Friday, June 29, 2018

বৈষম্য দূরের আশা জোগাচ্ছে না বাজেট

বৈষম্য দূরের আশা জোগাচ্ছে না বাজেট ---জনাব তুহিন ওয়াদুদের এই লেখাটির প্রেক্ষিতে বলতেই হয় এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে যদি সত্যিকারের কোন আদর্শ থাকত তবে এ অবস্থা হবার কোনই কারন ছিলনা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা দৃষ্টে আজ একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে এদেশের স্বাধীনতার পেছনে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্পৃহা কতটা ছিল সেটা নিশ্চিত বলা না গেলেও অবাঙালীদের সম্পদ লুটপাট এবং এদেশের কিছু সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদীদেরকে তাদের স্থলাভিসিক্ত করা যে উদ্দেশ্য ছিল সেটা অস্বীকার করার বোধহয় আজ উপায় নেই। নইলে যে আদমজী জুটমিল নিয়ে বাঙালীদের এত গর্ব, এত ক্ষোভ যে এই সোনার ডিম পাড়া রাজহংসটির সব ডিম পাকিস্তানীরা নিয়ে যাচ্ছে আর তা দিয়ে তাদের রাস্তাঘাট সোনা দিয়ে বাঁধাচ্ছে, সেই আদমজী জুট মিল এই বাঙালী পুঙ্গবদের হাতেই তেরশ' কোটি টাকা দেনা মাথায় নিয়ে ডুবে যেত না। স্বাধীনতার পরপরই যে অবাঙালীদের সহায়-সম্পত্তি ব্যপক লুটপাট হয়ে গেল, কোন রকমের সু-আদর্শের অনুপস্থিতিই যে তার জন্য দায়ী ছিল সেটা আজ অকাট্য বাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের মধ্যে কোটিতে হয়ত একজনও নেই যিনি সত্যি কথাটা বলবেন। এই যে উত্তরাঞ্চলের দারিদ্রের বর্তমান অবস্থা সেটা দুর করার জন্য কোন সরকারই কি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে? আজও যে নিচ্ছে না সেটা তো জনাব তুহিনের লেখায়ই ফুটে উঠেছে। কিন্তু কেন এই অবস্থা, যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধেই এদেশের মানুষ প্রানপণ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল?
স্বাধীনতার পেছনে সঠিক আদর্শের যে ঘাটতি ছিল সেটার ফলশ্রুতিতে আজ এদেশ দুর্নীতির পঙ্কে প্রায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে দেশের তরুন সমাজ আজ ধুঁকছে। সর্বত্র ন্যায়, সত্য ও সাম্যতার প্রকট অভাব। অথচ ঐসমস্ত অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতেই তো মুক্তিযুদ্ধ, নয় কি? আদর্শের উপস্থিতিতে দেশকে মানুষ কি দিতে পারে সেটা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখেছি। তিনি বলেছেন যে সদ্য পাওয়া পাকিস্তানে অফিস নেই, চেয়ার নেই, টেবিল নেই তবু মানুষ তাঁবুতে সামান্য একটা দুটো ভাঙ্গা টেবিল নিয়ে অফিসের কাজ করেছেন। স্টেশনে টিকিট না পেয়ে ট্রেনে চড়ে মানুষ টিটি-কে টিকেটের টাকা দিয়েছে। দুর্নীতি যেন ভোজবাজির মত উধাও হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দেখা গেল যে হরিল্লুটের মচ্ছব। কিছুদিন আগে সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহেবের লেখায় দেখেছি যে লোক কম ভাড়ায় থাকার জন্য গোপীবাগের ঘুপচি ঘরে থাকতো, বাজারের থলে হাতে বাসের হ্যান্ডেলে ঝুলে যাতায়াত করত, স্বাধীনতার পরে তিনি দেখেছেন সেই লোক মীরপুর কি মোহাম্মদপুরে বাড়ীর মালিক হয়ে তাঁর সাথে বেশ গর্ব করে বলেছে যে তিনি এখন বাড়ীর মালিক। এর পরে বঙ্গবন্ধুর আমলে যাদেরকে তিনি বিশ্বাস করে জাতীয়করনকৃত মিল-কারখানার প্রশাসক হিসেবে বসিয়েছিলেন, তারা সেই সব মিল-কারখানার যন্ত্রপাতি পর্যন্ত বিক্রী করে দিয়ে নিজেদের পকেট ভর্তি করেছে। অতি দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে তাঁকে বলতে হয়েছিল 'লোকে পায় সেনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। ' এসবই ছিল আদর্শহীনতার বিষময় ফল। এসব অবস্থার কি আজো কোন পরিবর্তন হয়েছে? হ্যাঁ, অনেকেই বলবেন যে দেশ তো 'এগিয়ে চলেছে।' সত্যিই, দেশে পদ্মা সেতু হচ্ছে, বড় বড় ফ্লাইওভার হয়েছে ও হচ্ছে, ডিপ-সী পোর্ট হচ্ছে। তবে যদি গত ১০/১২ বছরের তথ্যগুলো দেখা যায় তবে দেখতে হয় ৫০/৬০ হাজার কোটি টাকার শোয়ার বাজার লুট, ব্যাংকের খাণখেলাপীর অংক লাখো কোটি টাকার উপরে উঠেছে; কয়েকটি ব্যাংক ঘোরতর লুটপাটের কারনে লালবাতি জালিয়েছে আর সরকার সেগুলোকে কোরামিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। এমনকি রাস্ট্রীয় ব্যাংকের কোষাগার থেকেও অনায়াসে আটশ' কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেল কিন্তু তার উদ্ধারের আর কোন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলো না। আবার তার তদন্ত রিপোর্টটিও আলোর মুখ দেখতে পেল না। এরপর দেখা যাচ্ছে হাজার টাকার প্রজেক্ট দশ হাজার টাকা খেয়ে ফেলছে এক বছরের জায়গায় ৪/৫ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে বাড়িয়ে। দেশে প্রায় পঁয়ষট্টি লাখ বেকার যার মধ্যে বিশ লাখ শিক্ষিত বেকার। ঐ লুটপাট হওয়া অর্থ দিয়ে আরো ৪/৫ টা পদ্মা সেতু বানানো যেত। নতুন নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করে লাখো বেকারের বেকারত্ব ঘোঁচানো যেত। এসবই কি আদর্শহীনতার বিষময় ফল নয়? যে বৈষম্য এই ছোট্ট দেশটিতে ক্রমবর্ধমান, সে বৈষম্যও প্রকৃত কোন আদর্শের অভাবেই ঘটছে। তাই মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সাহস নেই যে তিনি কোটারী স্বার্থের বাইরে গিয়ে প্রকৃত জনবান্ধব কোন বাজেট দেবেন। এত এত লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা লুট হয়ে গেছে, লাখো কোটি টাকা খান-খেলাপী হয়ে পড়েছে, কিন্তু অর্থমন্ত্রী তাদের নাম পর্যন্ত সংসদে উচ্চারন করার ক্ষমতা রাখেন না। স্বাধীনতার পর বাইশ পরিবার বেড়ে বাইশ হাজার পরিবার হয়েছে। বিদেশে সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া ইত্যাদি হয়েছে। আগে মানুষ রাজনীতি করত মানুষের কল্যানের লক্ষ্যে। তাঁরা ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানোর ব্রত নিয়েই রাজনীতি করতেন। আর আজ? আজ নাকি সংসদে ৭৫% - ৮০% ব্যবসায়ী, যারা কয়েক কোটি টাকা খরচ করে নমিনেশন কেনেন আর ইলেকশন (?) করেন। তারপর সেই বিনিয়োগের দশগুন উসুল করেন সংসদ বা মন্ত্রী হয়ে। কিন্তু স্বাধীন দেশে বঞ্চিত, শোষিত মানুষের কি লাভ হয়েছে?

No comments:

Post a Comment