Thursday, July 26, 2018

দেশে মামলাজট

দেশে মামলাজট বলে একটা কথা বহুল প্রচলিত হয়েছে। বর্তমানে জটবদ্ধ মামলার সংখ্যা নাকি চৌত্রিশ লক্ষ। এই জটবদ্ধ মামলার ৮০% নাকি জমিজমা সংক্রান্ত। তবে কেন এই জটের সৃষ্টি হয়েছে তা পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় এর বিরাট অংশ একশ্রেনীর মামলাবাজ ব্যক্তি, উকিল, এবং পেশকারের অর্থলোভ এবং ক্ষেত্রবিশেষে খোদ কিছুসংখ্যক বিচারকের অনভিজ্ঞতা ও অন্যবিধ কারনও এর জন্য দায়ী। আমরা জানি বিচারককে ’বিজ্ঞ’ বলে সম্বোধন করতে হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় এই ’বিজ্ঞ’ কথাটার ভেতরেই বেশ সমস্যা রয়েছে। একটি মামলার মেরিট কতটুকু সেটা আরজি ও তার জবাবের মধ্যেই একজন প্রকৃত ’বিজ্ঞ’ বিচারকের প্রথম দৃষ্টিতেই ধরা পড়ার কথা। কিন্তু দেখা যায় যে যে কোন মামলা আসলেই কোন রকম আপাতঃ পরিবীক্ষণ ছাড়াই দিনের পর দিন সেই মামলার তারিখ দিয়ে মামলাবাজ বাদীকে উতসাহিত এবং উকিল, মুহুরী ও পেশকারকে বিবাদীকে দুয়ে নেবার সুযোগ করে দেওয়া হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় কোন একটি জমিসংক্রান্ত মামলা রুজু হলো সাজানো কারন উদ্ভবের ৩০/৩৫ এমনকি ৬০/৬২ বছর পরে ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে। এই দীর্ঘ সময়ে সেই বাদীর সংশ্লিষ্ট জমির দখল তো দুরে থাক, সিএস, এসএ, আরএস, বিএস - কোন খতিয়ানেই তার নাম নেই, কোন দাখিলা নেই। এই দীর্ঘ সময় পরে হঠাত কোথা থেকে কিছু বানানো কাগজপত্র নিয়ে মামলা রুজু করা হয়েছে। এরকম মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে আর এর মধ্যে অনেক বাদী বা বিবাদী মারা গেলেও সেসব মামলার সুরাহা হয় না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদেরকে নতুন করে মামলার পক্ষ করে তা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবেই মামলার জট জমে ওঠে। বিচারক বদলী হয়ে যান, হয়ত উকিলও মারা যান; কিন্তু তাদের উত্তরসুরীরা সেই মামলা চালাতেই থাকে। আবার এমনও দেখা যায় যে কোন একটুকরো জমির একবার নাম ও জমা খারিজ হবার পর ৮/১০ বছর খাজনা ইত্যাদি দেবার পর হঠাৎ কিভাবে যেন একরকম ভৌতিকভাবেই সে জমির দাগ-খতিয়ান, চৌহদ্দী বা পরিমান বদলে গেল প্রকৃত মালিকের অজ্ঞাতসারে। কিংবা কানুনগো বা জরিপকারীর ভুলে - তা সে ইচ্ছাকৃতই হোক আর অনিচ্ছাকৃতই হোক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয় সেটাও বাস্তব সত্য), সে ভুল সংশোধন করার সহজ বা সুলভে কোন সমাধান নেই। এর জন্য দীর্ঘকালীন মামলায় জড়িয়ে থাকতে হবে, যা অবিশ্বাস্য সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। হ্যাঁ, ভুল হতেই পারে; কিন্তু সে ভুল সংশোধন করার পদ্ধতি এতই জটিল যে সে ধরনের মামলাও মামলাজটের অন্যতম কারন হয়ে থাকে।
এসব বিষয় যদি আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বের সাথে বিচেনা করা না হয়; যদি প্রকৃত যৌক্তিক কারন ছাড়াই দিনের পর দিন সেই মামলার তারিখ পড়তে থাকে আর সেই মান্ধাতার আমলের আইন দিয়েই এসবের বিচারের (?) সিলসিলা চালু থাকে তবে চলমান মামলাজট কমানোর কোন প্রচেষ্টাই সফল হবে বলে মনে হয় না। মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয় যদি এ ব্যপারে একটু দৃষ্টি দেন তবে এই মামলাজট এবং এর সাথে বাদী-বিবাদীর হয়রানি ও অনর্থক অর্থনাশ - দুটোরই ইতিবাচক সমাপ্তি হতে পারে।

Tuesday, July 3, 2018

Political leaders of Bangladesh - Quality and opportunity

বিশ্বে সম্ভবতঃ বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজ এবং লাভজনক পেশা হচ্ছে রাজনীতি।  যে কোন চাকুরী-বাকরীতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষন, মেধা ইত্যাদি অত্যাবশ্যক। কিন্তু দেখা যায় রাজনীতিই এই দেশে এমন একটি পেশা যাতে উপরোক্ত কোনটিরই দরকার নেই। হ্যাঁ, একটি বিষয়ে বিশেষ গুন থাকা অত্যাবশ্যক এবং সেটা হচ্ছে কিছু গৎবাঁধা মুখস্ত বহুল উচ্চারিত বুলি, গলার জোর এবং মারদাঙ্গায় পটুত্ব। গোলাগুলি চালাতে পারলে আরো ’উন্নতি’। এতে ’নেতা’ হওয়াটা আরো সহজ হয়ে যায়। রাজনীতি অন্যান্য দেশে করে জনগনের সেবা করা দেশকে কিছু দেওয়ার জন্য। এসবই করা হয় দেশকে ভালবেসে, দেশের প্রতি দায় এবং দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই প্রয়োজন নেই। কারন এখানে রাজনীতি করা হয় বিনা পুঁজিতে অতি স্বল্প সময়ে কোটিপতি হবার জন্য। বস্তুতঃ অতি স্বল্প সময়ে ধনী হবার জন্য রাজনীতির চেয়ে আর কোন পন্থা এদেশে নেই। একটু লক্ষ্য করলেই এ কথার যথার্থতা মিলবে। দেখুন, ছাত্রাবস্থা শেষ হয়নি; এমন সময়েও ব্যাংকমালিক হওয়া যায়, হেলিকপ্টারে দাওয়াত খেতে যাওয়া যায়, রাজধানী শহরের সবচেয়ে পশ এলাকায় হাইরাইজ বিল্ডিং করা যায় এমনকি বিদেশে সেকেন্ড হোমও করা সম্ভব। কারন রাজনীতি করলেই, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করলেই এসব যেন আপনাআপনিই এস পায়ের কাছে জমা হয়। যে ব্যক্তি এই কিছুদিন আগে সামান্য বিড়ি চেয়ে খেত, বা চোরাচালানের বাহক ছিল, মাদকের ক্যারিয়ার ছিল, বা এমনকি গাড়ী চুরির সাথেও জড়িত ছিল, রাজনীতিতে আসার পরপরই, অথবা রাজনীতির ব্যক্তিদের সাথে ’গ্লাসফ্রেন্ড’ হবার সুবাদেও শুধু কোটি নয়, হাজার কোটি টাকার মালিক হতে পারে। এটা এ দেশ ছাড়া, যেখানে দিবারাত্র বিশেষ বিশেষ চেতনার ধুয়া তুলে চারদিক ’আন্ধার’ করে তোলা হয়, সেখানে ছাড়া আর কোন দেশে সম্ভব? এখানে রাজনীতিতেও মেধা, যোগ্যতা বা আদর্শবাহী ব্যক্তিত্বও কোন কল্কে পায় না।  একেবারে মৌরসী পাট্টার মত এখানেও জমিদারের ছেলেমেয়েকেই জমিদার হতেই হবে, সে বোবা-কালা-অন্ধ-বধির যেই হোক। এ কারনেই ঠিক যেমন বটগাছের নীচে আর কোন ছোট গাছ বাড়তেই পারে না তেমনি সর্বোচ্চ নেতার ছায়ায় আর কোন নেতা উঠতেই পারে না। অথচ এ সবই করা হয় গনতন্ত্রের নামে। এর কারন সুবিধাবাদের রাজনীতি কেবল সেই তন্ত্রেরই ধারক-বাহক হয়ে তাকে যে তন্ত্র তাদেরকে অবাধ ক্ষমতা চর্চা ও প্রয়োগ করতে কার্যকরভাবে সহায়তা করে।
এবং উপরোক্ত কথাগুলির সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিনিয়তই এদেশে দৃশ্যমান। কারন এদেশই এমন একটি দেশ যেখানে কোন রকম পরিকল্পনা ছাড়াই যে কোন কিছু করা সম্ভব। এখানে শহর গড়ে ওঠে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই, যা অল্প দিনের মধ্যেই আর বাসযোগ্য থাকে না। ’উন্নয়ন’ পরিকল্পনা করা হয় কোন সুবিবেচনা, দুরদর্শিতা ও সু-পরিকল্পনা ছাড়াই যাতে শত টাকার কাজ হাজারেও শেষ হয় না; বছরের কাজ যুগেও শেষ হয় না। শিক্ষা একটি জাতির মেরুদন্ড হলেও তা নিয়ে গিনিপিগসুলভ এক্সপেরিমেন্ট যুগের পর যুগ চলতেই থাকে আর দেশ একদল তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বেকার শ্রেনী উৎপাদন করে। যেখানে মেধার কোন কদর নেই, অ-মেধাবী/মেধাহীনদেরকে গুরুত্বপুর্ন সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এমনই শাসন-প্রশাসন চলে যে ডাক্তারকে ব্যাংকার, ব্যবসায়ীকে শিক্ষাব্যবস্থার কর্নধার, নকলবাজ ও নীতি-নৈতিকতাহীনদেরকে শিক্ষক ইত্যাদির মাধ্যমে সর্বত্র  ’স্কয়ার পেগ ইন এ রাউন্ড হোল’ অবস্থা সৃষ্টি হয়। প্রকৃত আদর্শ না থাকার ফলেই রাজনীতির নামে যে সুবিধাবদিতা বা ’অপরচ্যুনিজম’ চলে তাতে আজকের ’friend  (বন্ধু) কালকে ’foe (শত্রু)-তে পরিনত হয়। আজকে যা ভাল অবস্থান বদলে গেলে কালকে তা সবচেয়ে অপছন্দনীয় হয়ে পড়ে। হ্যাঁ, শিক্ষা-ই যে সব কিছু সেটা না হলেও মানুষের অন্তর্নিহিত গুনকে বোঝার ক্ষমতা তো অবশ্যই থাকতে হয়, নইলে অতি সাধারন একজন বিড়ি ব্যবসায়ী বা সামান্য একজন সাব-কন্ট্রাক্টরও গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির মালিক হতে পারতেন না। স¤্রাট আকবর নিরক্ষর হলেও তিনি ’রতন’ চিনতেন। তাই তিনি ’আকবর দি গ্রেট’ হতে পেরেছিলেন। কিন্তু ব্যতিক্রম তো আর নিয়ম নয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলির যথার্থতা কতটুকু সেটা আমাদের দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে তাকালেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি প্রকৃত কোন কমিটমেন্ট না থাকায়, প্রকৃত ভালবাসা না থাকায় দেশ দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। মাৎসান্যায় প্রবলপ্রতাপে রাজত্ব করে। শাসকদের জবাবদিহিতা বলতে কোন বস্তুর অস্তিত্ব থাকে না। আর এসব না থাকলে গনতন্ত্র গনতন্ত্র বলে যতই গলা ফাটানো হোক, দেশকে অমুক স্তরে তমুক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে যতই বাগাড়ম্বর করা হোক, কোন কিছুতেই দেশের সাধারন মানুষের কোন উপকার হয় না। দেশও উন্নয়নের রাস্তায় গো-শকটের চেয়ে বেশী গতি পায় না।
আজকে এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, এটা তদানীন্তন অধিকাংশ রাজনীতিক নেতা ভাবেন নি। ভাবলে একটা নতুন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পরিচালনা করতে সক্ষম এমন অন্ততঃ একটি শ্রেনী বা গ্রুপ তো তৈরী থাকত। মহামতি (?) লেনিনের ভাষায়, ’Give me thirty professional revolutionaries and I will turn Russia upside down - এই কথাটার মর্মার্থ আমাদের নেতারা উপলব্ধি করতেন। এরকম প্রস্তুতি ছিলনা বলেই সদ্যস্বাধীন দেশটি অনতিবিলম্বেই লুটেরাদের দারুন মৃগয়াক্ষেত্রে পরিনত হয় যা বঙ্গবন্ধুর মত ’monumental'  ব্যক্তিত্বও সামলাতে পারেন নি । ইতিহাস সাক্ষী সম্পুর্ন বিধ্বস্ত জার্মানী বা জাপান সে রকম নেতৃত্ব পেয়েছিল বলেই তারা মাত্র ২৫/৩০ বছরের মধেই সেই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে ফিনিক্স পাখীর মত পুনর্জীবন লাভ করে এবং ঐ সময়ের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক শক্তিতে উন্নীত হয়। এমনকি মহাযুদ্ধোত্তর সোভিয়েট ইউনিয়নও একটি কৃষিপ্রধান দেশ থেকে শিল্পোন্নত পরাশক্তিতে পরিনত হয়। দেশপ্রেমিক, দৃঢ়সংকল্প ডিক্টেটররাও অনেক ক্ষেত্রে এমন উদাহরন রেখে গেছেন যে কারনে প্রথম মহাযুদ্ধে প্রায় সর্বস্ব হারানো জার্মানী ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল – মাত্র এই দশ বছরের মধ্যে এমন অকল্পনীয় উন্নতি করে যে তাকে থামাতে আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্সের মত শক্তিকেও বিপুল ক্ষতির শিকার হতে হয়। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উদ্গাতা লেনিনের মৃত্যুর পর জোসেফ স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে ৪/৫ মাস আগেই সমাপ্ত করেছেন এবং তাঁর দেশকে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের প্যারালাল একটি শক্তিতে পরিনত করেছেন। তাদের লক্ষ্য সুদুর হলেও ছিল সুনির্দিষ্ট। তাই তাদের কাছে সময়ের মুল্য ছিল সবচেয়ে বেশী, যার জন্য তাদের কাজকর্ম ছিল ’Race against time’।  আর আমাদের দেশে? স্বাধীনতার দু’তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে এক নির্মম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়। হতে হয় ’তলাবিহীন ঝুড়ির’ তকমাধারী এক ছ্যারাবেরা দেশ। আজও এক বছরের কাজ শেষ হতে চার/পাঁচ বছর লেগে যায়, হাজার টাকার প্রকল্প কোটি টাকা খেয়ে ফেলে। অথচ ’উন্নয়নের জোয়ারে’ দেশ ভেসে যাচ্ছে বলে আমরা নিজেরা নিজেদের পিঠ নিজেরাই চাপড়াই। এসবই ঘটে তখনই যখন অদুরদর্শী, অ-দেশপ্রেমিক, অ-জনবান্ধব এবং অদক্ষ নেতৃত্ব সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়।
উপরোক্ত কথাগুলি হয়ত অনেকের কাছেই অগ্রহনযোগ্য এমনকি কট’ও লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা তাতে বদলায় না। আজ স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছরেও আমাদের দেশ যে কেবল ’উন্নয়নশীল’ তকমা পেল এতে খুশী হবার চেয়ে দুঃখিত হওয়ারই কথা। কিন্তু আমাদের স্বভাব বৈপরীত্যের কারনে আমরা দেশ ডিজিটাল বলে গর্ব করি অথচ আমাদের আঠার মাসে নয় বরং চব্বিশ মাসে বছর হচ্ছে এটা মনে আসে না।