একটি দেশকে প্রকৃত উন্নতির দিকে টেনে নিতে সেই দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে অবশ্যই একাধিক গুনের অধিকারী হতে হয়। সে সব গুনের মধ্যে সর্বপ্রথম দেশপ্রেম, তারপর সততা, দুরদৃষ্টি এবং কঠোর সংকল্প গ্রহন ও তা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। এ ছাড়াও দরকার জ্ঞান ও দক্ষতা এবং ঠিক ব্যক্তিকে ঠিক জায়গায় বসানোর মত অন্তর্দৃষ্টি। যে সব দেশের নেতৃত্বে মধ্যে এসব গুন নেই তাদের দ্বারা দেশের উন্নয়নের বদলে গোষ্ঠিস্বার্থ ও পকেটস্বার্থ উন্নয়নই কেবল সম্ভব। যেসব নেতৃত্ব উপরোক্ত গুনের অধিকারী তাদের দ্বারা দেশ বড় জোর ১৫/২০ বছরের মধ্যেই উন্নতি লাভ করেছে। যে দেশের সে সৌভাগ্য হয় নি তারা আমাদের মতই অর্ধ শতাব্দী ধরে মার্ক টাইম করে যাচ্ছে। কিন্তু তারই আড়ালে বিদেশে সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া ইত্যাদিও গড়ে উঠছে। এটা কিভাবে সম্ভব? তা আমাদের দেশের উদ্াহরন দেখলেই বোঝা যাবে। কথাটা একটু কর্কশ শোনালেও সত্যি হচ্ছে এই যে আমাদের দেশের রাজনীতিতে ’চোঙা ফোঁকা’ নেতাদেরই জয়জয়কার। গলাবাজিতে যে যত দক্ষ সে ততটাই বড় রাজনীতিক। নিজেদের দায়িত্ব তারা কতটা পালন করেছেন বা করছেন সেটা বলার আগে তারা বিরোধী পক্ষকে ধোলাই করতেই ব্যস্ত থাকেন। তাদের বক্তৃতায় সেই তিন চার দশক আগের বাক্ধারা ও শব্দাবলীর হুবহু ব্যবহার দেখা যাবে। তাদের নতুন কোন চিন্তাভাবনা বা দেশ গড়ার কাজে দলের কর্মীদেরকে নতুন কোন দিকনির্দেশনা দেবার দরকার পড়েনা। দল ঠিক রাখার জন্য তারা কর্মীদের যাবতীয় অপকর্মকেও নজরআন্দাজ করে থাকেন। খুবই বড় মাপের একজন তো বলেনই যে তার দল ক্ষমতায় থাকলে কর্মীরা ’কিছু’ পায়। এর ফলে দেখা যায় যে দেশ কিছু পাক না পাক, তার দলের নেতা-কর্মীরা প্রতি বছর তাদের সম্পদ ৩/৪ গুন বাড়িয়ে ফেলেছে। পাঁচ বছরে তাদের অনেক নেতার সম্পদ ২৫০ থেকে ৩০০ গুন বেড়েছে বলে একাধিক সংবাদে প্রকাশ। কিন্তু দেশের উন্নতি ঘটতে অর্ধ শতাব্দী লেগে যাচ্ছে। হয়ত অনেকে বলবেন যে তারা ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় ছিলেন না। কিন্তু অন্য দল ক্ষমতায় আসলেই দেশ পিছিয়ে পড়ে কেন? কারন তারাও তো একই গুরুর শিষ্য। তাদেরও তো ফিলসফি একই। ’নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকীর খাতায় শুন্য থাক, দুরের বাদ্য লাভ কি শুনে মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক।’ মহাকবি ওমর খৈয়ামের এই অমর কবিতাই তো তাদের আদর্শ। সে কারনেই নানা রকম ’ভবন’ ইত্যাদি গজিয়ে ওঠে আর অদৃশ্যভাবে প্যারালাল সরকারও কাজ চালায়। তাই এই দেশে বারবার ক্ষমতার হাত বদল হলেও দেশ এগিয়ে না গিয়ে কেবল পিছিয়েই যায়। কারন নতুন কিছু করবার যোগ্যতা বা দক্ষতা যেখানে অনুপস্থিত সেখানে মার্ক টাইম করা ছাড়া তো অন্য কিছু আশা করা যায় না। এ কারনেই দেখা যায় দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু দেশে উচ্চশিক্ষিত (?) বেকারের সংখ্যা ২২/২৩ লাখ। আর দক্ষ লোক বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। একটি সংবাদে প্রকাশ দেশের নাগরিক প্রবাসীরা ২২ জন যা আয় করে মাত্র একজন বিদেশী দক্ষ (?) লোক তা নিয়ে যায় দেশের বাইরে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ পাওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৯%-১০% কৃতকার্য হয়। উন্নয়ন কাজের ঢাক জোরেশোরে বাজান হয় কিন্তু এক বছরের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয় না; হাজার টাকার প্রকল্প লাখ টাকা খেয়ে ফেলে। দালান-কোঠা নির্মানে রডের বদলে বাঁশ দেওয়া হয়; রাস্তায় বিটুমিনের বদলে পোড়া মবিল দেওয়া হয়; মানসম্মত ইট-সিমেন্টের বদলে ৩নং ৪নং জিনিস ব্যবহার করা হয় যার ফলে নির্মানাধীন ভবনও শ্রমিকদের মাথার ওপর ধ্বসে পড়ে। কিন্তু এরই বিপরীতে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ, সোনা লুট-লোপাট হয়ে যায় নানাভাবে, বাংলাদেশ বিমানের ৭২০ টাকা চুরি, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে প্রায় সোয়া দুইশ’ কোটি টাকার কয়লা চুরির বিপরীতে বিদেশে সেকেন্ড হোম বেগমপাড়া বানানো হয়, সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমে ওঠে। ওদিকে বছরে বার মাসে তের পার্বনের মত অমুক সম্বর্ধনা তমুক অভিনন্দনের প্রতিযোগীতা, তমুক দিবস পালন ইত্যাদির মহা আড়ম্বরে জনগনের দৃষ্টিকে প্রকৃত সত্য থেকে আড়াল করার যাবতীয় আয়োজন চলতে থাকে।
উপরোক্ত কথাগুলিতে হয়ত অনেকেই ক্ষুব্ধ বোধ করতে পারেন। বলতে পারেন দেশে অনেক উন্নয়নই তো হয়েছে। উড়ালপথ হয়েছে; বেশ কিছু রাস্তাঘাট হয়েছে; বড় বড় স্থাপনা হয়েছে ইত্যাদি। নিশ্চয়ই হয়েছে এবং সে জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কত টাকার কাজ কত টাকা লাগাচ্ছে? কত বছরের উন্নয়ন কত বছর খেয়ে ফেলছে? যেখানে আমাদের অনুšনত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তকমা পেতেই তিন চার যুগ পার হয়ে যায় সেখানে উন্নত দেশ হতে আর কতদিন লাগবে? আমাদের অর্থের অভাব আছে এটাতো সত্য নয়। নইলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কিভাবে বলতে পারেন যে ’চার হাজার কোটি টাকা কিছুই নয়?’ কিভাবে সম্ভব যে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা ব্যক্তিকে দুদক চায়ের দাওয়াত দিয়ে আদর-আপ্যায়ন করে? সংসদে দাঁড়িয়ে শেয়ার বাজার কেলেংকারীর বা রাস্ট্রীয় ব্যাংক থেকে আটশ’ কোটি টাকা চুরির নাটের গুরুদের নামও উচ্চারন করতে পারেন না মাননীয় অর্থমন্ত্রী? অথচ তিনি নানা রঙের কর শুল্ক ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যপক জনগনকে দুয়ে ছাড়ছেন যদিও সেই টাকার যে বেপরোয়াভাবে নয়ছয় ঘটছে সে জন্য জবাবদিহিতার কোন ধারই ধারছেন না।
তাই দুঃখের সাথে বলতে হয় যে কেবল নেতা হলেই দেশের উন্নয়ন করা যায় না। বড় বড় অনলবর্ষী বক্তা হলেও দেশের প্রকৃত কোন লাভ হয় না যদি না সেই নেতার মধ্যে সর্বোপরি সবার উপরে দেশপ্রেম না থাকে। সততায়, সংকল্পে অটলতা, কার্য সম্পাদনে নিষ্ঠা ও দৃঢ়চিত্ততা না থাকে তবে সে নেতৃত্ব যতই আপাতঃ জনপ্রিয়তার দাবীদার হোন না কেন, তার কাছ থেকে দেশ আসলেই টেকসই কিছু পায় কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।
No comments:
Post a Comment