’ছোট বালুকার কণা বিন্দু বিন্দু জল,
গড়ি তোলে মহাদেশ সাগর অতল।’
বক্ষ্যমান লেখিকা বলেছেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর নান রকম যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের কথা। পুরুষ মানুষ নারীকে ভোগ্যবস্তু বলেই মনে করে ইত্যাদি। কিন্তু কেন এই জঘন্য মানসিকতা তৈরী হয় সেটা তিনি কেন, কেউ-ই বলেন না। এ যেন গোড়া কেটে আগায় জল ঢালা। রোগের কারন না জেনে ওষুধ দেবার ব্যবস্থা। বস্তুতঃ ধর্মীয় মুল্যবোধই যাবতীয় মানবিক মুল্যবোধের উৎস। ভিনদেশীয় সমাজে, ভিন্ন ধর্মে নারীদের যে মর্যাদা সেটা প্রায় শিক্ষিত সকলেই জানেন। ইউরোপীয় কোন কোন দেশে বিবাহ নামের বিষয়টি একটি ’অপশনাল’ বিষয়। উত্তর ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে অবৈধ বা খারাপ, কোনভাবেই দেখা হয় না। বয়ফ্রেন্ড ও বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাবা-মায়ের সাথে এক টেবিলে খেতেও সেখানে কোন বাধা নেই। নারীদের স্বাধীনতা সেখানে এমনই যে বিয়ে-শাদী বা পরিবার বলে কোন বিষয় মোটেই গুরুত্বপুর্ন নয়। ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধা, আরাম-আয়েসই বড় কথা। সেখানে যেহেতু ফ্রি-মিক্সিং স্বাভাবিক বিষয়, নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক যেহেতু একেবারেই স্বাভাবিক বিষয় তাই সেখানে নারী নির্যাতন বলে কোন কিছুই নেই। কিন্তু যেখানে পারিবারিক বন্ধনের ব্যাপারে বিবাহের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ন, সেই প্রাচ্যদেশীয় আবহে নারী নির্যাতন কথাটা খুবই প্রাসঙ্গিক। তো আমাদের সমাজে যখন সেই পাশ্চাত্যধারা অনুকরনকেই প্রগতিশীলতার নিয়ামক বলে মানা হচ্ছে, তখন তাদেও মত ফ্রি-মিক্সিং বা বিবাহ-বহির্ভুত যৌন সম্পর্ককে মেনে নিতে বাধা থাকবে কেন? নাচতেই যদি নামতে হয় তবে আর ঘোমটা দেওয়া কেন?
কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটাকে আরেকটি দৃষ্টিকোন থেকে যদি দেখা যায় তবে একথা বলতেই হয় যে আমাদের কালচারে যেটা গুরুত্বপুর্ন, সেটা হচ্ছে ধর্ম। এই দেশের ৮৫% মানুষ মুসলমান । তারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী, সে নামে হলেও ।আর ইসলামে নারীকে যে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে তা আর কোন ধর্মে দেওয়া হয়নি। এটা যারা অন্য ধর্মের অআকখ জানেন তাদেরও জানা আছে। সে বিষয়ে ভুরি ভুরি উদাহরন দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের সমাজে ইসলাম আজকে কোন গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করে কি? দুই যুগ আগেও যেভাবে পরিবারে আমাদের ধর্মের গুরুত্ব ছিল, আজ সেটা আর আছে কি? আগে ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা প্রায় ৯০% পরিবারে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পরিবার থেকেই শিশুরা ইসলাম ধর্মের প্রাথমিক পাঠ পেতে পারত। সব পরিবারে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কুরআন পড়তে না পারলেও ধর্মের সাধারনভাবে পালনীয় বিধিবিধানগুলো প্রায় সবাই জানত। কিন্তু আজকের অবস্থা কি? হ্যাঁ, অনেকেই বলবেন প্রাইমারী ও সেকেন্ডারী লেভেলে ধর্মীয় শিক্ষা তো আছে। কিন্তু পাশ করার জন্য শিক্ষা আর কার্যকরী শিক্ষার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক সেটা তো অস্বীকার করার যো নেই। তাছাড়া ক্লাশে ধর্মীয় যে তালিম শিক্ষার্থী পেল, সেটা পরিবারে গৃহ পরিবেশে যদি না থাকে তবে তো ক্লাশের সে তালিম তাকে দারুনভাবে বিভ্রান্ত করবে। আর তার ফল যে উল্টো ফলতে বাধ্য সেটাও নিশ্চিত। তাই ধর্মীয় মুল্যবোধকে যদি যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া হয় তবে ধর্ম যে মানবিক মুল্যবোধ, পারষ্পরিক শ্রদ্ভাবোধ যথা বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি ভালবাসা ইত্যাদি শেখায় সেগুলো শেখার সুযোগ কোথায়?
আজকে কিশোর-তরুনদেরকেও দেখা যাচ্ছে ইভটিজিং, যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষনের মত গ ুরুতর অপরাধে লিপ্ত হতে। কিভাবে এটা সম্ভব, যদি সে পরিবারে সঠিকভাবে ধর্মীয় মুল্যবোধের শিক্ষা পেয়ে থাকে? পরিবার তো তাকে শেখাবে কার সাথে কি আচরন করতে হয়। যে শিশু মা-কে সম্মান করতে, মর্যাদা দিতে শিখলনা সে নারী হিসেবে আর কাকে সম্মান করবে? যে বোনকে সুস্থভাবে ভালবাসতে শিখলনা সে অন্য মেয়েকে কিভাবে সুস্থভাবে ভালবাসবে? তার মধ্যে সুস্থ চিন্তা আসবেই বা কেমন করে?
আসলে কেবল নারীদের প্রতি লোভাতুর দৃষ্টিই নয়, যে কোন কিছুর প্রতি অশোভন বা অবৈধ লোভ না করাাটা পরিবারের ভেতর থেকেই শিখতে হয়। এটা শিশুকে তার মা-বাবাই দিয়ে থাকেন। কিন্তু আজকের অবস্থা কি? আজকে দরিদ্র পরিবারে নয়, বরং ধনী ও স্বচ্ছ্বল পরিবারের সন্তানরাই অকল্পনীয় অপকর্মের সাথে জড়িত হয়ে পড়ছে। এর কারন হচ্ছে সহায়-সম্পদের সাথে সাথে ধর্মীয় মুল্যবোধ ’ফেড আউট’ হয়ে যাওয়া। যে সন্তান শিখেছে যে ’মায়ের পায়ের তলায় সন্তানের বেহেশত’, যে সন্তান শিখেছে যে ’ব্যাভিচার কবীরা গুনাহের কাজ’, যে সন্তান শিখেছে ’কবীরা গুনাহ আল্লাহ সহজে মাফ করবেন না’, যে সন্তান শিখেছে যে ’প্রকৃত মোমিন (মুসলমান) তারাই যাদের মুখ ও হাত থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ’, তারা কোনো খারাপ কাজ করতে দশবার ভাবে। যে শিশু পরিবারে শেখে আল্লাহ সুন্দর; আর তিনি সুন্দরকে ভালবাসেন, সে শিশু সুšদরকে ভালবাসবে। সুন্দরকে দলা-মোচড়া বা বিকৃত করতে সে কখনোই আগ্রহী হতে পারে না। যে শিশু শিখেছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ, সে কখনো এখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নোংরা করবে না। তবে হ্যাঁ, এ ছাড়াও আমাদের শৈশবে নৈতিক শিক্ষামুলক নানা কবিতা, গল্প ইত্যাদি যেসব পাঠ্য ছিল সেগুলোর কোন কিছু বর্তমানে আর চোখে পড়ে না।
প্রকৃতপক্ষে আজ সমাজে কেবল নারীর প্রতি সহিংসতা নয়, সকল বিষয়ই সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। সব কিছুকে লোভাতুর দৃষ্টি দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত চোখ কেবল নারীকেই না, সব কিছুকেই বৈধ অবৈধ যে কোন ভাবে পাবার জন্য লালায়িত হবে এটাই সত্য। এই অপকর্মে ধর্ম সবচেয়ে দৃঢ় ও কার্যকর প্রতিবন্ধক। সেই ধর্মীয় শিক্ষা সে যদি না পায়, সে যদি পরিবার থেকে একজন ভাল মানুষ হবার শিক্ষা না পায়, তবে তার কাছ থেকে ভাল কছিু পাবার আশা করা একান্তই নিরর্থক। আমাদের দৃষ্টি যে কেবল নারী নির্যাতনের উপর নিবদ্ধ সেটা এক রকমের ভ্রান্তি। যে সুন্দরকে দলিত-মথিত করতে, রাস্তার পাশে প্রকাশ্যে প্রাকৃতিক কর্ম সারতে, মানুষের প্রতি খারাপ আচরন করতে, দুর্নীতি করতে লজ্জা পায় না, সে কেবল নারীর প্রতি সু-আচরন করবে, তাকে সম্মান করবে এটা ভাবাই এক ধরনের মূঢ়তা ছাড়া আর কিছু নয়। যতক্ষন আমাদের সমাজের দায়িত্বশীল মানুষদের এই দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন না হবে ততক্ষন কেবল নারী নিপীড়নের বিষয়ে হা-হুতাশ করাই সার হবে। কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না।
No comments:
Post a Comment