Wednesday, May 30, 2018

আমাদের বদভ্যাসসমূহ ও এর কারন
বর্তমান সমাজে নানা অসঙ্গতি, নানা অনাচার, অনাকাংখিত ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব ঘটনায় অশিক্ষিত মূর্খ দের চেয়ে শিক্ষিত লোকদেরই সংশ্লিষ্টতা বেশী। কারন কি? কারন খুবই সহজ ও বোধগম্য। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করে বলা যাক।
শিক্ষার অর্থ হচ্ছে ’আচরনের কাংখিত পরিবর্তন।’ ইংরেজীতে বলা যায়, ডেজায়ার্ড চেঞ্জ অব বিহেভিয়ার। এই ’বিহেভিয়ার’ নিত্য অভ্যাসেরই সামষ্টিক রূপ। আবার এই অভ্যাস একটা শিশুর শৈশবকাল থেকেই  নিত্য জীবনাচরনের মধ্যেই গড়ে ওঠে। সে সেটা তার পরিবার, পারিপার্শ্বিকতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্রমাগত আয়ত্ব করে থাকে। এটা হঠাৎ একদিনকার বিষয় নয়। তাহলে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিষয় নয়; বরং শিক্ষা এমনই একটি বিষয় যা মানুষের জীবনাচরনকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন সাধন করে। এখন মিলিয়ে দেখুন তো এই কথাটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বা সিলেবাসের কোন অংশে আছে? আজকে শিক্ষার চেয়ে জিপিএ-৫/এ+ পাওয়াটাই শিক্ষার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন স্কুল বা কলেজের মান নির্নীত হচ্ছে সেখান থেকে কতজন জিপিএ-৫ বা এ+ পেয়েছে। সেইসব শিক্ষার্থী আসলেই কিছু শিখেছে কি না, তার আচরনের কাংখিত পরিবর্তন হয়েছে কি না সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। এইসব শিক্ষিত (?) নামীয় মানুষগুলো কি আদৌ শিক্ষিত? তাহলে তারা সামান্য কমনসেন্সের অধিকারী নয় কেন? কেন তাদের সিভিক সেন্স বলে কোন বিষয় তাদের মনের মধ্যে নেই? কেন তারা শেখেনি কিভাবে নাগরিক জীবন যাপন করতে হয়; কিভাবে সামষ্টিক জীবন বা ’collective living’-এ অভ্যস্ত হতে হয়? কেন একজন শিক্ষিত মানুষ স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক, মর্ষকামী বা ধর্ষকামী হয়? কারন তাকে কেউ এসব শেখায় না। না পরিবার, না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তার মনমানসে থাকে কেবল কিভাবে ভাল স্কোর করতে হবে; কিভাবে জিপিএ-৫/এ+ পেতে হবে। অথচ বিদেশে শিক্ষার সাথে সাথে সহমর্মিতা ও অন্যের সাথে অংশীদারী হওয়া - ইংরেজীতে যাকে বলে ’fellow-feeling and sharing - পারষ্পরিক সাহায্য ও সহযোগীতার মনোভাব, সহপাঠীদের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে টীমস্পিরিট হিসেবে নিজের সাফল্য ও ব্যর্থতা বলে মেনে নেওয়া ইত্যাদি বিষয় পাঠ্যসূচীর সাথে সমানভাবে গুরুত্বসহকারে শেখানো হয় যাতে শিক্ষার্থী স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা না শেখে। এসব বিষয় কি আমাদের পাঠ্যসূচীতে আছে, এমনকি শ্রেনীকে কোন শিক্ষক আলোচনা করেন? বাড়ীতে কি শিক্ষার্থীদের বাবা-মা তাদেরকে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কিছু বলেন?
তাই শিক্ষিত লোকেরা যত্রতত্র কেবল থুথুই ফেলে না, যত্রতত্র প্রাকৃতিক কর্ম সারতেও ইতস্ততঃ বা লজ্জা বোধ করে না, আশেপাশের ফুলগাছগুলোকে দুমড়েমুচড়ে ফেলতে কার্পন্য করে না, ফুটপাতে মটরবাইক চালানো তো কোন ব্যাপারই না। এই শিক্ষিত লোকেরা রাস্তার বামপাশে গাড়ী রেখে অন্যকে বামে যাবার সুযোগ দেবার বদলে পুরো রাস্তাই ব্লক করে রাখে। দ্রুত ছোটার জন্য অনায়াসে লেন পরিবর্তন করে পিছনে নিকটেই আর কোন গাড়ী কোন গাড়ী আছে কি না তা বিচার-বিবেচনা ছাড়াই। এমনই ভাব যেন রাস্তাটা তার একার জন্যই তৈরী করা হয়েছে। ফুটপাত হাঁটার জায়গা হলেও অবলীলায় সেখানে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে গালগল্প করছে অন্য পথচারীদের সুবিধা-অসুবিধা তার পরোয়া না করেই। শৃংখলা বলতে একটা বিষয় আছে, সেটা বিদ্যালয়ে মুখ¯থ করানো হলেও তাদের কাজে তার কোন প্রতিফলন দেখা যায় না। তথাকথিত উচচশিক্ষিত লোকেরা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সাহেবরাও হাতা গুটিয়ে মারামারি করতে বা আপন কন্যাসম শিক্ষার্থীকে যৌন হেনস্তা করতেও ইতস্ততঃ করেন না; সামান্য বৈষয়িক লাভ বা আপন সুবিধার্থে বিশেষ বিশেষ শিক্ষার্থীকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া তো অতি সাধারন ব্যাপার। নিজেকে সকল শ্রেণীর শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহনযোগ্য, আদর্শ ও অনুকরন-অনুসরনযোগ্য করে তোলার বদলে বিশেষ রাজনৈতিক ছাতার নীচে আশ্রয় নিয়ে নানা রঙে রঙিন হতেও তারা কুন্ঠিত হন না। আবার তারাই কোন ছাত্র-ছাত্রী তাদেরকে যথাযথ সম্মান করল না বলে তাদের ওপর ক্ষোভও প্রকাশ করে ফেলেন। কি আজব ব্যাপার!
তো পুরো বিষয়টা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের আচরনের কাংখিত পরিবর্তন আনতে পারে, সে শিক্ষা বর্তমানে এদেশে দুর্লভ বা নেই বললেই চলে। আর এর বিষময় ফল আমরা নিত্যই প্রত্যক্ষ করছি। তাই অশিক্ষিত গাড়ীচালক, মুটে-মজুর, রিক্সাচালক ইত্যাদিকে আমরা দোষারোপ না করে নিজেদের দিকে একটু তাকালেই অনেক বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের গন্ডাগন্ডা ডক্টরেট ডিগ্রীধারীগনও যে কমনসেন্স ও সিভিকসেন্সের প্রচন্ড অভাবে ভোগেন তার ভুরি ভুরি উদাহরন আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। আমাদের যারা ভাগ্যবিধাতা, তারা নিজেরা কতটা দায়িত্বশীল, কতটা সত্যিকার দেশপ্রেমিক, কতটা জনকল্যানকামী, কতটা সৌন্দর্যপিপাসু সেটা তাদের প্রশাসন, পরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি, তাদের জীবনাচরনের মধ্যেই প্রকটভাবে প্রকাশমান। তাই তাদের যারা অনুসারী, তাদের কাছ থেকে ভিন্ন কিছু আশা করাটা অসঙ্গত ও অযৌক্তিক। যারা জানেই না একটা দেশ বা একটা শহর পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকরভাবে, জনবান্ধব ও বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হয়, কিভাবে তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, তাদেও দ্বারা আর যাই হোক কোন শহরকে সুস্থ, সুন্দর ও বাসযোগ্য করে রাখার আশা মোরগের কাছে ডিম পাবার মতই একেবারে নিরর্থক।

Bangladesh & Development

বাংলাদেশ ও উন্নয়ন
বাংলাদেশ নাকি বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে আছে। কিন্তু উন্নয়ন আসলে কাকে বলে? চতুর্দিকে অরাজক পরিস্থিতি বহাল রেখে দেশ উন্নয়ন করছে বলে যারা বগল বাজাচ্ছেন তাদেরকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। কোন উন্নয়নকামী দেশে ঘরে ঘরে অলিতে গলিতে বিশ্ববিদ্যালয, এমনকি স্কুল কলেজ থাকে? অলিতে গলিতে খেয়ালখুশীমত দোকান-পশারী, গ্যারেজ-কারখানা থাকে? সম্পুর্ন অপরিকল্পিত বাড়ীঘর, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, কোন রকম পার্কিং প্লেস বিহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক, শপিংমল, কমিউনিটি সেন্টার  থাকে? শহরে ব্যস্ত রাস্তার পাশেই অবাধে হকার বা কাঁচামালের বা মাছ-মাংসের দোকান থাকে? 
সরকার প্রতি বছর নানা ভাবে নানা রঙের করারোপের মাধ্যমে সরকারী খাজাঞ্চখানা ভরছে। অথচ সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা এজেন্সীর নাকের নীচে পিওন-দারোয়ান-মিটার রীডার-ড্রাইভার রাজধানীসহ নানা শহরে গ্রামে কোটি টাকা ব্যয়ে প্রাসাদ বানাচ্ছে; কিন্তু তাদেরকে কেউ জিজ্ঞাসা করছে না ১০/১৫ হাজার টাকা বেতন পেয়েও এত টাকা তারা ব্যয় করে কিভাবে, এত টাকা পায় কিভাবে।  সরকার তার কর্মচারীদের বেতন বর্তমানে সাধারন মানুষের আয়-ইনকামের তুলনায় কয়েকগুন বেশী প্রদান করছে। এতে বাজারে দ্রব্যমুল্যের উর্দ্ধগতিতে সাধারন মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও সরকারের তাতে কিছু এসে যাচ্ছে না। বর্তমানে আয় বৈষম্য এতটাই বেড়েছে যে তাতে অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মানুষের মাথাপিছু আয় দেখানো হচ্ছে ১৬৭০ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় $=১,৩৭,০০০/= (এক লাখ সাঁয়ত্রিশ হাজার টাকা)। কিন্তু এই অংক যে বিরাট শুভঙ্করের ফাঁকি সেটা যে কোন সাধারন জ্ঞান সম্পন্ন মানুষও বোঝে। দেশের ৮৫% মানুষের এই মাথাপিছু আয়ের সাথে কোন সম্পর্ক আছে?
বর্তমান সময়ে উন্নয়নের যে মচ্ছব চলছে তাতে এই উন্নয়নের মুল্য যে কত বেশী সেটা বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া থেকেই প্রকট হয়ে ওঠে। যেখানে প্রকৃত ব্যয় হাজার টাকা সেখানে ব্যয় বরাদ্দ করা হয় দশ হাজার। তাও আবার নির্দিষ্ট সময়ে তা শেষ হয়না বলে তার বরাদ্দ ও মেয়াদ বারবারই বাড়ানো হয়। এ ব্যাপারে কারো কোন জবাবদিহিতা নেই।
দেশের যত্রতত্র ইচ্ছামত বাড়ীঘর বানানো, দোকান-পশারী বসানোর ওপরে কারো নিয়ন্ত্রন নেই। ব্যস্ত রাস্তার পাশে লাখো লাখো দোকানপাট বসছে। যেখানে সেখানে বাড়ীঘর নির্মান করা হচ্ছে। হাইওয়ের ওপর নানা রকম বাজার-হাট বসছে। দেশের এক হাজার মাইল রাস্তাকে নিরাপত্তাহীন করে তার  দুপাশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দোকানপাট বাড়ীঘর বানানো হচ্ছে। সর্বক্ষেত্রে ফ্রি-স্টাইল চলছে।
এসবই কি উন্নয়নের মহাসড়কে চলার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়? অথচ উপরোক্ত সব অনিয়ম ও অনাচারের গতি থামানো সম্ভব যদি সত্যিকার উন্নয়ন করার দৃঢ় সংকল্প সরকারের তাকে।  বর্তমানে দেশ ডিজিটাল হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই সুবিধাকে কাজে লাগানো হচ্ছে না। আবার সেই সুবিধাকে জায়গামত কাজে না লাগিয়ে অ-জায়গাতে লাগানো হচ্ছে। ডিজিটাল সুবিধা কি কেবল মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকীর্ন করার জন্য?  অথচ এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি দোকানপাট, গ্যারেজ-ওয়ার্কশপ, হাসপাতাল-ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টার, এমনকি গ্রাম্য হাটবাজার দোকানপাট ইত্যাদিকেও ডাটাবেজের আওতায় আনা যায়। দেশে চলমান প্রতিটি যানবাহন ডাটা বেজের আওতায় আনা যায়। এর মাধ্যমে দেশে গাড়ীচোরদের অপকর্মকেও ৯০% নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মকান্ড, আয়-ব্যয় মনিটর করা যায়। প্রতিটি টাকার গতিবিধি মনিটর করা যায়। বর্তমান অবস্থায় শতভাগ সম্ভব না হলেও ৮০% সম্ভব সেটা। উন্নত দেশগুলোতে এমনকি একটা মোবাইল স্টলও ডাটাবেজের আওতায় আছে যেটার সরকারের দৃষ্টি এড়ানো বা দেয় ট্যাক্স ফাঁকি দেবার কোন উপায় নেই। দেশকে প্রকৃত উন্নয়নশীল বা উন্নত করতে হলে ওইসব উদাহরনকে কাজে লাগিয়ে সবরকম প্রতিষ্ঠান, সে ছোট হোক আর বড় হোক, ডাটাবেজে এন্ট্রি ও রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বসানোর কোন রকম সুযোগ থাকা প্রকৃত উন্নয়নের পথে বিরাট বাধা বলে বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটা দেশের ইউনিয়নকে ও ওয়ার্ডকে সক্ষম করে তুললে এ কাজ কঠিন হবার কথা নয়। যে দুর্নীতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা, এই সব প্রক্রিয়াকে যথাযথভাবে কাজে লাগালে বহুলাংশে দুর্নীতি দুর করা সম্ভব।
তাই বলতে হয় উন্নয়ন উন্নয়ন করে ঢাকঢোল পেটালেই দেশ উন্নয়নশীল বা উন্নত করার কোন সুযোগ নেই। সেটা করার জন্য বুদ্ধি, মেধা, আন্তরিক প্রচেষ্টা, দৃঢ় সংকল্প ও সর্বোপরি নিখাদ দেশপ্রেম অত্যাবশ্যক। নইলে কিছুদিন মানুষকে চমক দেওয়া গেলেও আসলে কাজের কাজ কতটুকু হবে সেটা সাধারন জ্ঞান সম্পন্ন সবাই জানে।  ---- ৩০/৫/২০১৫ইং