শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে এদেশে শোরগোল হৈ চৈ চলছেই। তবে এই হৈ চৈ শোরগোল যে সবটাই কেজো তা বোধ হয় বলা যাবে না। যেমন অভিভাবকদের উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের ওপর অনাবশ্যক পাঠ্য-পুস্তকের বোঝা কমানোর জন্য কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা। কিন্তু অভিভাবকরা সে দিকে যান নি, যাচ্ছেনও না। তারা প্রাইভেট টিউশনির সিস্টেম বন্ধ করে স্কুলে যাতে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়া হয়, তার জন্য আন্দোলন করতে পারতেন। কিন্তু সেটা তারা করছেন না। মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক দরকার। সেই শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না; হচ্ছে টাকা-পয়সার বিনিময়ে বা দলবাজির গুনে গুনান্বিত শিক্ষক নিয়োগ। সেটা বšধ করার জন্য যে আন্দোলন দরকার ছিল সেটা তারা করছেন না। কথায় বলে পাহাড় থেকে নেমে আসা ¯্রাোতস্বিনীকে মাঝপথে আটকানো অসম্ভব। উপরোক্ত সব কিছুকে মেষসুলভ নমনীয়তায় মেনে নেবার পর অভিভাবকদের এই শোরগোল কেবল পানি ঘোলা করতে পারে; কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না।
শিক্ষকদের কোচিং বানিজ্য, বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ফিস আদায়ের কথায় আসা যাক। শিক্ষকরা তো তবু গতর খাটিয়ে পড়িয়ে কিছু টাকা-পয়সা আয়-রোজগার করেন। কিন্তু হঠাত করে সরকারের অসীম বদান্যতায় ডাবল বেতন পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যে ফাইল আটকিয়ে জনগনের ট্যাঁক খসাচ্ছেন সেটা সম্মানিত অভিভাবকদের চোখে পড়ে না কেন? নাকি শিক্ষকগন ’নরম জায়গা’ বলে? জনগনের ০.০১% সরকারী কর্মচারীদের বেতন ডাবল হলেও আম জনগনের তো আর সেই হারে আয় বাড়েনি। কিন্তু তাদের জন্য তো কোন আলাদা হাট-বাজার নেই। তাই শিক্ষকগন, যারা সেই আম জনতারই অংশ, তারা প্রাইভেট পড়িয়ে যদি দু’পয়সা আয় করেনই তবে অভিভাবকদের তাতে গা জ্বালা করে কেন? তারা কি এ সমাজের বাইরে থেকে আসা ভিনগ্রহের মানুষ? শিক্ষামন্ত্রনালয় তো এর আগে দুর্নীতিতে প্রায় পয়লা নম্বরে স্থান করে নিয়েছিল। সেটা তো আর এমনিতে না। সরকারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত 'nurse the baby, protect the child, free the adult.’ কিন্তু সরকারের কাজই হচ্ছে তেলা মাথায় তেল ঢালা। এই শহরে যে সব স্কুল নিজে স্বয়ং সম্পুর্ন তাদের জন্য এমপিও কেন? তারা তো তাদের শিক্ষকদের মুল বেতনের ৩/৪ গুন পর্যন্ত বেশী বেতন দিচ্ছে। অথচ এই শহরে এমন স্কুলের সংখ্যাই প্রায় ৮০% - ৮৫% যারা স্কুল থেকে মুল বেতনের অর্ধেকই দিতে পারে না। সরকারের কি এসব দিকে খেয়াল দেওয়া উচিত ছিল না? তাছাড়া যে বেতন কাঠামো নির্ধারন করা হয়েছে, সেই একই কাঠামোতে মফস্বলে ও রাজধানী শহরে একই হারে বেতন দেওয়া হচ্ছে। অথচ মফস্বলে যেখানে একটা তিন কামরার সুন্দর মানসম্পন্ন বাড়ীর ভাড়া তিন থেকে চার হাজার টাকা, সেখানে এই শহরে ঐ একই বাড়ীর ভাড়া অন্ততঃপক্ষে বিশ থেকে পঁচিশ হাজার টাকা। সরকারের কি এদিকটাও দেখা উচিত নয়? কিন্তু না; এসব কিছুই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সাহেব বা অর্থমন্ত্রী সাহেবদের মাথায় ঢোকেই না।
এসবই এ দেশের সরকার ও প্রশাসনের অবিচনা ও অবিচারের নীতি। শিক্ষামন্ত্রনালয় নি¤œপর্যায়ে অনাবশ্যক বিষয় চাপিয়ে সেগুলোর জন্য যেসব শিক্ষক নির্দেশিকা ইত্যাদি চালু করছে, সেসব বি,এড, বা এম, এড পর্যায়েই শিক্ষদের শেখানো হয়ে তাকে। যেটা দরকার সেটা রিফ্রেসারস ট্রেনিং কোর্স হিসেবে করানো যেতে পারে। আর সেটাই বেশী দরকার। কিন্তু এই সব নির্দেশিকা টির্দেশিকা করতে যে অনাবশ্যক বিপুল অংকের অর্থব্যয় হচ্ছে সেটা তো জনগনের পকেট থেকেই আসছে। অথচ এর উপযোগীতা কতটুকু? প্রকৃতপক্ষে থিওরী আর প্র্যাকিটসের মধ্যে যে বহুত পার্থক্য সেটা এই মহামহিমগন কতটুকু বোঝেন তা বোঝা বেশ কঠিনই বটে। এ বিষয়ে বেশী বলা অনাবশ্যক; কারন দেশের জনগনের অর্থনৈতিক অবস্থার সার্বিক মান এবং শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের কতরকমের ক্যাটাগরী সেটা বিবেচনায় নিলে শ্রেণীতে একজন শিক্ষক কতটুকু কি করতে পারেন সেটা যারা ফিল্ডে কাজ করেন তারাই অনেক বেশী বোঝেন। গাছের মগডালে বসে বার্ডস্ আই ভিউ নিয়ে তা বোঝা অনেকটাই কঠিন। কিন্তু সে কথা কে কাকে বোঝাবে?
যাহোক, শিক্ষা নিয়ে, শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ম্যা-লা কথা হয় ও হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কতটুকু হচ্ছে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অবস্থা দেখে অনেকটাই ধারনা করা যায়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সাহেব এ-প্লাস পাওয়া নিয়ে যে লড়াই-কসরত করছেন, বাস্তবতার ভিত্তিতে শিক্ষার প্রকৃত মান উন্নয়ন সম্পর্কে তার অর্ধেক চিন্তাও যদি তাঁর থাকত তবে হয়ত পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতে পারত না। কিন্তু কি আর বলা।
৯
এদেশে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এত রকমের এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে যে এদেশটা এক্ষেত্রে সম্ভবতঃ একটা বিশ্ব রেকর্ড গড়তে পেরেছে। সেই পাকিস্তান আমল থেকে এদেশে প্রতিবারই এক একটা শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে আর তার বিরুদ্ধে একশ্রেনীর আঁতেল আদাজল খেয়ে লেগে সেটাকে বস্তাবন্দী করতে বাধ্য করেছে। অনেক কসরত করে শেষাবধি এই হালে ২০১০ সালে একাট শিক্ষানীতি হয়েছে তবে সেটাও সমালোচনার উর্দ্ধে উঠতে পারেনি। বস্তুতঃ শিক্ষানীতিতে যত বেশী কথা বলা হয়েছে কাজ ততটাই কম হয়েছে ও হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ’বুশ আমেরিকা ২০০০ এডুকেশন প্ল্যান’-এর কথাটা এখানে উল্লেখ করা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এই প্ল্যানে বলা হয়েছে ---
Bush
‘America 2000 Plan’ for Education:-
1. That
all children must be physically and mentally ready to learn.
2. That
the graduation rate must rise to 90%, the international standard.
3. The
American students will leave grades 4th, 8th and 12th
having demonstrated the highest competency in challenging subjects including
English, mathematics, science, history and geography and have a meaningful set
of examinations to measure whether they know what they are supposed to know at
those levels.
4. That
the American students will be the first in the world in science and mathematics
achievements.
5. That
every adult American will be literate and will possess the knowledge and skills
necessary to compete in the global economy and exercise the rights and
responsibilities of citizenship; and
6. That
every school in America will be free of drugs and violence and offer a
disciplined environment conducive to learning.
এখানে ৩ ও ৬-নং উদ্দেশ্যটি কি আমাদের শিক্ষানীতিতে কোন গুরুত্ব পেয়েছে? আজকে শিক্ষার মান নিয়ে যে হাহুতাশ চলছে সেটার পেছনে কারন কি? মোটা দাগে একাধিক কারনের মধ্যে বিশেষ তিনটি কারনই প্রধান। এক, রাজনৈতিক বিবেচনা তথা দলবাজি ও টাকা-পয়সার বিনিময়ে অযোগ্য, অদক্ষ ও আদর্শহীন শিক্ষক নিয়োগ; দুই, শিক্ষাক্ষেত্রে সফ্ট্ওয়্যার (ট্রেনিং, পদোন্নতির জন্য ট্র্যাক রেকর্ড ও পিরিওডিক স্কিল টেস্ট, মোটিভেশন ইত্যাদি)-এর পেছনে ব্যয় না বাড়িয়ে হার্ডওয়্যার (বিল্ডিং ইত্যাদি জাতীয় অবকাঠামো)-এর পেছনে সিংহভাগ ব্যয় এবং সরকারী সিদ্ধান্তের লিকুইডিটি। আমাদের সামগ্রিক শিক্ষার ’goal-ই বা কি? উচ্চ-ডিগ্রীধারী বেকার সংখ্যা বাড়ানো, না কি প্রকৃত কর্মদক্ষ জনসম্পদ বাড়ানো? যদি দ্বিতীয়টিই goal বা উদ্দেশ্য হয় তবে দেশে এত এত বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা কি? দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়িয়ে উচ্চ ডিগ্রীধারীর সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে কোন জাতীয় দুরদর্শিতা বা দেশপ্রেম (?!) কাজ করছে? বিগত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে যে মাননীয় শিক্ষমন্ত্রী শিক্ষার মান বাড়ানোর বদলে পাশের হার বাড়ানোর এক মহাপরিকল্পনা নিয়েছেন। বিভিন্ন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সাহেবগন নাকি পরীক্ষকদের নির্দেশ দিচ্ছেন কাউকে ফেল করানো যাবে না।এই রকম তোগলোকি ব্যবস্থা বহাল রেখে দেশে শিক্ষার মান উন্নত করার যে হাস্যকর ব্যর্থ চেষ্টা সেটা বুঝমান মানুষকে কেবল হাসানো ছাড়া আর কি-ই বা করতে পারে? দেশের শিক্ষার মান এমনই উন্নত হয়েছে যে দেশের লক্ষ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত (??) তরুন-তরুনী থাকা সত্বেও দেশের কর্পোরেট বিজনেসগুলোকে নাকি বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করে আনতে হচ্ছে। এবং সেই পথ দিয়ে দেশ থেকে বছরে নাকি ৩৪/৩৫ হাজার কোটি টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। কি তামশা! এই যদি অবস্থা হয় তাহলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি ধরনের ’মাল’ উৎপাদন করছে? এই প্রশ্নেরও সম্ভবতঃ জবাব দেবার কেউ নেই।
No comments:
Post a Comment