বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি (তাঁর আরো ছয় জন সহযোগী বিচারপতিসহ) সাম্প্রতিক সময়ে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রসঙ্গে কিছু পর্যবেক্ষন দিয়েছেন। তা নিয়ে সরকারী দলের হৈ চৈ ও কঠোর সমালোচনার জবাবে মাননীয় প্রধান বিচারপতি প্রসঙ্গক্রমে পাকিস্তানের বিচার বিভাগের কথা বলেছেন। এতে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ড ক্ষুব্ধ তো হয়েছেনই, সেই সাথে সরকারের চাঁই চাঁই ব্যক্তিরা একেবারে শেয়ালের হুক্কাহুয়া রব তুলে যে শোরগোল শুরু করেছেন তাতে আম পাবলিকও বেশ হকচকিয়ে গেছে। তাদের ঘোর ক্ষোভ ও ক্রোধের কারন –পাকিস্তানের সাথে আমাদের তুলনা! এত্তবড় সাহস! সত্যিই তো। কোথায় বাংলাদেশ আর কোথায় পাকিস্তান! যতদুর বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যানে জানা যায় তাদের সাথে আমাদের দেশের কোন তুলনাই হতে পারে না। কারন, উদাহরন দেখা যাক -----
১. পাকিস্তানের বিচার বিভাগ তার প্রশাসনিক বিভাগ থেকে এত শক্তিশালী যে সেখানে একজন প্রধান বিচারপতির সাথে (প্রধান বিচারপতি জনাব ইফতিখার চৌধুরী) গোলমাল বাধিয়ে পারভেজ মোশাররফ সাহেব ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেন নি। এবার আবার নওয়াজ শরিফকেও প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে? এখন প্রধান বিচারপতির পদ তো দুরে থাক, তাকে দেশ ছাড়া হতে হবে বলে খোদ আরেকজন ’বিপ্লবী’ বিচারপতি হুমকি দিয়ে দিয়েছেন। সরকারী দলের অংগ সংগঠনের কেউ কেউ নাকি আবার তার জীবন নাশেরও হুমকি দিচ্ছে, যার প্রেক্ষিতে মাননীয় বিচারপতিকে বলতে হয়েছে ’জীবন দিতেও তিনি প্রস্তুত আছেন; তবুও তাঁর নীতি পাল্টাবেন না।
২. পাকিস্তানের লোক এমন ভয়ংকর যে সেখানে ’অনার কিলিং-এর নামে দু-একজন মেয়ের জীবন যায়। কিন্তু তারা এত সাহসী নয় যে ৩/৪ বছরের শিশু মেয়েকেও তারা যৌন লালসার শিকারে পরিণত করে। এমন কি তারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও কোন শিশু মেয়েকে ধর্ষণ করেছে বলে খবর পাওয়া যায় নি। কিন্তু স্বাধীন সোনার বাংলাদেশে শিশু-তরুনী-যুবতী নির্বিশেষে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যে সে দেশে সর্বোচ্চ পদে মহিলাদের সংখ্যা একেবারেই নগন্য যদিও বাংলাদেশের প্রায় অর্ধ ডজন সর্বোচ্চ পদাধিকারী মহিলা। আরো ব্যাপার যে তাদের পুরুষরা বাংলাদেশের পুরুষদের মত এত দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়াতে পারে নি। তাদের পৌরুষের অভাব যে কতটা প্রকট, ঐ সব ঘটনা থেকেই তা প্রমানিত।
৩. পাকিস্তান ভেঙে যাবার পর তাদের কোন কলকারখানা দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে, এটা কোন সংবাদে পাওয়া যায় নি। কিন্তু বাংলাদেশে ’সোনার ডিম পাড়া আদমজী জুট মিল’ স্বাধীনতার এক দেড় যুগের ভেতরেই তেরশ’ কোটি টাকা দেনা মাথায় নিয়ে পটল তুলেছে। তাছাড়া পাকিস্তান আমলে যে সব কলকারখানা গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের ধুরন্ধর, তিলিসমাত রাজনীতিক ও কর্মকর্তাদের কারনে সেগুলোও হয় বন্ধ, নয় অকেজো হয়ে পড়েছে। পাকিস্তানীরা যে এসব ব্যাপারে একেবারেই নাবালক সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
৪. পাকিস্তান ভেঙে যাবার পর এই ছেচল্লিশ বছরে সেখান থেকে হাজার দশেক কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলেও তেমন কোন খবর পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশ থেকে কেবল বিগত ৮/৯ বছরে ছয় লাখ কোটি টাকারও বেশী বিদেশে পাচার হয়ে গেছে বলে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিডিয়াতেই প্রকাশ। এমন কি খোদ রাস্ট্রীয় ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা গায়েব করে দেবার ঘটনাও সেখানে ঘটানোর মত উদাহরন নেই। সে দেশে তাবড় তাবড় খাণ খেলাপীরা ব্যাংকের টাকা মেরে সরকারের বিরাট উচ্চপদে বসে আছে এটাও জানা যায় না। এসব ব্যাপারেও ঐ ব্যাটা পাকিস্তানীরা বহু বহু দুর পিছিয়ে।
৫. সেখানে বেকারের সংখ্যা বা শতকরা কত তা জানা না গেলেও সে দেশ থেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে খুব বেশী লোক অবৈধভাবে পালিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় বা মালয়েশিয়া-সিংগাপুর গেছে বলে খবর পাওয়া যায় নি। কিন্তু এই সোনার বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ যুবক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ঐ সব দেশে গেছে ও যাচ্ছে। একমাত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশেই নাকি প্রায় লাখ খানেক বাংলাদেশী অবৈধভাবে ঢুকেছে যার জন্য এখন তারা বাংলাদেশের ওপরই চাপ সুষ্টি করেছে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য। এমনকি পাকিস্তানীরা তাদের মা-বোনদেরকে কোন মুসলিম দেশেও গৃহকর্মীর নামে (কার্যতঃ) যৌনদাসী পাঠানোর কোন উদ্যোগ নেয়নি যা এই সোনার বাংলাদেশ নিয়েছে।
৬. পাকিস্তানীরা শিক্ষা-দীক্ষায়ও যে কতটা পিছিয়ে সেটা প্রমান হয় এতে যে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে (কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন-এর মত) খ্যাত এদেশের ঢাকা বিশ্বব্যিালয় বর্তমানে বিশ্বের হাজার খানেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে না থাকলেও তাদের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় সেই তালিকায় আছে বলে জানা যায়। এছাড়া তাদের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক মারামারি হাতাহাতি করেছে এত বড় সাহসিকতার (?!) খবরও পাওয়া যায় নি। বিশেষ কোন ছাত্র সংগঠন অপরাপর সব ছাত্র-ছাত্রীকে ’পায়ের ভৃত্য’-তে পরিনত করেছে এটাও জানা যায় নি।
৭. পাকিস্তানীরা এতটাই অকর্মা যে তাদের মধ্যে বিশ-পঁচিশ জনও কোন নির্বাচনে বিনা ভোটে সংসদ সদস্য হতে সাহস করে নি। যদিও বাংলাদেশে অন্ততঃ একশত চুয়ান্ন জন মহা সাহসিকতার সাথে বিনা ভোটে নির্বাচিত (??!!) হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। তাদের সরকারও এমন করিৎকর্মা হতে পারে নি যে জনগনের নির্বাচিত কয়েকশ’ জনপ্রতিনিধিকে ¯্রফে কলমের খোঁচায় বরখাস্ত করে।
৮. পাকিস্তানের বর্ডারে ভারতের বিএসএফ গোলাগুলি করতে দশবার চিন্তা করে; কারন, শোনা যায়, একজন পাকিস্তানী মারা গেলে তারা ৩/৪ জন ভারতীয়কে হত্যা করে তবে ক্ষান্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো। এখানে ’মেরেছ কলসীর কানা, তা বলে কি প্রেম দেব না? - এই নীতি চলে। বাংলাদেশী কেউ বিএসএফ-এর গুলিতে মারা পড়লে বাংলাদেশের সীমান্তে ’গার্ড বাহিনী’ বিএসএফ-এর সৈন্যদেরকে বিশেষভাবে আপ্যায়ন করে পুলকিত চিত্তে তাদের কাছ থেকে লাশ গ্রহন করে (অবশ্য যদি তারা দয়া করে সেটা ফেরত দেয়) দেশের মানুষকে কৃতার্থ করে।
৯. পাকিস্তানে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে, সন্ত্রাসী হামলা হয় এটা ঠিক। তবে সেখানে আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর নামে বিরোধী রাজনীতিকদেরকে গুম-খুন করার এবং সে সব ঘটনা ধামাচাপা দেবার জন্য কোরাস গাইবার মত ’বন্দুকযুদ্ধের’ কাহিনী তেমন শোনা যায় না। শোনা যায় না আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য কর্তৃক এমন সাত সাতজনকে অবলীলায় খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার মহা সাহসিকতার কাহিনী।
১০. পাকিস্তান তার নাম পেয়েছে জন্মের সাথে। ইতিহাসে কখনো পাকিস্তানের নাম কোথাও ছিল বলে প্রমান নেই। তবুও পাকিস্তানের ¯্রষ্টার নামে রাস্তাঘাট, মাঠ-ময়দান, দালান-কোঠা, ব্রিজ-কালভার্ট সেই ’পিতার’ নামে, হয় নি। মহান প্রতিবেশী ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর নামেও তা হয় নি। ভিয়েতনাম নিজেদের সাথে ও বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাধর মার্কিনীদের সাথে এক যুগেরও বেশী লড়াই করেছে। সেখানে কত লাখ মানুষ মারা গেছে তার কোন হিসাব নেই। তবু সেই কঠিন যুদ্ধে তাদের নেতৃত্বদানকারী তাদের অবিসংবাদিত নেতা হো চি মিন্হ-এর নামে দেশে আনাচে কানাচে নামকরনের হিড়িক পড়ে নি। একইভাবে নেলসন ম্যান্ডেলার মত বিশ্বনন্দিত নেতার নামেও দক্ষিন আফ্রিকার মাঠ-ময়দান নামাংকিত হয় নি। কিন্তু বাংলাদেশে জাতির পিতা (অবশ্য বাংলাদেশ নামটি নাকি হাজার বছর ধরেই বিদ্যমান ছিল) মাটি-আকাশ-বাতাস জুড়ে বিরাজমান। কেবল তাই নয়, জনগনের পয়সায় তার পরিবারের নামেই পুরো বাংলাদেশ এখন পরিচিত।
১১. সব শেষে বলতে হয় যে বঙ্গসন্তানদের মত এমন সাহসী কেউ নেই পাকিস্তানে যে তাদের কোন নেতাকে তার শিশু সন্তানসহ তারা একেবারে সবংশে নিধন করতে পেরেছে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করা যে কতটা ”মানহানিকর” সেটা বলাই বাহুল্য।