টার জায়গায় ৩/৪ ঘন্টা, লক্কড়-ঝক্কড় বাস ও অন্য যানবাহনের প্রানঘাতি অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে অবাধে। অথচ রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ আছে, যানবাহন বিষয়ক ’অথরিটি’ আছে। শহরে রাস্তাঘাট দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর নালা-নর্দমা, খানা-খন্দে ভরা, ড্রেনের আবর্জনার অসহনীয় দুর্গন্ধ, সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ছয়লাব, সড়কের ওপর মোটরগাড়ীর বেপরোয়া পার্কিং, কোন রকম পার্কিংস্পেস ছাড়াই রাস্তার ওপর বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক-হাসপাতাল, শপিংমল ইত্যাদি কি এটা বোঝায় যে এই রাজধানী শহরে কোন কার্যকর ’অথরিটি’ আছে যারা এই শহরটিকে একটি সুশৃংখল, সুস্থ, শান্তিপুর্ন ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে রক্ষনাবেক্ষন করছে?
এই দেশে কতশত নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহন করা হচ্ছে এবং বড় গর্ব করে বলা হচ্ছে ’দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে।’ অথচ ৯৮% প্রকল্প আঠারো মাসে বছর করে এক বছরের কাজ তিন চার বছর লাগাচ্ছে, শ’কোটি টাকার স্থলে হাজার কোটি টাকা খেয়ে ফেলছে। যতটা উন্নয়নখাতে ব্যয় হচ্ছে তার প্রায় ২৫% - ৩০% বিদেশে পাচার হচ্ছে। আইনসংগতভাবেই (??) কিছু ব্যক্তি/গোষ্ঠিকে পাবলিকের টাকা লোপাট করার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। বছরের পর বছর কুইক রেন্টাল নামের বিদ্যুতকেন্দ্রের মাধ্যমে নাকি তা করা হচ্ছে। অথচ সরকার আছে; তার বিভিন্ন মন্ত্রনালয় আছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রতিবছর বাজেটের অংক বাড়িয়ে বিরাট আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। কিন্তু এক টাকার কাজে একশ’ টাকা ব্যয়ের বিষয়ে কখনো তার বক্তব্য তো শোনা গেল না। বছর বছর যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে সে বিষয়েও তাকে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেবার প্রচেষ্টা লক্ষ্যনীয় হলো না। বরং তিনি চার/পাঁচ হাজার কোটি টাকা লুট-লোপাটকে ’সামান্য ব্যপার’ বলে শিবনেত্র হয়ে থাকাকেই পছন্দ করেছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপী লোন গোটা ব্যাংক ব্যবস্থাকে ছ্যারাবেরা করে ফেললেও তাকে তেমন উদ্বিগ্ন হতে দেখা গেলনা। খোদ রাস্ট্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেলেও তার ’সাড়া জাগতেই’ বছর পার হয়ে গেল।
খোদ এই শহরের উল্লেখযোগ্য ২৬/২৭টি খাল নালার অধিকাংশই দখল-ভরাটের কবলে শেষ হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বাইরে সারা দেশব্যপী নদী-নালা, সরকারী খাসজমি, রেলের জমি, বাড়ীঘর, বালু মহাল অবলীলায় দখল বেদখল হয়ে গিয়েছে বা যাচ্ছে। এমনকি গুরুত্বপুর্ন ব্রিজএর সন্নিকটেও অবাধে বালু তুলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঐ ব্রিজকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। এ বিষয়ে সব সরকারের আমলেই এইসব দখলদারদের ব্যাপারে হাতেম তাই-সুলভ উদারতা দেখানোয় কোন সরকারেরই অনাগ্রহ দেখা যায় নি। অথচ সরকারগুলো নাকি অবৈধ কর্মকান্ড প্রতিরোধ করার জন্যই আইন-আদালত স্থাপন করে; শান্তি-শৃংখলা বহিনী পুষে থাকে পাবলিকের কাছ থেকে আদায়কৃত ট্যাক্সের টাকায়। 
দেশে পর্যটনের জন্য এত এত আকর্ষনীয় জায়গা থাকার পরও এই খাতে এই ৪৫/৪৬ বছরে কি উন্নতি সাধিত হয়েছে? এই পাশের দেশ সিংগাপুরে ৯০% পর্যটন স্পট কৃত্রিম, মানবসৃষ্ট।   অথচ সেখানে মাসে প্রায় দশ লাখ পর্যটক গেলেও হাজার হাজার পর্যটন স্পট থাকা সত্বেও বাংলাদেশে বছরে পাঁচলাখ পর্যটক আসে কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।  তাহলে এখানে সরকারের ভুমিকাটা কি?
দেশের আইন-শৃংখলা বিষয়ে বোধহয় কিছু না বলাই ভাল। আইন যে কাদের প্রতি নির্মম আর কাদের প্রতি ’হাজি মহসিন’/হাতেম তাই’ সেটা তো দেশবাসী ইতিমধ্যে বেশ ভালভাবেই জেনে গেছে। দেশে যখন তথাকথিত ’নাশকতা’ এবং জিহাদী বই (??) রাখার দায়ে হাজার হাজার ব্যক্তিকে পাইকারী গ্রেপ্তার করে জেলে রাখতে হয়, সেই দেশ কিভাবে এগিয়ে চলে সেটা বেশ গবেষনার বিষয নয় কি?
দেশে ভয়াবহভাবে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির বিষয়ে এমনকি সরকারের গুরুত্বপুর্ন মন্ত্রীদেরকেও সময়ে সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। সরকারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কখনো ’জিরো টলারেন্স’ কখনো ’জিহাদ’ ঘোষনা করে ক্ষমতায় আরোহন করে। কিন্তু সেই সব সরকারের মন্ত্রীরাই স্বীকার করেন যে  তারা দুর্নীতিবাজ, চোর। সরকারের এমন কোন বিভাগ নেই যেখানে দুর্নীতি জাঁকিয়ে বসেনি। সাধারন মানুষের ট্যাঁকের পয়সায় যারা বেতন-ভাতা ভোগ করেন, আয়েসী জীবন যাপন করেন, তারাই সেই জনগনকে হীন প্রজা হিসেবে দেখেন। টাকা-পয়সা ছাড়া সরকারের কোন দপ্তর কাজ করানো প্রায় অসম্ভব। কেন, কিজন্য?
সরকার দেশের সকল নাগরিকের জন্য; নিশ্চয়ই কোন বিশেষ শ্রেনীর জন্য নয়। তাহলে সরকার ব্যবসায়ীদেও ন্যায্য অন্যায্য সকল দাবী অবলীলায় মেনে নিলেও যে কৃষক দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড, সেই কৃষকের বৃহত্তর কল্যানের জন্য কোন পদক্ষেপ কি নিচ্ছে? ব্যবসায়ীরা তিন টাকার দ্রব্য তিরিশ টাকায় বেচতে পারলেও কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মুল্য কি পাচ্ছে? দেশের মোট জনসংখ্যার বড়জোর ৫% ব্যবসায়ীদের জন্য ৭০% জন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি সংসদে থাকলেও ৮৫% কৃষকের জন্য তাদের কোন প্রতিনিধি কি জাতীয় সংসদে আছে?্র সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্নতার দাবী করলেও যারা সেই খাদ্যের উৎপাদক, ব্যবসায়ীদের তুলনায় তাদের কল্যানের জন্য সরকার কি করে? আজও বহু প্রত্যন্ত এলাকায় কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে কৃষক তার ফসল পানির দামে বিক্রী করতে বাধ্য হয়। সামান্য একটা ব্রিজ-কালভার্টের জন্য তাদেরকে বাঁশের সাঁকো বা ডিঙ্গি নৌকা সম্বল করতে হয় অথচ বহু ফাঁকা জায়গাতে লিংকরোডবিহিীন শুধুমাত্র একটি ব্রিজ সরকারের উন্নয়নের দাবীকে যেন ব্যঙ্গ করতে থাকে। কেন? সরকারের বড় বড় বুলি সত্বেও অকালে বাঁধ ভেঙ্গে কৃষকের ফসল ডুবে ধ্বংস হয়ে যায় অথচ সেই বাঁধ রক্ষার দায়িত্বে যারা তাদেরকে কোন জবাবদিহি করতে হয় না। অসহায় কৃষকের আর্তনাদ বাতাসেই মিশে যায়।
 যে দেশে কোন অবকাঠামো বিষয়ক প্রকল্প এক বছরের স্থলে ৪/৫ বছর পর্যন্ত লাগিয়ে দেয়, বরাদ্দের অংক কোন প্রশ্ন ব্যতিরেকে ক্রমাগতভাবে বাড়িয়েই চলে আর সরকার তা উদারভাবে অনুমোদন করে যায় সে দেশ কিভাবে ’এগিয়ে চলে?’ কিভাবে সে দেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হবে বলে গালগল্প করা হয়? যে দেশ সম্পর্কে কবি বলেছেন ’ধন-ধান্য পুষ্পে ভরা’, যা অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ তার সন্তানেরা, যার ’বুকভরা মধু’, সেই দেশকে উন্নত দেশে পরিনত করতে চার যুগ লেগে যেতে পারে? তাই যদি হয় তবে দেশে কি সত্যিই কোন সরকারের প্রয়োজনের বিষয়টি কি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে না? তাদের ও তাদেরঢাকবাজিয়েদের ’দেশ এগিয়ে চলেছে’ এই কথা কি চরম হাস্যকর হয়ে পড়ে না? কোন বিশেষ সরকার নয়, এদেশে সব সরকারই কি প্রকৃত উন্নয়ন বা উন্নয়নের গতি সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছে? তা যদি পেরে থাকে তবে তারা কি এই পাশের দেশ সিংগাপুর বা মালয়েশিয়ার কথা জানে না? একেবারে ধ্বংসস্তূপ থেকে ২৫/৩০ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে জার্মানী বা জাপানের কথা কি তারা জানে না? তাই বলতে হয় যে উন্নয়ন বা উন্নয়নের গতি আসলে কি সে সম্পর্কে আমাদের সরকারগুলোর আসলেই কোন ধারনা আছে, এটা কি প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে পড়ে না?