বাংলাদেশ নাকি বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে আছে। কিন্তু উন্নয়ন আসলে কাকে বলে? চতুর্দিকে অরাজক পরিস্থিতি বহাল রেখে দেশ উন্নয়ন করছে বলে যারা বগল বাজাচ্ছেন তাদেরকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। কোন উন্নয়নকামী দেশে ঘরে ঘরে অলিতে গলিতে বিশ্ববিদ্যালয, এমনকি স্কুল কলেজ থাকে? অলিতে গলিতে খেয়ালখুশীমত দোকান-পশারী, গ্যারেজ-কারখানা থাকে? সম্পুর্ন অপরিকল্পিত বাড়ীঘর, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, কোন রকম পার্কিং প্লেস বিহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক, শপিংমল, কমিউনিটি সেন্টার থাকে? শহরে ব্যস্ত রাস্তার পাশেই অবাধে হকার বা কাঁচামালের বা মাছ-মাংসের দোকান থাকে?
সরকার প্রতি বছর নানা ভাবে নানা রঙের করারোপের মাধ্যমে সরকারী খাজাঞ্চখানা ভরছে। অথচ সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা এজেন্সীর নাকের নীচে পিওন-দারোয়ান-মিটার রীডার-ড্রাইভার রাজধানীসহ নানা শহরে গ্রামে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাসাদ বানাচ্ছে; কিন্তু তাদেরকে কেউ জিজ্ঞাসা করছে না ১০/১৫ হাজার টাকা বেতন পেয়েও এত টাকা তারা ব্যয় করে কিভাবে, এত টাকা পায় কিভাবে। সরকার তার কর্মচারীদের বেতন বর্তমানে সাধারন মানুষের আয়-ইনকামের তুলনায় কয়েকগুন বেশী প্রদান করছে। এতে বাজারে দ্রব্যমুল্যের উর্দ্ধগতিতে সাধারন মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও সরকারের তাতে কিছু এসে যাচ্ছে না। বর্তমানে আয় বৈষম্য এতটাই বেড়েছে যে তাতে অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মানুষের মাথাপিছু আয় দেখানো হচ্ছে ১৬৭০ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় $=১,৩৭,০০০/= (এক লাখ সাঁয়ত্রিশ হাজার টাকা)। কিন্তু এই অংক যে বিরাট শুভঙ্করের ফাঁকি সেটা যে কোন সাধারন জ্ঞান সম্পন্ন মানুষও বোঝে। দেশের ৮৫% মানুষের এই মাথাপিছু আয়ের সাথে কোন সম্পর্ক আছে?
বর্তমান সময়ে উন্নয়নের যে মচ্ছব চলছে তাতে এই উন্নয়নের মুল্য যে কত বেশী সেটা বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া থেকেই প্রকট হয়ে ওঠে। যেখানে প্রকৃত ব্যয় হাজার টাকা সেখানে ব্যয় বরাদ্দ করা হয় দশ হাজার। তাও আবার নির্দিষ্ট সময়ে তা শেষ হয়না বলে তার বরাদ্দ ও মেয়াদ বারবারই বাড়ানো হয়। এ ব্যাপারে কারো কোন জবাবদিহিতা নেই।
দেশের যত্রতত্র ইচ্ছামত বাড়ীঘর বানানো, দোকান-পশারী বসানোর ওপরে কারো নিয়ন্ত্রন নেই। ব্যস্ত রাস্তার পাশে লাখো লাখো দোকানপাট বসছে। যেখানে সেখানে বাড়ীঘর নির্মান করা হচ্ছে। হাইওয়ের ওপর নানা রকম বাজার-হাট বসছে। দেশের এক হাজার মাইল রাস্তাকে নিরাপত্তাহীন করে তার দুপাশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দোকানপাট বাড়ীঘর বানানো হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে ফ্রি-স্টাইল চলছে।
এসবই কি উন্নয়নের মহাসড়কে চলার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়? অথচ উপরোক্ত সব অনিয়ম ও অনাচারের গতি থামানো সম্ভব যদি সত্যিকার উন্নয়ন করার দৃঢ় সংকল্প সরকারের তাকে। বর্তমানে দেশ ডিজিটাল হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সুবিধাকে কাজে লাগানো হচ্ছে না। আবার সেই সুবিধাকে জায়গামত কাজে না লাগিয়ে অ-জায়গাতে লাগানো হচ্ছে। ডিজিটাল সুবিধা কি কেবল মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকীর্ন করার জন্য? অথচ এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি দোকানপাট, গ্যারেজ-ওয়ার্কশপ, হাসপাতাল-ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার, এমনকি গ্রাম্য হাটবাজার দোকানপাট ইত্যাদিকেও ডাটাবেজের আওতায় আনা যায়। দেশে চলমান প্রতিটি যানবাহন ডাটা বেজের আওতায় আনা যায়। এর মাধ্যমে দেশে গাড়ীচোরদের অপকর্মকেও ৯০% নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মকান্ড, আয়-ব্যয় মনিটর করা যায়। প্রতিটি টাকার গতিবিধি মনিটর করা যায়। বর্তমান অবস্থায় শতভাগ সম্ভব না হলেও ৮০% সম্ভব সেটা। উন্নত দেশগুলোতে এমনকি একটা মোবাইল স্টলও ডাটাবেজের আওতায় আছে যেটার সরকারের দৃষ্টি এড়ানো বা দেয় ট্যাক্স ফাঁকি দেবার কোন উপায় নেই। দেশকে প্রকৃত উন্নয়নশীল বা উন্নত করতে হলে ওইসব উদাহরনকে কাজে লাগিয়ে সবরকম প্রতিষ্ঠান, সে ছোট হোক আর বড় হোক, ডাটাবেজে এন্ট্রি ও রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বসানোর কোন রকম সুযোগ থাকা প্রকৃত উন্নয়নের পথে বিরাট বাধা বলে বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটা দেশের ইউনিয়নকে ও ওয়ার্ডকে সক্ষম করে তুললে এ কাজ কঠিন হবার কথা নয়। যে দুর্নীতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা, এই সব প্রক্রিয়াকে যথাযথভাবে কাজে লাগালে বহুলাংশে দুর্নীতি দুর করা সম্ভব।
তাই বলতে হয় উন্নয়ন উন্নয়ন করে ঢাকঢোল পেটালেই দেশ উন্নয়নশীল বা উন্নত করার কোন সুযোগ নেই। সেটা করার জন্য বুদ্ধি, মেধা, আন্তরিক প্রচেষ্টা, দৃঢ় সংকল্প ও সর্বোপরি নিখাদ দেশপ্রেম অত্যাবশ্যক। নইলে কিছুদিন মানুষকে চমক দেওয়া গেলেও আসলে কাজের কাজ কতটুকু হবে সেটা সাধারন জ্ঞান সম্পন্ন সবাই জানে। ---- ৩০/৫/২০১৫ইং
No comments:
Post a Comment