শাস্ত্রে বলে মানুষ ষ্ষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দাস। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য - এই কয়টি মানুষের প্রধান প্রবৃত্তি। এগুলোর মধ্যে যারা ডুবে যায় তারা আর মনুষ্য পদবাচ্য থাকে না। সে কারনে সর্ব ধর্ম সর্ব শাস্ত্রে এই প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করার কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। যারা ইসলাম ধর্ম মানেন বা অনুসরন করেন, তাদেরকে এসব থেকে দুরে থাকার নির্দশ স্বয়ং স্রষ্টাই দিয়েছেন। তাই অন্যদের কথা বাদ দিলেও মুসলমান এই সব প্রবৃত্তির উর্ধ থাকবে এটাই কাম্য। কিন্তু এই দেশে বসবাসকারীদের ৮৫% নাকি মুসলমান; অন্ততঃ নামে সেটাই দেখা যায়। কিন্তু এই দেশের মানুষের মধ্যে উপরোক্ত প্রবৃত্তিগুলোর প্রাবল্য এতটাই যে তারা স্বয়ং মহান স্রষ্টার নির্দশাবলীকেও পাত্তা দেয় না।
আগে মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি মানুষ রাজনীতি করে সমাজ ও মানুষের মঙ্গল করার লক্ষ্যে। বহু রাজনীতিক নিজেদের পকেটের পয়সা ব্যয় করে সমাজ ও মানব সেবা করতেন। তার উল্লেখযোগ্য উদাহরন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ। এমনকি বঙ্গবন্ধুও কোন বৈষয়িক লাভালাভের জন্য রাজনীতি করতেন এমন কোন প্রমান নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে গত ২০/২৫ বছর যাবত মানুষ রাজনীতি করছে, রাজনীতিতে আসছে রাতারাতি আঙুল ফুলে বটগাঠ হবার জন্য। এর পেছনের কারন খুঁজতে গেলে দেখা যাবে রাজনীতিতে আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা যত ক্ষীয়মান হয়েছে, ততই মানুষের মধ্যে অর্থলিপ্সা ক্রমাগত জেঁকে বসেছে। যারা রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে ফেলায় টাকা-পয়সা বা পেশী শক্তি ব্যবহার করে রাজনীতি করছেন। এই প্রক্রিয়ায় সব রাজনীতিক দলই মনোনয়ন বিক্রী,ও অন্য যেনতেন প্রকারে অর্থ সংগ্রহ, করে থাকে; কারন এই অর্থই তাদের পক্ষে সমর্থক ও লাঠিয়াল বাহিনী পুষতে অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এরপর ক্ষমতাসীন হয়ে দল ভারী করার লক্ষ্যে সমর্থকদের মধ্যে পাবলিকের পকেটের টাকা অকাতরে বিলিয়ে দেবার এক অসুস্থ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তার বড় প্রমান এই যে যারা দেশ সেবা বা জনসেবার জন্য নির্বাচন করেন তাদের তো অন্য সবার উপরে অর্থবিত্তের যোগান দেবার কথা নয়; বরং তারা নিজেরা কিছু দিতে না পারলেও জনগনের অর্থর বিরাট অংশ পকেটস্থ করার চিন্তা করতে পারেন না। দেশের সংবিধান যদি (হ্যাঁ, সতর্কতার সাথেই বলা হচ্ছে ‘যদি’) দেশের সকল নাগরিককে সমান বলে গন্য করার নির্দশ দেয়, তবে বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠি কোন রকম বিশেষ সুবিধা পাবার হকদার হয় কিভাবে? দেশের সকল মানুষ ট্যাক্স দেবে আর সংসদ সদস্যগন বিনা ট্যাক্সে গাড়ী আমদানী করার সুযোগ কিভাবে পেতে পারেন? তারা কিভাবে পাবলিকের ট্যাক্সের টাকায় সরকারী সব রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন? সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে (?) জনগনের সরকার হিসেবে দাবীদার একটি সরকার কিভাবে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদেরকে স্বেচ্ছাচারমুলকভাবে একতরফা সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে পারে? সংবিধান বলে আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। তাহলে যাদেরকে সংবিধান ‘পাবলিক সার্ভন্ট’ বলে তারা কিভাবে পাবলিকের ‘স্যার’ ডাক না শুনলে ক্রোধী হয়ে পড়েন? সারা দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড যে কৃষক শ্রমিক, তাদের বেতন বা আয় ৫% - ১০% এর বেশী বাড়ে না, কৃষকের রক্ত-ঘাম ঝরানো ফসলের উপযুক্ত মুল্য দিতে সরকার অপারগ হয়, অথচ সেই ‘পাবলিক সার্ভন্ট’দের বেতন বিনা দাবীতে, বিনা চাহিদায় রাতারাতি ১০০% - ১৫০% বাড়তি হয়ে যায় কিভাবে, কোন যুক্তিতে? সরকারী দপ্তরের কর্তারা পাবলিকের টাকায় ইচ্ছামত কারনে অকারনে বিদেশ ভ্রমন করেন কিভাবে, কোন যুক্তিতে?
যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, তারা দেশকে ভালবেসেই তা করেছিলেন। যারা সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তারা তো কোন ভাতার জন্য যুদ্ধে যান নি। তাহলে আজ কেন তারা এই ভাতা পাবার জন্য হন্যে হয়ে পড়েছেন? তাছাড়া যখন ভাতার ব্যবস্থা ছিল না তখনকার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ভাতার দাবীতে আজকে কিভাবে ৩/৪ গুন বেড়ে গেল? এটা কি চরম অর্থলোভের কারনে নয়?
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে মানুষের যেসব প্রবৃত্তি মানুষকে মানুষের পর্যায় থেকে পশুর পর্যায়ে নিয়ে যায়, সেসব প্রবৃত্তিকে যখন রাস্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয় তখন সমাজে অন্যায় অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়াটা ঠেকানো সম্ভব হয় না। আজকেই যদি এইসব অর্থ স্ংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাহার করা হয় তবে দেখা যাবে যে রাজনীতিতে সৎ, নির্লাভ, প্রকৃত সমাজসেবী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে; হয়ত সেটা ঝড়ের গতিতে না হলেও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি ইত্যাদির বিরুদ্ধে অভিযানের ফলে আজকে দেখা যাচ্ছে কারা তাঁর দলের ছত্রছায়ায় অবৈধ ও বেআইনী পন্থায় অর্থবিত্তের পাহাড় গড়েছে এবং এর মাধ্যমে তাঁকে অপ্রস্তুত ও কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থেকেছে। আজ যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরকার সংসদ সদস্যদের বর্তমানে প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা অর্ধকও করে দেন তবে দেখা যাবে পদ-পদবীর লোভে মারামারি দলাদলির মচ্ছব অন্ততঃ ৫০% ভাগ কমে গেছে। কথায় বলে ’অর্থই অনর্থর মুল।’ এই অর্থবিত্তের লোভ এমনই যে তা তরুন ছাত্র সমাজকেও চরমভাবে কলুষিত করে ফেলেছে। আজ ছাত্র নেতারা কোন রকম পড়াশুনা করে পাশ করার চাইতে আগেই বাড়ী, গাড়ী, ব্যাংক ব্যালান্স বা ব্যাংকের মালিক বনে যাচ্ছে। এই অবস্থায় তাদেরকে সুপথে ফেরানোর একটাই উপায়; আর তা হলো এই সব অনুপার্জত অর্থবিত্তের মালিক হবার সকল রাস্তা বন্ধ করা। মনে রাখা দরকার যে বেহুলার স্বামী লখিন্দরকে কামড়ানোর জন্য সাপের প্রবেশপথ সদর দরজা ছিল না; ছিল সূচের ছিদ্রের মতই সঙ্কীর্ন পথ।