Wednesday, February 28, 2018

গনতন্ত্র এবং বাংলাদেশ


স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে বাংলাদেশের গনতন্ত্রের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে হতাশ না হয়ে পারা যায় না। মুখে আমরা গনতন্ত্র গনতন্ত্র বলে যতই চেঁচামেচি করি না কেন, গনতন্ত্রের সত্যকার চেহারা আমাদের মনে হয় অজানাই থেকে গেছে। এর কারন খুজতে গেলে দেখা যাবে যে আমাদের গনতন্ত্র কেবল পাচ বছর পর একদিন ভোট দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অত:পর এই পাচ বছরের মধ্যে ভোটারদেরকে আর কেউ পাত্তা দেবার কথা ভাবত্ওে চায় না; তাদের সুখ-দু:খের কথা, সুবিধা-অসুবিধার কথা ভাবা দুরে থাক। কিন্তু এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কি নেই? নিশ্চয়ই আছে। তবে তার জন্য কতিপয় ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে সংযুক্ত করা অতি আবশ্যক ছিল। আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। তব্ওু দু:খের সাথে বলতে হয় তাড়াহুড়ো করে সংবিধান রচনা করার কৃতিত্ব লাভের আকাংখায় সেই অতি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলির দিকে যথাযথ মনোযোগ দ্ওেয়া হয়নি। আমাদের সংবিধান পর্যালোচনা করলে যে বিষয়টি লক্ষ্যনীয় সেটি হলো গনতন্ত্রের ছদ্মাবরনে একধরনের স্বৈরতন্ত্র কায়েম করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা রাখা। সন্দেহ জাগে হয়ত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি অতিআনুগত্যের মনোভাবই এই মারাত্মক ত্রটির কারন ছিল। আজ অবধি সংবিধান যেভাবেই সংশোধন করা হয়ে থাকুক না কেন - প্রেসিডেন্ট পদ্ধতিরই হোক আর পার্লামেন্টারী পদ্ধতিরই হোক - সরকারপ্রধানই সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক । তার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করার কোন মসৃন পথ রাখা হয়নি। মহামান্য প্রেসিডেন্ট সাংবিধানিক প্রধান। কিন্তু সাবেক বিচারপতি জনাব শাহাবুিদ্দন সাহেবের ভাষায় মিলাদ পড়া আর ’উদ্বোধন’ ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা তাকে দ্ওেয়া হয়নি। সংবিধানের এই মারাত্মক ত্রুটির জন্যই এদেশে গনতন্ত্র জনগনের কল্যানে কার্যকর কোন ভ’মিকা পালন করতে সম্পূর্ন ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েকশ’ বছর্ওে এই গনতন্ত্র জনগনকে যে কিছু দিতে পারবেনা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই সংবিধানে নি¤েœাক্ত বিষয়গুলি সংযুক্ত করা অত্যাবশ্যক; অবশ্য আদৌ যদি আমরা গনতন্ত্রকে কার্যকর অবস্থায় দেখতে চাই। বিষয়গুলি নি¤œরূপ:
১. ব্যক্তিভিত্তিক নির্বাচন নয় বরং দলভিত্তিক নির্বাচন হবে। দলীয় মেনিফেস্টো রেড্ওি এবং টিভিতে প্রয়োজনে এক মাস ধরে প্রচারিত হবে। যে কোন রকম আঞ্চলিক ্ও ব্যক্তিগতভাবে প্রচার-প্রচারনা নিষিদ্ধ করতে হবে।
২. সাধারন নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পার্লামেন্টে বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্য নির্ধারিত হবে। কোন দল প্রদত্ত মোট ভোটের অন্যুন ৩% ভাগ পেতে ব্যর্থ হলে সেই দল বিলুপ্ত বলে ঘোষিত হবে।
৩. নির্বাচনের দুই বছর পর বিশ্বাসযোগ্য জনমত যাচাইএর মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধির জনপ্রিয়তার পরিমাপের ব্যবস্থা রাখা। এই জনমত কমপক্ষে ৫০% এর কম হলে ঐ প্রতিনিধিকে রি-কল করার ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং সেই শুন্য পদে গ্রহনযোগ্য নতুন ব্যক্তিকে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। সেটা স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য বা গোপন ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত নেত্ওা হতে পারে।
৪. প্রেসিডেন্ট ও/বা স্পীকার নির্বাচিত হবার পর তাকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে ই¯তফা দ্ওেয়া বাধ্যতামুলক করা এবং পরবর্তীতে তাকে ভোটপ্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবার বিধান রাখতে হবে।
৫. এক ব্যক্তি একই সাথে দলীয় প্রধান, সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। অর্থাৎ একই ব্যক্তি একাধিক পদে থাকতে পারবেন না।
৬. প্রেসিডেন্ট সংখ্যাগুরু দলের মনোনীত হল্ওে বিরোধী দলের অন্তত: ২/৫ অংশ সদস্যের সমর্থন লাভ আবশ্যিক করতে হবে।
৭. ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা আমাদের দেশের মত উন্নয়নশীল দেশে অতীব প্রয়োজন এবং এ বিষয়টি বিভিন্নভাবে প্রমানিত হয়েছে বিধায় প্রেসিডেন্টকে যে কোন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিল ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
৮. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হল্ওে আইনের দৃষ্টিতে কাউকেই কোন রকম প্রিভিলেজ না দ্ওেয়ার বিধান রাখতে হবে। সকল প্রকার ট্যাক্সের টাকা জনগনের টাকা; তাই ’ট্যাক্স-ফি’্র প্রথা স¤পূর্ণ বাতিল করতে হবে।
৯. সংবিধানের বিধি অনুযায়ী ’আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমান অধিকার’কে কেবল কাগজে না রেখে বাস্তবে সুনিশ্চিত করতে হবে।
১০. বিচার, শিক্ষা, এক্সিকিউটিভ বিভাগ এবং আইন-শৃংখলা বাহিনী দলীয়করনকে শা¯িতযোগ্য অপরাধ হিসেবে  গন্য করার আইন পাশ করতে হবে।
১১. সরকারী চাকুরীবিধির মাথায় পা দিয়ে রাজনৈতিক দলের লেজুড় হবার সুযোগ কঠোরভাবে
নিষিদ্ধ করতে হবে। এহেন কর্মকান্ডের জন্য সংক্ষিপ্ত তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি(দের)কে কোন রকম সুযোগ-সুবিধা ব্যতিরেকে বরখাস্ত করার বিধান করতে হবে।
১২. পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সকল সাংবিধানিক পদে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিল্ওে জাতীয় সংসদে শুনানীর মাধ্যমে তাকে স্থায়ী করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
উপরোক্ত ব্যবস্থাগুলি এদেশে বর্তমানে প্রচলিত গনতন্ত্রের খোলসে ছদ্ম স্বৈরতন্ত্রকে বিদুরিত করার জন্যই অপরিহার্য্য বিধায় অবিলম্বে জনসচেতনতা ্ও জনমত তৈরী করার লক্ষ্যে সকল ধরনের মিডিয়াকর্মীসহ সকল স্তরের জনগনকে এগিয়ে আসতে হবে। আরো একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। দেশে ’সমাজতš’¿ বলতে কিছু নেই, এটা পরিষ্কার। তাই মুক্তবাজার অর্থনীতি বহাল রেখে সংবিধানে সমাজতন্ত্র চার মুলনীতির একটি হিসেবে রাখা যে চরম স্ববিরোধী তা সুস্পষ্ট। এতদসত্ব্ওে ’সমাজতন্ত্র’ ’সমাজতন্ত্র’ বলে চেঁচামেচি করাটা জাতির সাথে প্রতারনা করা কি না সেটা ভেবে দেখা দরকার। আর একটি বিষয়। ইসলামকে রাস্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে রাখার ব্যপারে যারা যুদ্ধংদেহী তাদেরকে পন্ডিত নেহরুর সার্বজনীন ভোটাধিকারের গনতন্ত্র স¤মন্ধে আসক্তির বিষয়টি মনে রাখতে অনুরোধ করি। ’এক ব্যক্তি এক ভোট’ - এই নীতির ভিত্তিতে ভারত যদি ঐক্যবদ্ধ থাকত তবে আজ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার যা করছে তাই কি হতো না? এবং সে ক্ষেত্রে মুসলমানদের কোন বক্তব্য বা মতামত পাত্তা পেত কি? তাছাড়া মহাত্মা গান্ধীকে সত্যিই ’মহাত্মা’ বলে মানেন  এমন ’বিদগ্ধ’ ব্যক্তির অভাব এদেশে নেই। ধর্মের সাথে রাজনীতির সম্পর্কের বিষয়ে মহাত্মা বলেছেন, ’যারা বলেন রাজনীতির সংগে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই তারা জানেনই না ধর্ম জিনিসটা আসলে কি।’ আশা করি এ বিষয়েও দেশের বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গ কিছু আলোকপাত করবেন। তাছাড়া মহান আল্লাহ-র ওপর আস্থা ও বিশ্বাস যারা রাখতে নারাজ, তারা আসলেই কোন ধর্ম অনুসরন করেন বা আদৌ করেন কি না তাও দেশের আম জনগন জানতে পারলে কৃতার্থ হতো।  যারা দেশের প্রথম সংবিধান রচনার কৃতিতের অধিকারী, তাদের কাছ্ওে সনির্বন্ধ অনুরোধ, আপনার্ওা উপরে বর্ণিত যুক্তিগুলির গ্রহনযোগ্যতা বিচার করবেন এবং এগুলি আমাদের সংবিধানে সন্নিবেশিত করার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করবেন। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনাদের কাছে জাতির ভবিষ্যত মঙ্গলের জন্য এই আহ্বান জানাচ্ছি।
১৫.০৩.২০১২        এম, শ্ওকত আলী (X-Headmaster); উত্তরা; ঢাকা - ১২৩০। 
পুুনশ্চ: লেখাটি অনেক আগেকার হলেও এর প্রাসঙ্গিকতা আরো বেড়েছে বলেই আমার ধারনা। তাই এটা ছাপলে বাধিত হবো। 

No comments:

Post a Comment