Thursday, March 22, 2018

নি¤œতম উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরন
বাংলাদেশ গতকাল নি¤œতম (লীস্ট বলতে নি¤œতম-ই বোঝায়) উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের খেতাব পেয়েছে। এটা খুবই আনন্দের সংবাদ বটে। তবে আজ আবার এক খবরে দেখা গেল এর জন্য বেশ কয়েকটি শর্ত, একটু ভদ্র ভাষায় চ্যালেঞ্জ, আরোপ করা হয়েছে, যা পুরন করতে পারলে ২০২৪ সাল নাগাদ বাস্তবিকই উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরন ঘটবে। এসব চ্যালেঞ্জ সত্বেও বাংলাদেশের মানুষের যে উচ্ছ্বাস সেটা ছোট করে দেখা যায় না। তবুও কয়েকটি বিষয়ে মনে প্রশ্ন জাগে। যখন বর্তমান ঘোষিত ডিজিটাল উন্নয়নের জন্য রকেট গতিতে না হলেও অন্ততঃ মেল ট্রেনের গতিতে ছোটা অত্যাবশ্যক, সেখানে আমরা কি এখনো গরুর গাড়ীর চেয়ে বেশী গতিতে এগুতে পারছি? নাকি সেই পুঁথির পয়ারের মত ’ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’ - এমন অবস্থা আমাদের? সরকারী উন্নয়নের ফিরিস্তিতে যে লাখো কোটি টাকার ঝনঝনানি শুনতে পাওয়া যায় তা কি সেই পুঁথির মতই ’লাখে লাখে লোক মরে কাতারে কাতার, হিসাব করিয়া দেখে চল্লিশ হাজার’ - মত অবস্থা?
এসব বিষয় ভাবতে গেলে অনেক দিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে। সম্ভবতঃ ১৯৭৮/৭৯ সালের দিকে। মহকুমা শহর ঝিনাইদহে (তখনো মহকুমা থেকে জেলায় উত্তরন ঘটেনি) তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা আসবেন স্বানির্ভর আন্দোলন বিষয়ে বক্তব্য দেবার জন্য। মহকুমা প্রশাসককে  সে লক্ষ্যে এক সুধী সমাবেশের আয়োজন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারী কর্মকর্তাদেরকে বেলা দশটার মধ্যেই যথাস্থানে উপস্থিত থাকতে বলা হ’ল। আমরা সকল কর্মকর্তা যথাসময়ে হাজির হ’লাম সেখানে। এরপর সময় যেতে লাগল। জরুরী দাপ্তরিক কাজকর্ম ফেলে সবাই অপেক্ষা করছেন। এক ঘন্টা, দু’ঘন্টা, আড়াই ঘন্টা চলে গেল। শেষে শোনা গেল উপদেষ্টা মহোদয় আর আসবেন না। মহকুমা প্রশাসক দু’একজনকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সুযোগ দিয়ে সমাবেশের সমাপ্তি ঘোষনা করবেন এ সময় আমি বললাম আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিতে, কিছু বলার জন্য। অনেকটা অনিচ্ছা ও বিরক্তি সত্বেও আমাকে বলার সুযোগ দেওয়া হ’ল। আমি বললাম স্বনির্ভর আন্দোলন কেবল ভাষন ও বক্তৃতাবাজি করে সফল করার কোন সুযোগ নেই। মাত্র মাসখানেক আগে চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং মারা গেছেন। কিন্তু তার মত বিশ্ব কাঁপানো নেতার মৃত্যুতেও চীন মাত্র এক মিনিট কর্মবিরতি দিয়েছে। কাজকর্ম বন্ধ করে তারা বক্তৃতা বা ভাষন দেবার ও শোনার জন্য বসে থাকেনি। স্বনির্ভর হতে গেলে কাজ করতে হয়। কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। আর যারা কাজ করেন তারা বক্তৃতা বা ভাষনে সময় নষ্ট করেন না। এ বিষয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বৃটিশ প্রাইম মিনিষ্টার উইনস্টন চার্চিল সবচেয়ে ক্ষুদ্র বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ’লেডিজ এন্ড জেন্টলমনে, লেটস্ গেট টু ওয়ার্ক।’ এটুকু বলেই তিনি বক্তৃতা সমাপ্ত করে কাজে নেমে পড়েছিলেন। আর আমরা এখানে দু’আড়াই ঘন্টা কাজকাম ফেলে বসে আছি স্বনির্ভর হবো বলে।
বস্তুতঃ আমার এ বক্তৃতায় মহকুমা প্রশাসকসহ দু’একজন একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেও বেশীরভাগ লোকই তাতে সমর্থন করলেন। অবাক হতে হয় সেই ঐতিহ্য আজও সমানে চলছে দেখে। এর কারন খুঁজতে গেলে দেখা গেছে যখন শাসকদের কাছে কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে না, থাকে না আদর্শ, তখন সেই ফাঁকা জায়গা নানা ভেল্কি দিয়ে জনগনের একটা শ্রেনীকে মোহগ্রস্থ করে এবং অপর শ্রেনীকে উন্মাদনাগ্রস্থ করে পুরন করতে হয়। এই পদ্ধতি হিটলার ও মুসোলিনি বেশ ভালভাবেই কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। ধর্মকে হিটলার প্রতিস্থাপন করেছিলেন তার নাজী দর্শনকে এক উন্মাদনার বিষয় হিসেবে কাজে লাগিয়ে। তার বিরাট নাৎসী বাহিনীকে ঘন্টার পর ঘন্টা ’হেইল হিটলার’ ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকতে হ’তো। তার এই উন্মাদনা জনমানসে এমনই উন্মাদনা সুৃষ্টি করেছিল যে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে রে‌্যাম ও রিবেনট্রপকে ফাঁসির মঞ্চে উঠানোর পর তারা ’হেইল হিটলার’ বলে চীৎকার দিয়ে ছিলেন। জোসেফ গোয়েবল্স তো ফ্যুরার নেই যে পৃথিবীতে সে পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকার কোন মানেই নেই বলে তার স্ত্রী ও এগার জন সন্তানসহ বিষপানে আত্মহত্যা করেছিলেন। এদেশেও দেখা যাচ্ছে যখন যখন সুনির্দিষ্ট কোন আদর্শ নেই, লক্ষ্য নেই, সময়ের কোন মুল্য নেই, যখন একদিনের কাজে এক মাস, এক মাসের কাজে বছরের ধাক্কা লাগছে, চারদিকে লুটপাটের মচ্ছব চলছে, চলছে সুশাসনের অনুপস্থিতি; চারিদিকে যখন ’নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’, তখন সেদিক থেকে দৃষ্টি ফেরানোর জন্য নানা অজুহাতে উন্মাদনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আর সেই উন্মাদনায় সতের কোটি মানুষের ক্ষুদ্র একটি অংশ ভেসে যাচ্ছে আর অপর বৃহত্তর অংশটি যেন কি এক মাদকতায় মোহগ্রস্থ হয়ে আছে।
উপরোক্ত বিষয়গুলিকে নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায় আমরা সত্যি সত্যিই মোহগ্রস্থতার এক ঘুর্নিপাকে পড়েছি। স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর পরেও আমরা সেই পুরান ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে চলেছি। এমনই সে ঘুির্নপাক যে তার থেকে বেরুনোই যেন অসম্ভব হয়ে দাঁিড়য়েছে। সামনের দিকে তাকানোরও ক্ষমতা, সাহস বা যোগ্যতা কোনটাই যেন নেই। একটা দেশকে দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিতে যে জাতীয় ঐক্যমত, সহযোগীতা ও একাত্মতাবোধ অত্যাবশ্যক, সেগুলো পাশে ঠেলে নানা রকম বিভক্তির ফাটলে নিজেদেরকে আটকে ফেলেছি। আমাদের অবস্থা সেই বানরের মত, যে একফুট উপরে উঠতে গেলে দ’ুফুট পিছলে নীচে নেমে যায়। প্রকৃতপক্ষে দেশকে উন্নত করে গড়তে আমাদের দ্বিগুন তিনগুন গতিতে কাজ করা দরকার। যে কাজ এক বছরে শেষ হবার জন্য নির্ধারিত, সে কাজ যেন এক দু’মাস আগেই শেষ করা যায়। অফিসিয়াল কাজে ফাইলের গতি যেন শামুকের মত না হয়ে খরগোসের গতিতে চলতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে যেন তিনবার চারবার রিভাইজ না করতে হয়। দুর্নীতির বিষয়ে যেন প্রকৃতই ’জিরো টলারেন্স’ কার্যকর হয়। এসব না হলে কেবল কল্পিত ’জয়োল্লাসে’ উন্মাদনাগ্রস্থ হয়ে পড়লে কোন ’ভিশনই’ সময়মত সফল করার আশা করা যায় কি?