নতুন বিশ^ ব্যবস্থা ও ইসলাম
আজ থেকে প্রায় বছর চল্লিশেক আগে বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে ’The Irony of Capitalism’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই নিবন্ধে তিনি যা বলেছিলেন তার সারাংশ হচ্ছে এক সময় পুঁজিবাদ তার অন্তর্নিহিত গুন বা দোষেই ধ্বংস হয়ে সমাজবাদের জন্ম দেবে। অন্যদিকে সমাজবাদও এক সময় তার অন্তর্নিহিত দোষ বা গুনে পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। আজকে তার সেই প্রেডিকশন প্রায় ৯০% ভাগ সত্যে পরিনত হয়েছে। পুঁজিবাদের বিপুল আগ্রাসী নীতির ফলে ‘ইরম ভরংযবং ংধিষষড়ি ংসধষষ ভরংযবং’ - এই থিওরীর মতে খুবই অল্প সংখ্যক মালিকের হাতে আসবে শিল্প ও বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্পোরেট বা কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানে পরিনত হবে যাতে করে অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মালিক থেকে কর্মীতে পরিনত হবে। অপর দিকে সমাজতন্ত্র যেহেতু মানুষের স্বভাবজাত উচ্চাকাংখা, যেমন একটু বেশী আরাম আয়েস, একটু অতিরিক্ত বিনোদনের সুযোগ ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হতে থাকবে, সেহেতু তাদের মনমানসিকতা সমাজতন্ত্রের পক্ষে আর কাজ করতে চাইবে না। এই বিষয়ের বা¯তব প্রতিফলন আমরা সোভিয়েট ইউনিয়নের পতন এবং মাও সে তুঙ-এর কট্টর কম্যুনিজমের বদলে দেং শিয়াও পিং-এর নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান চীনের অভাবনীয় ও অবিশ^াস্য উন্নতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।
রবার্ট জে, স্যামুয়েলসনের উপরোক্ত নিবন্ধের উত্তরে আমি একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম এবং তা টাইম ম্যাগাজিনে পাঠিয়েও ছিলাম। যদিও জানতে পারিনি তা প্রকাশ করা হয়েছিল কি না। তবে আমার নিবন্ধটি ছিল পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্রের বিপরীতে ইসলামিক অর্থনীতির বৈশিষ্ট এবং তার সুবিধা ও কল্যানকর দিক সম্মন্ধে। এই নিবন্ধে তার একটু বিস্তারিত পরিচয় দেবার চেষ্টা করব।
সম্প্রতি একটি বিশ্লেষণমুলক আলোচনার দেখা গেল কিভাবে পশ্চিমা ধাঁচের পুঁজিবাদ দেশে দেশে ব্যর্থ হয়েছে। তেমনি কট্টর কম্যুনিজম বা সোভিয়েট ধাঁচের সমাজতন্ত্রেরও একই পরিনতি ঘটেছে এবং এক পর্যায়ে সোভিয়েট ইউনিয়ন ধ্বসে পড়েছে। আলোচক আফগানিস্তানের উদাহরন টেনে বলার চেষ্টা করেছেন যে প্রথমে সোভিয়েটরা সেখানে সমাজতন্ত্র চালু করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু দশ বছরের চেষ্টায়ও তাতে আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক কোন উন্নতি তো হয়-ইনি, বরং পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে গেছে। এরপর মার্কিন যুক্তরাস্ট্র ও তার মিত্ররা ভুয়া অজুহাতে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া ধ্বংস করে সেখান তাদের ধাঁচের গনতন্ত্র ও পুঁজিবাদ চালু করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফলাফল আজ কতটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁচেছে তা বিশ^বাসী দেখছে। সেখানে বর্তমানে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। পশ্চিমা ধাঁচের গনতন্ত্র এবং তার প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক পুঁজিবাদ কোন দেশেই সাধারন মানুষের আশা-আকাংখা পুরন করতে পারে নি; সমাজে ধনবৈষম্যও দুর করতে পারেনি। বরং পুঁজিবাদ ধনীকে আরো ধনী এবং দরিদ্রকে আরো দরিদ্র করেছে। বাংলাদেশ তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরনে পরিনত হয়েছে। এই দেশে নাকি ধনীর সংখ্যা বিশে^ অবিশ^াস্যভাবে বেড়েছে যার শতকরা হার বিশে^ সর্বোচ্চ - ১৭%। বস্তুতঃ পুঁজিবাদের বৈশিষ্টই হচ্ছে মুনাফার হার বৃদ্ধি। যত বেশী মুনাফা ততবেশী পুঁজি সঞ্চয় এবং ততবেশী ব্যবসার বিস্তার। এবং কার্ল মার্ক্সের মতে শ্রমিকের মজুরী ’চুরি’ করেই মালিক মুনাফা করে থাকে। জোসেফ প্রুঁধোর ভাষায় ‘চৎড়ঢ়বৎঃু রং ঃযবভঃ.’ এসব বক্তব্যের সারাংশ হচ্ছে পুঁজিবাদ ধনীকে আরো ধনী হবার সুযোগ করে দেবার সাথে সাথে শ্রমিককে আরো দরিদ্র করে ফেলে। শ্রমিকের মজুরী যে সব মালিকানার প্রতিষ্ঠান অধিকতর চতুরতার সাথে চুরি করতে পারে, তত দ্রুতই তাদের পৃুঁজির আয়তন বাড়ে এবং এ কারনেই কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কখনোই ধনী হবার সুযোগ পেয়েছে বলে দেখা যায় না।
পুঁজিবাদের আরেক বৈশিষ্ট হ’ল যে কোন উপায়ে মুনাফা বাড়ানো। একারনেই দেখা যায় ৯৫% শিল্প মালিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে থাকে অথবা তার চেষ্টা করে থাকে। আর এর ফলশ্রুতিতে রাস্ট্র প্রত্যাশামত রাজস্ব আয় করতে পারেনা যার ফলে রাস্ট্রীয় বিভিন্ন ব্যয়, সে প্রাতিষ্ঠানিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক বা উন্নয়ন বিষয়ক হোক, তা মেটানোর জন্য নানা রকম পরোক্ষ করের আওতা বাড়িয়ে থাকে। এর ফলে সাধারন মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়; দরিদ্র আরো অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যায়। আর এর চক্রক্রমিক ফল হ’ল এই যে তার সঞ্চয় বলতে কিছু থাকে না; ফলে দ্রব্যমুল্যের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতিতে সে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ে।
উল্টো দিকে ধনীরা তাদের আর্থিক সক্ষমতার জোরে যেমন নিয়ন্ত্রিত ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠন করনতে পাওে তেমনি সরকারকে তাদেও স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রভাবিতও করতে পারে। এবং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নানাভাবে তাদের ধনসম্পদের আয়তন আরো বাড়িয়ে নিতে পারে। এর ফলেই দেখা যায় বাংলাদেশের মত দেশে গনতন্ত্র প্রায় ’নিয়ন্ত্রিত গনতন্ত্রে’ পরিনত হয়েছে; ফলশ্রুতিতে সবচেয়ে ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের ধনসম্পদ কেবল দেশের ভেতরেই থাকে না, বাইরেও চলে যায় অথচ দরিদ্র জনগন তাদের ভোটের অধিকার তাদের ইচ্ছামত প্রয়োগ করতে পারে না, তেমনি তাদের পরিবারের জন্য দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করতেই নাভিশ্বাস তুলে ফেলে। বর্তমান বিশ্বে অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের এটাই বাস্তব চিত্র।
অপরদিকে মাও সে তুঙ-এর কট্টর কম্যুনিজমও যে মানুষের জাগতিক সমস্যার সমাধান করতে পারেনি তার বড় প্রমান অল্প কিছুদিনের মাথায় কমরেড দেং শিয়াও পিং-এর নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের লাইনে চীনের অর্থনীতির গতি পরিবর্তন। সমাজতন্ত্রে বলা হয় each according to his need, each according to his ability অর্থাৎ যার যেমন প্রয়োজন এবং যার যেমন সামর্থ্য। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে আমার সামর্থ্যের পুরোটি না দিলেও যদি আমার প্রয়োজন মিটে যায় তবে আমার পুরো সামর্থ্য কেন কাজে লাগাব? উদাহরন হিসেবে ধরা যাক আমি দৈনিক দশটি টিভি ক্যাবিনেট বানাতে পারি। কিন্তু আমার প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাতটি বানানোই যথেষ্ঠ। তাহলে আমি অতিরিক্ত শ্রম কেন দেব? অথচ কার্ল মার্ক্সের ‘Theory of surplus value’-র মোদ্দা কথাটিই হচ্ছে ঐ ’সারপ্লাস ভ্যালুই’ পুঁজিবাদের মৌলিক বিষয় যার ফলে পুঁজি পুঞ্জীভুত হয়ে বাড়ে এবং মালিক ছোট পুঁজিপতি থেকে বড় পুঁজিপতি হয়ে ওঠে। এছাড়া শ্রমিকের বাড়তি মজুরী, যা নির্দিষ্ট পরিমান শ্রমের জন্য তার প্রাপ্য, সেটা চুরি করেই মালিক তার মুনাফা বৃদ্ধি করে। এ বিষয়ে এ বক্তব্যটি খুবই পরিষ্কার। যদি আমার অতিরিক্ত শ্রমের বিনিময়ে আমি কোন সুবিধা না পাই তবে কেন অনির্দিষ্টকাল ধরে আমি ঐ বেগার খাটতে যাব? আমি তো কোন যন্ত্র বা মেশিন নই। আমার তো আশা-আকাঙ্খা আছে, আছে প্রত্যাশা। একটু বেশী শ্রম দিই একটু অধিক আরামে থাকার জন্য। এটাই মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু তা যদি না পাই তবে আমি বেশী শ্রম দিয়ে তো ঐ অতিরিক্ত তিনটি টিভি কেবিনেট বানাব না। আর এর ফলে উৎপাদন কমে যাবে এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় আয় কমে যাবে। এর আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যায় না গিয়েই বলা যায় যে এ কারনেই প্রেসিডেন্ট ইউরি আšেদ্রাপভের সময়ে সোভিয়েট ইউনিয়নে প্রায় দুই কোটি টন খাদ্য ঘাটতি দেখা যায়। এর ফলশ্রুতিতে কৃষিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয় এবং মুলতঃ তখন থেকেই সোভিয়েট ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের দুর্বলতা ক্রমশঃ প্রকাশমান হতে থাকে। এ অবস্থা আরো ঘনীভুত হয় যখন তাসখন্দের ভয়াবহ ভুমিকম্পে দেখা যায় যে উদ্ধারকাজে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই এবং এজন্য পুঁজিবাদী দেশের সহায়তা নিতে হচ্ছে। এর কিছু দিন পরই তো বিশ^ দেখল প্রেসিডেন্ট গর্বাচেভের আমলেই সোভিয়েট ইউনিয়ন পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল।
ওদিকে চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির ’অভিভাবক’ অত্যন্ত বাস্তববাদী দেং শিয়াও পিং চীনে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করলেন। তাঁর কথা ছিল, বিড়ালটি কালো না সাদা, তার চাইতেও গুরুত্বপুর্ন হলো সেটা ইঁদুর ধরতে পারে কি না। চেয়ারম্যান মাও-এর কট্টর কম্যুনিজমের স্থলে তিনি অনেকটাই ফ্লেক্সিবল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করলেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সামান্য কিছু জমি, তাতে একটি বাসঘর, একটি ফ্রিজ রাখার অনুমতি দেওয়া হ’ল। মানুষ একেবারে আবদ্ধ অবস্থা থেকে একটু খোলা বাতাসে নিঃশ^াস নেবার সুযোগ পেল। বস্তুতঃ সেখান থেকেই শুরু হ’ল চীনের দ্রুততম গতিতে অগ্রযাত্রার। আর এর ফলশ্রুতিতেই আজ চীন বিশে^ প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিনত হয়েছে।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে এটা বলা যায় যে মনুষ্যসৃষ্ট পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র, কোন ’বাদ’ই মানুষের স্বভাবজাত আশা-আকাংখা পুরন করতে পারে নি। কারন এক ’বাদ’-এ ব্যক্তির আশা-আকাংখার কোন সুযোগ নেই, আর অন্যটিতে ধনসম্পদ পুঞ্জীভুত করার কোন সীমারেখা নেই যার ফলে ধনবৈষম্য অতি দ্রুতই সমাজের শ্রেনী বিন্যাসকে প্রতিকুলভাবে প্রভাবিত করে। উপরন্তু দ্রুততম সময়ে ধনবৃদ্ধির আরেকটি কুফল হচ্ছে সমাজে অনৈতিকতার ব্যপক বিস্তার; যার প্রকৃষ্ট উদাহরনও এই বাংলাদেশ। এই কুফলের বাস্তব উদাহরন হচ্ছে ক্রমবর্ধমানভাবে পারিবারিক বন্ধন ভেঙ্গে পড়া ও ডিভোর্সের সংখ্যাবৃদ্ধি, এলিট গনিকাবৃত্তির ব্যপক বিস্তার, এমনকি বাসাবাড়ী পর্যন্ত যার ব্যপ্তি। এমতাবস্থায় সমাধান কি? হ্যাঁ, সমাধান অবশ্যই আছে। আর সেটা হচ্ছে ইসলামিক অর্থনীতি ও সমাজনীতি। পুর্বোল্লিখিত রবার্ট জে, স্যামুয়েলসনের ’ঞযব ওৎড়হু ড়ভ ঈধঢ়রঃধষরংস’-এর উত্তরে যেটা আমি বলেছিলাম।
সমাজবাদী অর্থনীতিতে যেমন ব্যক্তি মালিকানার কোন জায়গা নেই, তেমনি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ধনসম্পদ পুঞ্জীভুত করার কোন সীমা নেই। আর মার্ক্সের Theory of surplus value’-কে আরেকটু ব্যাখ্যা করলে যে সার কথা বেরিয়ে আসে তা হ’ল শ্রমিকের মজুরীর ঐ অতিরিক্ত অংশ চুরি করেই দ্রুত মুনাফা বাড়ানো হয়; আর মুনাফা না বাড়লে পুঁজি বাড়ানো সম্ভব হয় না। তেমনি জোসেফ প্রুধোঁর ভাষায় ’Property is theft -এর সূত্র অনুসারে কারো না কারোর সম্পদ ’চুরি’ করা ছাড়া কেউ ধনসম্পদ এক্যুমুলেট বা জড়ো করতে পারে না। কিন্তু ইসলামিক অর্থনীতিতে কারো শ্রম বা সম্পদ চুরি করার প্রশ্ন আসে না কারন ইসলামের জাকাত প্রথা একটি বাধ্যতামুলক বিষয়। এই জাকাত ’সাহেবে নিসাব’ অর্থাৎ যার হাতে সংসার খরচ বাদে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ন থাকে, তার জন্য এর অতিরিক্ত সম্পদের ওপর শতকরা আড়াই ভাগ জাকাত দেওয়া বাধ্যতামুলক। আর এই জাকাতের অর্থ প্রধানতঃ দরিদ্র, খাণগ্রস্থ ব্যক্তি, প্রার্থী, মুসাফির এবং অভাবী নবদীক্ষিত মুসলিম, অসহায় এতিম - এই শ্রেনীর মানুষের প্রাপ্য। সমাজে ধনবৈষম্য দুর করার বা অন্ততঃপক্ষে কমিয়ে আনার এর চাইতে উত্তম কোন পদ্ধতি সমাজবাদ বা পুঁজিবাদ, কোন ’বাদ’এই নেই। ইসলাম এই জাকাতকে এমন গুরুত্ব দিয়েছে যে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে --
আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপনতা করে , এই কার্পন্য তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে এটা যেন তারা ধারনা না করে। বরং তাদের জন্য এটা একান্তই ক্ষতিকর হবে। যাতে তারা কার্পন্য করে সে সমস্ত ধনসম্পদকে কিয়ামতের দিন বেড়ী বানিয়ে তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হবে। (সুরা:৩, আয়াত:১৮০)
আবার বলা হয়েছে --
আর যারা স্বর্ন ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে কঠোর আযাবের কথা শুনিয়ে দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পাশর্^ ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধকরা হবে এবং বলা হবে এগুলো সেই সব যা তোমরা জমা করে রেখেছিলে নিজেদের জন্য। এক্ষনে তার আস্বাদ গ্রহন কর। (সুরা:৯, আয়াত:৩৪, ৩৫)
এইসব নির্দেশনা থেকে এটা পরিষ্কার যে সমাজবাদে বা কম্যুনিজমে ধনসম্পদ জমা করার কোন সুযোগ যেমন নেই, তেমনি পুঁজিবাদে প্রকৃত দরিদ্র, অভাবী, এতিমদের সাহায্যের জন্য রাস্ট্রীয় কোন সিস্টেমও নেই। যেটুকু আছে সেটুকু রাস্ট্রের বদান্যতা; বাধ্যতামুলক নয়। এজন্যই রাস্ট্র পুঁজির ’এক্যুমুলেশন’ বা পুঞ্জীভুত করার বিরুদ্ধে কোন আইনী ব্যবস্থা নিতে পারে না। প্রত্যক্ষ আয়করের মাধ্যমে হয়ত প্রকৃত অংকের একটা অংশ বড়জোর আদায় করতে পারে। অথচ ইসলামী অর্থনীতিতে জাকাতকে রাস্ট্র আইনী ও বাধ্যতামুলকভাবে আদায়ের ব্যবস্থা নিতে পারে। এবং যেহেতু ইসলামী জাকাত ব্যবস্থায় জাকাতের হকদারদেরকে সুচিহ্নিত করা হয়েছে, তাই এখানে জাকাতের অর্থ নয়ছয় করার কোন সুযোগ নেই। জাকাতের ব্যবস্থাটি এমনই অনুপম ও অনন্য অর্থব্যবস্থা যে একসময় ইসলামী খেলাফতের রাজধানী মদীনায় জাকাত নেবার লোক পাওয়া যেত না।
বস্তুতঃ জাকাত মানুষের ধনসম্পদকে পবিত্র করে কারন ’জাকাত’-এর আভিধানিক অর্থ পবিত্রকরন। জাকাত দিলে সম্পদ কমে না বরং তাতে আরো বরকত লাভ হয়। একইভাবে তা সমাজের দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষদের জন্য বিশেষ কল্যানকর একটি অর্থ ব্যবস্থা। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আরো এরশাদ হয়েছে --
ওয়া ফি আমওয়ালেকুম হাক্কুল লিস্ সায়েলে ওয়াল মাহরুম। (অর্থাৎ, তোমাদের অর্থসম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।) তাহলে দেখা যাচ্ছে যে ধনীদের সম্পদকে একচেটিয়াভাবে পুঞ্জীভুত করার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারী দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে এটা ধনীদের কোন বদান্যতার বিষয় নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশ। আর আল্লাহর নির্দেশের যারা পরোয়া করে না তারা তো মুসলমান বলে গন্য হবার যোগ্যই নয়।
তাই উপসংহারে বলা যায় যে ইসলামিক অর্থনীতিতে দেশ পরিচালিত হলে দেশে একজন হাজার কোটি টাকার মালিক আর অপরজন অর্ধভুক্ত ও গাছতলার বাসিন্দা হবার কোন সুযোগ নেই। পরিষ্কার গনিতের হিসাবে বলা যায় যে যিনি একশ’ কোটি টাকার মালিক তাঁর কাছে জাকাতের পরিমান আসে আড়াই কোটি টাকা। এই আড়াই কোটি টাকা একহাজার দরিদ্রকে ভাগ করে দিলে তারা প্রত্যেকে পঁচিশ হাজার টাকা করে পাবে। এতে তাদের কিছু না কিছু একটা করে স্বাবলম্বী হবার সুযোগ তৈরী হতে পারে যাতে তার আর পরের বছর জাকাত নেবার দরকারই হবে না। এভাবে দেশের সম্পদশালীরা যদি তাদের প্রদেয় জাকাত সঠিকভাবে আদায় করে তবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বছর দশেকের মধ্যেই শুন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানা যায় বর্তমানে দেশে প্রায় ২৫০০০ পরিবার আছে যাদের মালিকানায় কয়েকশ’ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আছে। তারা যদি সঠিক পরিমানে জাকাত আদায় করেন তবে একদিকে তাদের অর্থসম্পদে বরকত আসবে, অপর দিকে তাদের অর্থে বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের অবস্থার উন্নতি হবে। তবে এ ব্যাপাওে সরকারের সক্রিয় উদ্যোগী ভুমিকা অত্যাবশ্যক। সরকার দেশের প্রখ্যাত আলেম-ওলামা ও সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জাকাত বোর্ড গঠনের মাধ্যমে তা সংগ্রহ ও বন্টনের সুচারু ব্যবস্থা করতে পারে। এই জাকাত বন্টনের দায়িত্ব প্রতিটি গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবদেরকে অর্পন করলে তা যথাযথভাবে জাকাতের প্রকৃত হকদার ব্যক্তিগন পেতে পারে।
সাম্প্রতিককালে আফগানিস্তানে তালেবান শাসনে শরীয়া ভিত্তিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যব¯থা কায়েম করার প্রক্রিয়া চলছে। আজকে বিশ^ পরিস্থিতি বলছে সমাজবাদ ও পুঁজিবাদ, কোনটাই কোন দেশে টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারে নি। যে গনতন্ত্রের ধুয়া তুলে সা¤্রাজ্যবাদ দেশে দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, সেখানেও তাদের প্রেস্ক্রৃপশন অনুযায়ী গনতন্ত্র চলেনি। কারন গনতন্ত্র সত্যিকারভাবে কার্যকর এবং সুফলদায়ক হয় সেখানেই যেখানে মানুষ তাদের ভোটের মুল্য বোঝে। সুতরাং এখন ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই একমাত্র বিকল্প হিসেবে মঞ্চে আবির্ভুত হয়েছে। এখন নতুন বিশ^ব্যবস্থা চালুর মুখে উপনীত হয়েছে যে ব্যবস্থা ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশ’ বছর আগে মানব সমাজের সার্বিক কল্যানের লক্ষ্যেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার পক্ষ থেকে রসুলে করিম হযরত মুহম্মদ (দঃ) এর মাধ্যমে নাজিল হয়েছিল।
The prevailing situation all around and also all over the world seems so wierd when I look back a few decades ago to make a comparison. That pains me much. The incongruity and contrast is sometimes so incomprehensible and tragically unacceptable that my whole mind burns in rebellion. But as I can't do anything, so can't I share my feelings with anyone; that's why this monologue.
Friday, November 19, 2021
গণপরিবহনে নৈরাজ্য
শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্ব সরকারের - দৈনিক সমকাল।
গনপরিবহনে চলমান নৈরাজ্য যে খোদ সরকারেরই সৃষ্টি সেটা আর লুকানো কোন বিষয় নয়। কোন দেশে একটি সরকারের কাজ কি? দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃংখলা রক্ষা করা এবং বৈদেশিক শত্রুর হাত থেকে দেশ ও দেশের জনগনকে রক্ষা করা। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীন শৃংখলা রক্ষা করাটা সরকারের পরিচালকদের সূক্ষ দুরদৃষ্টি, সুচিন্তিত ও সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং তা কার্যকর করার শক্ত মানসিকতা এবং সর্বোপরি নিখাদ দেশপ্রেম একান্তই অত্যাবশ্যক। কিন্তু এই দেশের পরিচালকদের মধ্যে ঐ সব গুনাবলীর তীব্র অভাব। প্রকৃতপক্ষে রাজনীতিক আর রাস্ট্রনায়ক সমার্থক নয়। রাস্ট্রনায়ক অন্ততঃ একশ’ বছর পরে কি হতে পারে সেই দুরদৃষ্টি দিয়েই তার সকল পরিকল্পনার ছক আকেন। আর রাজনীতিকরা আপাতঃলাভের অংক কতটা হবে সেই ভাবনা মাথায় রেখে কাজ করেন। বাংলাদেশ অত্যন্ত জনবহুল ছোট্ট্ একটি দেশ। এই দেশের মাটি কতটুকু কিভাবে ব্যবহার করা হবে তার কোন পরিকল্পনা নেই। শহর পরিকল্পকদের মাথায় নেই এই শহরে কোন এলাকায় কতসংখ্যক পরিবার থাকলে সেখানকার সকল ইউটিলিটি সার্ভিস সুষ্ঠুভাবে দেওয়া যাবে। কতটুকু রাস্তা দরকার, সেই রাস্তায় কতটা যানবাহন চলাচল করলে রাস্তায় শৃংখলা বজায় রাখা সম্ভব হবে। তাদের মাথায় এটা নেই, ছিলনা কখনো, যে এত ঘনবসতিপুর্ন শহরে প্রাইভেট মালিকানায় পরিবহন ব্যবস্থা ছেড়ে দিলে তার পরিনামফল কি দাঁড়াবে। শহরের যত্রতত্র অসংখ্য রিকশা চলাচলোর অনুমতি দিলে রাস্তার শৃংখলা সম্পুর্ন ভেঙ্গে পড়বে কি না। এত ঘনবসতিপুর্ন শহরে সবচাইতে উপযোগী হতো সরকারী মালিকানায় সমান সংখ্যক পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট ব্যবস্থা। কিন্তু সরকারী মালিকানাধীন বিআরটিসি চোর-ডাকাতে আকীর্ন করে রাখা হয়েছে যারা বিশ্বের নামকরা ভোলভো ডাবলডেকার বাসগুলিও বছর না ঘুরতেই ডাম্পিংএ পাঠিয়েছে অথচ এমন বাস প্রাইভেট মালিকানায় থাকলে দশ বছরেও কিছু হতো না। এর পেছনে যে সরকারী বেসরকারী স্যাবোটিয়ারদের উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রয়েছে তা আজ আর গোপন বিষয় নয়। এদেশের পুর্ববর্তী সরকারগুলো জনবান্ধব ও সাশ্রয়ী পরিবহন রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন উন্নয়ন করেনি। এর পেছনে সরকার পরিচালক এবং আমলাদের যে ঘোর অশুভ যোগসাজস ছিল সেটা আজ পরিষ্কার হয়ে গেছে। আশা ও প্রশংসার বিষয় যে বর্তমান সরকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সেই সাথে এটা দুঃখ ও হতাশাজনক যে বর্তমানে সারা দেশে রাস্তায় যে বিশৃংখলা ও আইন ভাঙার প্রবল প্রবনতা চলছে, তার বিরুদ্ধে সরকার যথেষ্ঠ প্রতিরোধমুলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বেসরকারী পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা যে তাদের খেয়ালখুশীমত যখন তখন হরতাল ধর্মঘট ডেকে জনসাধারনকে অসীম দুর্ভোগে ফেলছে, সেটা সম্ভব হতো না যদি সরকার সমান সংখ্যক ডাবলডেকার বাস শহরের রাস্তায় নামাতে পারত। কিন্তু সরকারের মধ্যেই যদি ‘বেড়ায় ক্ষেত খাওয়া’র মত এজেন্ট থেকে থাকে তবে রাস্তায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের কোন প্রচেষ্টাই সফল হবে না।
Subscribe to:
Posts (Atom)