Saturday, September 28, 2019

দুর্নীতি দুর্নীতি আর দুর্নীতি!

’উপাচার্যরা নিয়োগ-বানিজ্যে ব্যস্ত’, তিন বিচারপতিকে অব্যহতি’ (নিশ্চয়ই কোন ভাল/সৎ কাজের জন্য নয়), ’বিএসইসি চেয়ারম্যানের দুর্নীতি অনুসন্ধানে দুদক’, ’আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জড়িত সব অনিয়মে’, ’খোঁজা হচ্ছে এনডিআই জালিয়াতচক্র - প্রশ্নের মুখে নির্বাচন কমিশনের ৪৫ কর্মকর্তা’, ’উত্তরায় বিআরটি-তে দালালের দৌরাত্ম’, ’ডিবি অফিসের ড্রয়ার ভেঙে ইয়াবা চুরি - কনস্টেবল গ্রেপ্তার’ -  ইত্যাকার সব সংবাদে আজকের দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার পাতা ভর্তি। দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মত দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত (না কি ’কুশিক্ষিত?’) ব্যক্তি থেকে পুলিশের কনস্টেবল পর্যন্ত চুরি-চামারি ও দুর্নীতিতে আকন্ঠ জড়িত হয়ে পড়েছে। এর আগে পুলিশের খুবই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও দুদক-এর পরিচালকের মত উচ্চ পদধারীদেরকেও দুর্নীতিতে জড়িত হতে দেখা গেছে। এই মহামারী বছর দশেক আগেও দেখা যায় নি। তাহলে যে কোন সামান্য জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই এর তাৎপর্য বুঝতে পারে। গত দশ বছরে দেশ থেকে যে প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশ, সেটাও এই রকম ব্যপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।
আসলে যে যত সাফাই-ই দিন না কেন, যে কোন সরকারের গোড়ায় গলদ থেকে গেলে তাদের পক্ষে দুর্নীতি বন্ধ দুরে থাক, দমন করাও যে সম্ভব হয় না সেটা বিগত এক যুগ থেকেই মানুষ দেখে আসছে। এই দেশে দুর্নীতির বিস্তারের জন্য খোদ বঙ্গবন্ধুকেই যখন আক্ষেপ করতে হয়েছে, তখন আর কেউ যে ভাল করতে পারবে সেটা এমনিতেই ধারনা করা মুশকিল। তাই যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ’জিহাদ’ ঘোষনা করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল, দেখা গেছে তাদের আমলেই দুর্নীতির বিস্তার ততটাই ব্যপক হয়েছে। কিন্তু কেন এ রকম দুর্বিষহ অবস্থা? এর একমাত্র কারন সঠিক জায়গাতে সঠিক লোক না থাকা বা না বসানো। কামারের কাজ যেমন কুমোর দিয়ে সম্ভব নয়, তেমনি যাদের লক্ষ্য থাকে যেনতেন পকেট ভারী করা, তারা যতই দলের প্রতি হাঁটুগাড়া আনুগত্য দেখাক না কেন, তাদের দ্বারা ভাল কোন কাজ বা দুর্নীতিমুক্ত থেকে কোন কাজ কদাচ সম্ভব নয়। দেশের শাসকগন, তা সে গনতান্ত্রিকই হোক বা স্বৈরতান্ত্রিক হোক, যদি মেধা, যোগ্যতা, সততা, নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতা না দেখে কেবল তাদের জ্বি-হুজুরদের দিয়ে সব কাজ চালাতে মরিয়া হয়ে থাকেন তবে দেশে এরকম অরাজক মাত্রায় দুর্নীতি বাড়া ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এটা যে সব শাসকরা বোঝেন না বা বুঝতে চান না তারা মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে রকম আস্ফালনই করুন না কেন তা প্রবল প্রসব বেদনান্তে পর্বতের মুষিক প্রসবের মতই হাস্যকর হতে বাধ্য। এটা শাসকগন তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ বা ’ইগো’-র জন্য বুঝতে না চাইলেও এটাই বাস্তব সত্য।
তাই আজ যে সর্বগ্রাসী সর্বব্যপী দুর্নীতির বিস্তার ’টপ-টু-বটম’ ঘটেছে, তার জন্য দেশের শাসকগন কোন মতেই দায় এড়াতে পারেন না।   --- ২৩/৮/.২০১৯ইং

আদর্শহীন নৈরাজ্য’-এ নিয়ন্ত্রণহীন তরুণেরা - কেন?

‘আদর্শহীন নৈরাজ্য’-এ নিয়ন্ত্রণহীন তরুণেরা - জনাব ফজলুল কবির লিখিত দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ।
আসলে গত ৬/৭ মাস ধরে দেশে যে ধরনের নৈরাজ্য চলছে, একশ্রেনীর তরুন যুবা যে ধরনের বেপরোয়া গুন্ডামিতে মেতে উঠেছে তার পেছনের কারন খুঁজতে বেশী দুর যেতে হবে না। তবে আজকে যারা এই পরিস্থিতির জন্য হাহুতাশ করছেন, নানা রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেবার চেষ্টা করছেন তারা এক রকম beating about the bush-এর কসরত করছেন। সকলেই জানে যে শিক্ষার্থীদের নিরীহ কোটা বিলুপ্তি আন্দোলনের সময় কারা তাদের উপর লাঠি, হাতুড়ী, চাপাতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; কারা হেলমেট পরে এই সন্ত্রাস চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের কিছু হয়েছে? কেন হয় নি? কারনটা সবাই জানে। গত ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের আগের রাতে কারা বাড়ী বাড়ী গিয়ে ভোট কেন্দ্রে না যাবার জন্য হুকুম জারি করেছিল এবং তাদের ওয়ানিং না শোনার জন্য অনেককে মেরে আধমরা করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল তাও সবাই জানে। কিন্তু সেই সব হুমকিদাতাদের কি কিছু হয়েছে? সেটাও সবাই জানে। তো সরকার কি করবে? সরকার তো তাদের কাঁধে ভর করেই ক্ষমতাসীন হয়েছে। তবে হ্যাঁ, এখন যখন সরকারের সামনে কোন চ্যালেঞ্জ নেই, কোন শক্তিশালী বিরোধী দলও নেই, নেই কোন সহিংস আন্দোলনও, তখন সরকার একটু সদিচ্ছা নিয়ে সৎভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিস্থিতির প্রভুত উন্নতি ঘটাতে পারত। কিন্তু যারা দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছেন তারা দুর্বৃত্তদের ব্যাপারে যে একটু আধটু উদারতা প্রদর্শন করবেন না, সেটার নিশ্চয়তা কে দেবে?
এজন্যই দেখা যায় যে যখন সুবর্চরের গৃহবধূ, একাধিক সন্তানের মাকে গনধর্ষণ করার পরও সেই ধর্ষকদের ধরতে প্রশাসন দোনোমোনো করে, তখন পাতি ধর্ষকদেরও যে মনে সুড়সুড়ি দেয় না সেটা কে বলবে? আর তার ফলশ্রুতি তো সবাই দেখতেই পাচ্ছে। তাই বলতেই হয় যে গোড়ায় গলদ রেখে কোন কাজ ঠিকঠাকমত করা যায় না। যে ওষুধেই ভেজাল সেই ওষুধ দিয়ে রোগীকে সুস্থ্য করার বদলে তাকে পরপারে পাঠানোর ব্যবস্থাই সচরাচর হয়ে থাকে। তাই সবার আগে ওষুধকে purify করতে হবে, নইলে কাকস্য পরিবেদনা।
প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে নেতৃত্ব প্রকৃতই দেশপ্রেমিক সে নেতৃত্ব দেশের যুব সমাজকে দিক নির্দশনা দেয় দেশের উন্নয়নে সক্রিয় কর্মী হবার জন্য, দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য। প্রবীন, দক্ষ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নেতারা থাকেন ড্রাইভিং সিটে, আর ইঞ্জিনের কাজ করে তরুন সম্প্রদায়। কিন্তু এই দেশে বিষয়টি একেবারেই উল্টো। এদেশে ভাইস চ্যান্সেলরকে গাইড করে ছাত্রনেতারা। ছাত্র নেতৃত্ব দেশের আভ্যন্তরীন পলিসি নির্ধারনে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখে। প্রশাসন কিভাবে চলবে অনেক ক্ষেত্রে তারাই সেটা ঠিক করে দেয় যার ফলে অনেক জায়গায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের হাতে লাঞ্ছনা এমনকি বেশ মারধরেরও শিকার হয়। তো যে দেশে রথ উল্টো চলে সে দেশে সব কিছু স্বাভাবিকভাবে চলবে এটা কি আশা করা যায়? বিচার বিভাগের পুর্ন স্বাধীনতা এবং আদালতের রায় বা আদেশের কার্যকারিতা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অত্যাবশ্যক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় আদালতের আদেশ বাস্তবায়িত হচ্ছেনা যদি তা ক্ষমতার গায়ে আঘাত করে। নিম্ন আদালতের উপরে অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের পরিবর্ত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রন আরো জোরালো। ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে মুল ফর্মুলা সেখানেই গন্ডগোল। তাই বর্তমান যে অস্বাভাবিকতা সমাজে বিরাজমান তার মুলোৎপাটন তখনি সম্ভব যখন সরকার প্রকৃতই আন্তরিকভাবে সেটা চাইবে। নইলে ----।

ছাত্রলীগ - বঙ্গবন্ধুর যুগ এবং তাঁর কন্যার যুগ

ছাত্রলীগ কর্মীদের ত্যাগের মনোভাব নিয়ে কাজ করতে আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর -- একটি জাতীয় দৈনিকের খবর।
হ্যাঁ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যাদেরকে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে কাজ করতে বলেছেন তারা এ পর্যন্ত কোথায় কতগুলো কাজ করেছে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে, সেটা এই সাম্প্রতিককালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই কোটি টাকা নগদ সেলামী গ্রহনের মাধ্যমে উঠে এসেছে। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে যে ছাত্রলীগ, তারা কোন কাজটি ত্যাগের মাধ্যমে করেছে, আর সেটা দেশের কতজন লোক জানে তাও বড় প্রশ্ন। তবে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, দখলদারি, মাদক ব্যবসা, খুন-ধর্ষণ ইত্যাদি কাজে তাদের সংশ্লিষ্টতা দেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাদেরকে কি বলছেন আর তারা কি করছে সেটা ভেবে আকুল হতে হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের ছেলেদেরকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারন করে চলতে বলেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগের কেউ কি ছাত্রজীবন শেষ হবার আগেই ব্যাংকের মালিক বা হেলিকপ্টারে বিয়ের দাওয়াত খেতে যাবার মত মালদার হতে পেরেছিল? নেতা হয়ে স্বল্পকালেই কোটিপতি হবার কোন সুযোগ কি ছিল বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগের? নেতৃত্ব পাবার জন্য কি এত মারামারি, এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বীকে খুন করে ফেলার মত ঘটনা ছিল?
প্রসঙ্গে এদেশে নিন্দিত মিঃ জিন্নাহর একটি কথা মনে পড়ে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে তিনি একবার আলীগড় কলেজে যান। তখন তৎকালীন মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা ওয়াসেক হোসেন (যতদুর মনে পড়ে) তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন ছাত্রদের এখনই সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুমতি তিনি দেবেন কি না। উত্তরে তিনি বলেন, ‘You know political languages are woolly and deceptive. .... You should first prepare yourself so that you can shoulder the responsibilities of the nation in future.' (উদ্ধৃতিতে কিছু ভুল থাকলে ক্ষমাপ্রার্থী)। আর আজ কি হচ্ছে? সেটা চক্ষুষ্মান যে কোন লোকই দেখতে পাচ্ছেন, শুনতেও পাচ্ছেন। তখন মুল দল রাজনীতি নিয়ন্ত্রন করত আর অঙ্গ সংগঠনগুলো মুল দলের নীতি-আদর্শ অনুযায়ী কাজ করত। আর এখন যে অবস্থা, তাতে দেখা যায় ক্ষমতাসীনদের বলতে হয়, ‘বিরোধীদের দমন করার জন্য আমার ছাত্রলীগই যথেষ্ঠ।’ সেই দমন তারা করছে, এমনকি সহপাঠি শিক্ষার্থীদেরকে ভয়ংকরভাবে মারপিট, হাতুড়ীপেটা এমনকি নারী শিক্ষার্থীদেরকে শ্লীলতাহানি করেও।
ছাত্রদের পরিচিতি শিক্ষাঙ্গনের সাথে, এটাই সাধারন মানুষ জানত। কিন্তু ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, থানা ইত্যাদিতে ছাত্রলীগের প্রকৃত সমাজকল্যানমুলক বা জনহিতকর কাজ কোনটি তারা করেছে, সেটা যদি কোন পত্রকারগন একটু বিশদভাবে জানাতে পারতেন তবে আম পাবলিক বড়ই বাধিত হ’ত।

আইন, আইনের শাসন ও বাস্তবতা

গ্রাম্য একটি প্রবাদ আছে - কচুগাছ কাটতে কাটতে মানুষ কাটা (খুন করা)। কথাটার তাৎপর্য হচ্ছে একটা বালক যখন কচুগাছ কাটতে কাটতে ’কোপানো’টাকে সহজ ও স্বাভাবিক বলে মনে করে তখন কারো গায়ে কোপ মারতে তাকে আর খুব বেশী ভাবনা চিন্তা করতে হয় না। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো তার বয়সে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে দৈহিকভাবে বেড়ে ওঠা এবং তার চিন্তা ও কাজের পরিধিও বড় হয়ে ওঠা। তাই দেখা যায় একটা শিশু যে পাঁচ কেজি ভার তুলতে পারে না, সে বড় হয়ে একশ’ কেজি ভারও হয়ত অনায়াসে ওঠাতে পারে। যে শিশুটি হয়ত স্কুলে তার সমবয়সী সহপাঠিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, তাকে তখনই নিবৃত্ত করা না হলে সে পরে সে মারামারিতেও লিপ্ত হতে পারে, ক্রমবর্ধমানহারে সাহসী ও বেপরোয়া হয়ে ওঠার প্রবনতার কারনে।
আমরা শুনছি রিফাত হত্যার প্রধান আসামী নয়ন বন্ড একদিনে এরকম কোপানোর দক্ষতা অর্জন করে নি। আগে সে হয়ত ছোটখাট মারামারি হাতাহাতি করত। পরে সেটা হয়ত ছুরি মারামারিতে উন্নীত হয় এবং শেষে দা-রামদা নিয়ে কোপানোতে তার আর কোন দ্বিধা ছিল না। তো এই প্রবনতা কেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে যা বলা হচ্ছে তাতে হয়ত অনেকেই বিরক্তিবোধ করতে পারেন বা ক্ষুব্ধ হতে পারেন। কিন্তু এদেশের বাস্তবতা এটাই বলে।
দেশে ভুরি ভুরি আইন আছে। ধুমপানের বিরুদ্ধে আইন; পবলিক ন্যুইসেন্সের বিরুদ্ধে আইন; পথেঘাটে ট্রাফিক রুল ভাঙ্গার বিরুদ্ধে আইন, যথা - ধুমপান আইনতঃ দন্ডনীয়’, এখানে রিকশা থামানো নিষেধ, এখানে বাস থামানো নিষেধ; ওভারটেক করা নিষেধ, উল্টো পথে গাড়ী চালানো নিষেধ, ফুটপাথে মটরবাইক চালানো নিষেধ ইত্যাদি। এসব আইন করেন কারা? জনপ্রতিনিধি নামক মহাশয়রা। আবার এসব আইনকে কার্যকর করেন কারা? মহা-ক্ষমতাধর আইন-শৃংখলা বাহিনীর লোকেরা। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে খোদ থানার সামনে পুলিশ কর্মকর্তাকে ধুমপান করতে দেখা গেছে: আইন বানানো সংসদ সদস্যদেরকে উল্টোপথে গাড়ী হাঁকাতে দেখা গেছে; ’এখানে বাস থামানো নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ডের সামনে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে অথচ সেখানে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তো এ থেকে মানুষ কি বুঝবে? এসব নিষেধনামা কেবল লোক দেখানোর জন্য না কি প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ করার জন্য? লেখা আছে ’এখানে প্র¯্রাব করা নিষেধ।’ কিন্তু অবলীলায় স্যুটবুট পরা লোকও যখন ঐ জায়গাতে সেটা করে, এবং জনসমক্ষে করে তখন কে বাধা দেবে? কারন সাধারন মানুষ দেখছে যে এরকম আইন বা বিধি ভঙ্গ করলেও পুলিশ কিছু বলে না। তো অন্যেরা যখন এসব করেও কোন সমস্যায় পড়ছে না তখন সাময়িক সুবিধা পেতে আমিও কেন তা করব না? এভাবেই আইনের প্রতি একটা অবজ্ঞা মনের মধ্যে উপ্ত হতে হতে একসময় তা আইনকে তোয়াক্কা না করার প্রবনতা সৃষ্টি করে। তখন সেই ’কচু কাটতে কাটতে মানুষ কাটা’-র মত বড় বড় আইন ভাংতেও আর বেশী দ্ভিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে হয় না।
বস্তুতঃ এই দেশে আইন প্রণয়ন করায় যে রকম উৎসাহ সরকারের, সে আইন প্রয়োগ বা পালন করার ক্ষেত্রে ততটাই অনীহা লক্ষ্য করা যায়। যে আইন প্রয়োগ করা যাবে না বা হবে না, সে আইন কেন? অনেক সময় আদালতও এমন নির্দেশনা দেয় যে তা কার্যকর করা কেবল অসম্ভব নয়, অবাস্তবও হয়ে পড়ে। যেমন কিছুদিন আগে উচ্চ আদালত একটি ডেভেলপার কোম্পানীকে পনের/ষোল বছর পর অবৈধ ঘোষনার করে আদেশ দিয়েছে তাদের প্রকল্পকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে এবং গ্রহীতাদেরকে তাদের জমা টাকার দ্বিগুন ফেরত দিতে। বাস্তবতা হলো সেই ডেভেলপার কোম্পানী ঐ এলাকায় প্রায় আড়াই/তিন বর্গকিলোমিটার জায়গা ১৪/১৫ ফুট ভরাট করে ফেলেছে এবং সেখানে প্রায় অর্ধশতাধিক দালানবাড়িও নির্মিত হয়েছে। এখন ঐ জায়গার দালানবাড়িগুলো ভেঙ্গে ফেললেও ঐ আড়াই/তিন ব,কিমি, এলাকার বিপুল বিশাল মাটি অপসারন সম্ভব কি? বা তা কোথায় সরানো হবে? সরকার নদ-নদী, খাল-নালাগুলো উদ্ধারে যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যারা ঐসব ভরাট করে ক্ষেতখামার বা বাড়ীঘর নির্মান করেছে, তা তো আর একদিনে বা রাতের অন্ধকারে করেনি। এখন তাদেরকে উচ্ছেদ করতে যে সব সমস্যার উদ্ধব হচ্ছে তার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের বা সরকারের কি কোন দায় নেই? কার্যতঃ বিচারের অবিশ্বাস্য দীর্ঘসূত্রিতা এবং সেই বিচারের রায় কার্যকর করায়ও যে গাফিলতি প্রশাসনযন্ত্রের কাজে লক্ষ্য করা যায়, তাতে আইন বহুক্ষেত্রে দুর্বলের উপর জুলুম ও সবলের পক্ষে অনুকুল বলে প্রতীয়মান হয়।
সুতরাং ছোটখাট অপরাধ বা বড় কোন অপরাধ নিরোধ আইন এমনই হওয়া উচিত যা কার্যকর করা যায় বা সম্ভব হয়। যে আইন - তা সে যত ক্ষুদ্র অপরাধ নিয়ন্ত্রনের উদ্দেশ্যেই হোক না কেন - অবশ্যই কার্যকর করতে হবে। তা যদি না পারা যায় তবে সে আইন বানানোই একটা অপরাধ সংঘটনের কারন হবে এটা নিশ্চিত। সমাজে বিভিন্ন অপরাধের ব্যপ্তি দেখে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
তবে অনেকে এখন বলছেন যে কেবল আইন দিয়ে সব কিছুর সমাধান সম্ভব নয়। কথাটা খুবই সত্যি। আইনের ঢাল হিসেবে পুর্বে সমাজের বাঁধন-কষন ও শাসন বিদ্যমান ছিল এই ১০/১২ বছর আগেও। সেই সামাজিক শাসন কোথায় গেল? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হচ্ছে যখন থেকে সরকারের কাছে সমাজ প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ল। সমাজের মধ্যেই এমনই এক শ্রেনী তৈরী করা হলো যাদের কাছে সমাজের বয়ঃজ্যোষ্ঠ্য মুরুব্বী বা সম্মানী লোকের মর্যাদা রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে গৌন হয়ে পড়ল। দেখা গেল বিশেষ রাজনৈতিক দলের পতাকাবাহী এক নাবালক ছোকরা তার পিতামহের বয়সী মানুষকে অবলীলায় অবজ্ঞা করছে, অসম্মান করছে। আগে মুরুব্বীদের সামনে ধুমপান করাটা কেউ কল্পনাও করত না, কিন্তু এই নষ্ট রাজনীতির এই নব্য শাবকরা সমাজে নীতি নির্ধারনের ক্ষমতা পেয়ে গেল এবং অনায়াসে মুরুব্বীদের বিচার-বিবেচনাকে চ্যালেঞ্জ করে বসল। গুরুজন বা মুরুব্বীদের ভুমিকা একেবারেই গৌন হয়ে গেল। আগে যে সমাজিক অপরাধের ৮০% সমাজপতিরা স্থানীয়ভাবেই মীমাংসা ফয়সালা করতেন, তা এখন আর সমাজের মধ্যে সীমিত না থেকে আদালত পর্যন্ত চলে আসল। স্থানীয় মসজিদের ইমাম সাহেবদের ভুমিকাও যথেষ্ঠ উল্লেখযোগ্য ছিল এই সব বিবাদ-বিরোধ মীমাংসায়। কিন্তু সমাজের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্রমাগতভাবে আঘাত ও অবজ্ঞা করে আজ অবস্থা এমনই হয়েছে যে মুরগী চুরির মামলা থেকে গ্রামের একটা মেয়ের প্রতি অশালীন আচরন, যা আগে সামাজিকভাবেই স্থানীয় পর্যায়ে সব পক্ষের কমবেশী সন্তুষ্টির মধ্যে মীমাংসা হয়ে যেত, তা এখন আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে এবং তা ক্রমাগতভাবে (ইংরেজীতে যাকে বলে snowballing) বাড়তে বাড়তে মারামারি খুনোখুনি অবধি পৌঁছে যাচ্ছে। আর এই ক্রমানুগভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের জন্য বিভিন্ন সরকারের ক্রমবর্ধমান প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা পরিস্থিতিকে আজ এই অবধি নিয়ে এসেছে। এখন যখন পানি নাকের উপরে উঠে গেছে তখন আমাদের আঁতেল সমাজ কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। আজ প্রগতিশীলতার নামে ধর্মকে, ধর্মীয় বিধি-নিষেধকে পাশ কাটিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্যকে আস্কারা দেওয়া হয়েছে। সমাজের ইতিহাসই বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত কোন কিছুকে উঠিয়ে দিলে যে শুন্যতা সৃষ্টি হয় তার যদি স্বাস্থ্যকর কোন বিকল্প প্রতিস্থাপন করা না হয় হয় তবে তা বিকৃতিকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা দেবে। আজ সেটাই দেখা যাচ্ছে। কারন একজন ৩০/৪০ এমনকি ষাটোর্ধ বয়সের পুরুষের পক্ষে ২/৩ বছরের শিশু বা পঞ্চাশোর্ধ প্রৌড়াকে ধর্ষন করার মত বিকৃতি তো স্বাভাবিক নয় আদৌ। কিন্তু সেটা ঘটছে কেন? বেশ কিছু বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন এইডস্ প্রতিরোধের বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন যে ধর্মীয় মুল্যবোধের প্রতিষ্ঠা এ ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখতে পারে। তো যেখানে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের মত উন্নত সমাজে ধর্মীয় মুল্যবোধের আবশ্যকীয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় সেখানে ৮৫% মুসলমানের এই দেশে ধর্মীয় মুল্যবোধকে যদি উপেক্ষা অবজ্ঞা করা হয় তবে তার ফল যে বর্তমান অবস্থারই প্রতিফলন হবে তাতে অবাক হবার কিছু নেই।
এছাড়া শিশু-কিশোর-কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যকর কোন বিনোদনের ব্যবস্থা প্রায় উঠেই গেছে। আনাচে কানাচে স্কুল-কলেজ; যাদের নেই কোন লাইব্রেরী, নেই খেলার মাঠ, নেই সাংস্কৃতিক কোন কর্মকান্ড, নেই সুস্থ্য কোন প্রতিযোগীতা। স্বাভাবিকভাবেই ছেলেমেয়েরা আকাশ সংস্কৃতি ও স্মার্ট ফোনের ঘনচক্করে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। সেই সাথে একশ্রেনীর ভুঁইফোঁড় ধনীর ছেলেমেয়ের হাতে মহার্ঘ্য স্মার্টফোন সমাজে স্বল্পবিত্ত পরিবারের শিশু-কিশোরদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরী করছে। কেবল একটা স্মার্ট ফোনের জন্য বন্ধু বন্ধুকে খুন করছে, এটাও এই সমাজে এখন বিরল নয়। এর কারন খুঁজতে গেলেও দেখা যাবে যারা ক্ষমতাসীন থাকেন তারাই সমাজে এইসব ভুঁইফোঁড় ধনিক শ্রেনী সৃষ্টি করছেন। তাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়েই ব্যাংকলুট, খাণখেলাপী, শেয়ারবাজার লুট, কালবাজারী এবং ওভার/আন্ডার ইনভয়েসিং-এর মাধ্যমে ঐসব আঙ্গুল ফুলে বটগাছের জন্ম হয়েছে ও হচ্ছে। যাদের অর্থ কষ্টার্জিত, তাদের পক্ষে অপচয় অপব্যয় করাটা সম্ভব নয়। কিন্তু যাদের বাম হাতের আয় বা কালো টাকার কমতি নেই তারা তাদের সন্তানদেরকে হাত খরচ হিসেবেই মাসে ৪০/৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশী ব্যয় করতে দিতে দ্বিধা করেন না। আর এসব সরকারের বিভিন্ন এজেন্সীর নাকের ডগায় ঘটলেও সরকারের কিছু এসে যায় না। কারন এদেশে এখন কাল টাকা না হলে যে জনপ্রতিনিধি (??) হওয়া যায় না; মন্ত্রী-এমপিও হওয়া যায় না।
প্রকৃতপক্ষে সরকার যদি চায় যে কেউ কাল টাকা জমাতে পারবে না তবে তা খুবই সম্ভব। সরকারের যে সব গোয়েন্দা সংস্থা আছে তারা সময়ে সময়ে বাজারে ঘুরলেই লাখ টাকা দিয়ে লেহেঙ্গা ক্রেতা বা পাঁচ/দশ লাখ টাকা দিয়ে হীরা-জহরত ক্রেতাকে অনায়াসেই সনাক্ত করতে পারে। এই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গেলেই এদেশের লোকের কেনাকাটা দেখে ভারতীয়রা সহজেই বলে দেয় এরা বাংলাদেশী। কারন সেখানে এক কেজি মাংস কেনার সামর্থ আছে এমন লোকের সংখ্যা খুব বেশী নয়। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে অবৈধ পয়সা কামানো কতটা কঠিন সেটার একটা সত্যি উদাহরন দেওয়া যায়। সেখানে মাফিয়া গ্রুপের/ফ্যামিলির কথা অনেকই শুনে থাকবেন। তারা এক্সটোর্শন, কিডন্যাপিং, মার্ডার, বুকমেকিং (এক ধরনের জুয়া), ঘোড়দৌড় ইত্যাদির মারফত কোটি কোটি টাকা কামায়। তাদের কোন কোন ফ্যামিলির ক্ষমতা অকল্পনীয়। কিন্তু তারাও অবৈধভাবে টাকা কামাতে পারে না। তাদরেকেও আইনের কোন ফাঁকফোঁকড় খুঁজে কোন না কোন বৈধ উপায় বের করতে হয় ঐ টাকা কামানোর জন্য। যে কারনে আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষে অধিকাংশ সময়ই তাদেরকে ধরা সম্ভব হয় না। যেমন একজনকে কোন একটা অপরাধ সংঘটনের জন্য পাঁচ হাজার ডলার দেওয়া হবে। কিন্তু সরাসরি সেটা দেওয়া যাবে না কারন তা হবে অবৈধ। তাই তাকে হয়ত বলা হবে কয়েকশ’ মাইল দুরের এক শহরের এক বারে যেতে। সেখানে তার জন্য একটা টেবিল বুক করা থাকবে। সেই টেবিলে সে পোকার খেলবে এবং সেখানে সে ঐ পাঁচ হাজার ডলার জিতবে। বার যেহেতু বৈধ লাইসেন্সধারী এবং পোকার খেলাও অবৈধ নয়, তাই এভাবে সে ঐ পাঁচ হাজার ডলার কামাই (?) করলে তা আর অবৈধ থাকবে না।
তো আমাদের শাসকেরা ঘনঘনই বিদেশের উদাহরন টানেন। তারা তো এসব থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। কিন্তু সেটা তারা করবেন না কারন তাতে তাদের লাভের অংক কমে আসতে পারে।
তাই উপসংহারে সেই পুরানো কথাই বলতে হয় যে ’মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে।’ আর শুদ্ধি কার্যক্রম করতে হলেও শুরু করতে হবে মাথা থেকে। নইলে সকলি গরল ভেল।