Monday, October 8, 2018

দেশের উন্নয়ন ও নেতৃত্ব

একটি দেশকে প্রকৃত উন্নতির দিকে টেনে নিতে সেই দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে অবশ্যই একাধিক গুনের অধিকারী হতে হয়। সে সব গুনের মধ্যে সর্বপ্রথম দেশপ্রেম, তারপর সততা, দুরদৃষ্টি এবং কঠোর সংকল্প গ্রহন ও তা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। এ ছাড়াও দরকার জ্ঞান ও দক্ষতা এবং ঠিক ব্যক্তিকে ঠিক জায়গায় বসানোর মত অন্তর্দৃষ্টি। যে সব দেশের নেতৃত্বে মধ্যে এসব গুন নেই তাদের দ্বারা দেশের উন্নয়নের বদলে গোষ্ঠিস্বার্থ ও পকেটস্বার্থ উন্নয়নই কেবল সম্ভব। যেসব নেতৃত্ব উপরোক্ত গুনের অধিকারী তাদের দ্বারা দেশ বড় জোর ১৫/২০ বছরের মধ্যেই উন্নতি লাভ করেছে। যে দেশের সে সৌভাগ্য হয় নি তারা আমাদের মতই অর্ধ শতাব্দী ধরে মার্ক টাইম করে যাচ্ছে। কিন্তু তারই আড়ালে বিদেশে সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া ইত্যাদিও গড়ে উঠছে। এটা কিভাবে সম্ভব? তা আমাদের দেশের উদ্াহরন দেখলেই বোঝা যাবে। কথাটা একটু কর্কশ শোনালেও সত্যি হচ্ছে এই যে আমাদের দেশের রাজনীতিতে ’চোঙা ফোঁকা’ নেতাদেরই জয়জয়কার। গলাবাজিতে যে যত দক্ষ সে ততটাই বড় রাজনীতিক। নিজেদের দায়িত্ব তারা কতটা পালন করেছেন বা করছেন সেটা বলার আগে তারা বিরোধী পক্ষকে ধোলাই করতেই ব্যস্ত থাকেন। তাদের বক্তৃতায় সেই তিন চার দশক আগের বাক্ধারা ও শব্দাবলীর হুবহু ব্যবহার দেখা যাবে। তাদের নতুন কোন চিন্তাভাবনা বা দেশ গড়ার কাজে দলের কর্মীদেরকে নতুন কোন দিকনির্দেশনা দেবার দরকার পড়েনা। দল ঠিক রাখার জন্য তারা কর্মীদের যাবতীয় অপকর্মকেও নজরআন্দাজ করে থাকেন। খুবই বড় মাপের একজন তো বলেনই যে তার দল ক্ষমতায় থাকলে কর্মীরা ’কিছু’ পায়। এর ফলে দেখা যায় যে দেশ কিছু পাক না পাক, তার দলের নেতা-কর্মীরা প্রতি বছর তাদের সম্পদ ৩/৪ গুন বাড়িয়ে ফেলেছে। পাঁচ বছরে তাদের অনেক নেতার সম্পদ ২৫০ থেকে ৩০০ গুন বেড়েছে বলে একাধিক সংবাদে প্রকাশ। কিন্তু দেশের উন্নতি ঘটতে অর্ধ শতাব্দী লেগে যাচ্ছে। হয়ত অনেকে বলবেন যে তারা ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় ছিলেন না। কিন্তু অন্য দল ক্ষমতায় আসলেই দেশ পিছিয়ে পড়ে কেন? কারন তারাও তো একই গুরুর শিষ্য। তাদেরও তো ফিলসফি একই। ’নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকীর খাতায় শুন্য থাক, দুরের বাদ্য লাভ কি শুনে মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক।’ মহাকবি ওমর খৈয়ামের এই অমর কবিতাই তো তাদের আদর্শ। সে কারনেই নানা রকম ’ভবন’ ইত্যাদি গজিয়ে ওঠে আর অদৃশ্যভাবে প্যারালাল সরকারও কাজ চালায়। তাই এই দেশে বারবার ক্ষমতার হাত বদল হলেও দেশ এগিয়ে না গিয়ে কেবল পিছিয়েই যায়। কারন নতুন কিছু করবার যোগ্যতা বা দক্ষতা যেখানে অনুপস্থিত সেখানে মার্ক টাইম করা ছাড়া তো অন্য কিছু আশা করা যায় না। এ কারনেই দেখা যায় দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু দেশে উচ্চশিক্ষিত (?) বেকারের সংখ্যা ২২/২৩ লাখ। আর দক্ষ লোক বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। একটি সংবাদে প্রকাশ দেশের নাগরিক প্রবাসীরা ২২ জন যা আয় করে মাত্র একজন বিদেশী দক্ষ (?) লোক তা নিয়ে যায় দেশের বাইরে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ পাওয়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৯%-১০% কৃতকার্য হয়। উন্নয়ন কাজের ঢাক জোরেশোরে বাজান হয় কিন্তু এক বছরের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয় না; হাজার টাকার প্রকল্প লাখ টাকা খেয়ে ফেলে। দালান-কোঠা নির্মানে রডের বদলে বাঁশ দেওয়া হয়; রাস্তায় বিটুমিনের বদলে পোড়া মবিল দেওয়া হয়; মানসম্মত ইট-সিমেন্টের বদলে ৩নং ৪নং জিনিস ব্যবহার করা হয় যার ফলে নির্মানাধীন ভবনও শ্রমিকদের মাথার ওপর ধ্বসে পড়ে। কিন্তু এরই বিপরীতে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ, সোনা লুট-লোপাট হয়ে যায় নানাভাবে, বাংলাদেশ বিমানের ৭২০ টাকা চুরি, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে প্রায় সোয়া দুইশ’ কোটি টাকার কয়লা চুরির বিপরীতে বিদেশে সেকেন্ড হোম বেগমপাড়া বানানো হয়, সুইস ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমে ওঠে। ওদিকে বছরে বার মাসে তের পার্বনের মত অমুক সম্বর্ধনা তমুক অভিনন্দনের প্রতিযোগীতা, তমুক দিবস পালন ইত্যাদির মহা আড়ম্বরে জনগনের দৃষ্টিকে প্রকৃত সত্য থেকে আড়াল করার যাবতীয় আয়োজন চলতে থাকে।
উপরোক্ত কথাগুলিতে হয়ত অনেকেই ক্ষুব্ধ বোধ করতে পারেন। বলতে পারেন দেশে অনেক উন্নয়নই তো হয়েছে। উড়ালপথ হয়েছে; বেশ কিছু রাস্তাঘাট হয়েছে; বড় বড় স্থাপনা হয়েছে ইত্যাদি। নিশ্চয়ই হয়েছে এবং সে জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারকে অবশ্যই ধন্যবাদ দিতে হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কত টাকার কাজ কত টাকা লাগাচ্ছে? কত বছরের উন্নয়ন কত বছর খেয়ে ফেলছে? যেখানে আমাদের অনুšনত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তকমা পেতেই তিন চার যুগ পার হয়ে যায় সেখানে উন্নত দেশ হতে আর কতদিন লাগবে? আমাদের অর্থের অভাব আছে এটাতো সত্য নয়। নইলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কিভাবে বলতে পারেন যে ’চার হাজার কোটি টাকা কিছুই নয়?’ কিভাবে সম্ভব যে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা ব্যক্তিকে দুদক চায়ের দাওয়াত দিয়ে আদর-আপ্যায়ন করে? সংসদে দাঁড়িয়ে শেয়ার বাজার কেলেংকারীর বা রাস্ট্রীয় ব্যাংক থেকে আটশ’ কোটি টাকা চুরির নাটের গুরুদের নামও উচ্চারন করতে পারেন না মাননীয় অর্থমন্ত্রী? অথচ তিনি নানা রঙের কর শুল্ক ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যপক জনগনকে দুয়ে ছাড়ছেন যদিও সেই টাকার যে বেপরোয়াভাবে নয়ছয় ঘটছে সে জন্য জবাবদিহিতার কোন ধারই ধারছেন না।
তাই দুঃখের সাথে বলতে হয় যে কেবল নেতা হলেই দেশের উন্নয়ন করা যায় না। বড় বড় অনলবর্ষী বক্তা হলেও দেশের প্রকৃত কোন লাভ হয় না যদি না সেই নেতার মধ্যে সর্বোপরি সবার উপরে দেশপ্রেম না থাকে। সততায়, সংকল্পে অটলতা, কার্য সম্পাদনে নিষ্ঠা ও দৃঢ়চিত্ততা না থাকে তবে সে নেতৃত্ব যতই আপাতঃ জনপ্রিয়তার দাবীদার হোন না কেন, তার কাছ থেকে দেশ আসলেই টেকসই কিছু পায় কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।

গণপূর্ত অধিদফতরে বদলি আতঙ্ক

গণপূর্ত অধিদফতরে বদলি আতঙ্ক--অভিযোগ ওঠেছে, এসব বদলির বেশির ভাগই হচ্ছে আর্থিক লেনদেনে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধানের মেয়াদ সরকারের মেয়াদের সাথে সাথেই (ডিসেম্বর) শেষ হচ্ছে। যে কারণে, প্রধান প্রকৌশলী মো: রফিকুল ইসলাম বাণিজ্য করে নিজের পকেট ভর্তি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে থাকা কর্মকর্তাদের ঢাকায় বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়ে আসা হচ্ছে। আবার অনেকের পোস্টিং দিচ্ছেন তাদের পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রিপাড়া, সংসদ, গণভবন, বঙ্গভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। আর এসব পদ ফাঁকা করতে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কর্মরতদের সরিয়ে দিচ্ছেন অন্যত্র। শুধু টেন্ডারে অনিয়ম ও জালিয়াতি করেই তিনি সরকারের কয়েক শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপরের সংবাদ প্রতিবেদনের অংশবিশেষ আজকের দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত হয়েছে। ঐ প্রতিবেদনেই প্রকাশ এই রমরমা দুর্নীতির কায়কারবার কেবল আজকারের নয়, বেশ অনেক দিন থেকেই চলছে। প্রশ্ন জাগে, এই গনপূর্ত ভবনটি তো দুদক-এর দপ্তর থেকে হাজার মাইল দুরে নয়। তাহলে এখানে এই যে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে এ বিষয়ে তারা কি কেবল ঘুমিয়েই আছেন নাকি ভান করে আছেন? দীর্ঘ সময় ধরে এই রাজধানীরই একটি দপ্তরে দুর্নীতির মচ্ছব চলবে আর তারা তাকে পাশ কাটিয়ে কবিরোধী দলের কে ছোটখাট দুর্নীতি করছে তার পেছনে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে এটা একটা স্বাধীন গনতান্ত্রিক দেশে, যেখানে সরকার গর্ব করে বলে যে এখানে 'আইনের শাসন বহাল আছে, - সেখানে চলে কিভাবে? দেশে কি দুর্নীতির মচ্ছব এবাবেই চলবে? লাখো কোটি টাকার খান খেলাপীদেরকে কিছু বলা যাবে না। লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার কারীদের কিছু করা যাবে না। এভাবেই দেশ চলবে? এর পরও ভাবতে হবে দেশ ঠিক ভাবেই চলছে?

তারা মানুষকে আর মানুষ মনে করে না।

রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বলেছেন, ‘এ দেশের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, বড় বড় আমলা, বিচারপতি পুলিশের আইজি, সেনাবাহিনী প্রধান, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারী, কেবিনেট সেক্রেটারী, সচিব এবং এই ধরণের যারা আছে তারা একটু বড় হইয়া গেলে, নামিদামি হয়ে গেলে, মানুষকে আর মানুষ মনে করে না। এটা একদম ঠিক না। মানুষকে মানুষ মনে করতে হবে এবং জনগনের প্রতিনিধি যারা তাদেরকে আরো বেশি মানুষকে মানুষ মনে করতে হবে। কারণ জনগনের ভোটেই তারা প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। জনগনের ভোটে প্রতিনিধি হইয়া তাদের উপরেই আবার মাতাব্বরি দেখাইবা বেডাগিরি দেখাইবা এটাতো হতে পারে না। জনগনের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে।’ --- দৈনিক নয়া দিগন্ত। মহামান্য রাসট্রপতির এসব কথার সাথে নীতিগতভাবে দ্বিমত করার কোন সুযোগ নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে কারা জনগনকে পরোয়া করবে? তাদেরকে মানুষ মনে করবে? যারা মনে করেন যে ক্ষমতায় আসার জন্য পাবলিকের ভোট তাদের না হলেও কোন সমস্যা নেই, যারা মনে করেন যে পাবলিকের টাকায় বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা আকন্ঠ ভোগ করলেও তারা তাদের প্রজা ছাড়া আর কিছু নয়, তারা জনগনকে মানুষ মনে করবেই বা কেন? মহামান্য রাস্ট্রপতি এই যে সদ্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিলে স্বাক্ষর করলেন, এর বিরুদ্ধে জনমতকে তিনি কি যথাযথ গুরুত্ব দিতে পেরেছেন? তাকেও তো এক ধরনের 'লাইনে' পড়েই নিশ্চয়ই ঐ বিলে স্বাক্ষর দান করতে হয়েছে। জনগনের আবেগ অনুভুতি বা আপত্তি কোন গুরুত্বই পায়নি। তাই এদেশে বলা সহজ অনেক কিছুই, কিন্তু তার বাস্তব রুপ দেওয়াটা খুবই কঠিন। কারন আমাদের মনমানস সে রকমই যেমন সেই আবু হোসেনের এক দিনের খলিফাগিরি-তে দেখেছি। গরীব আবু হোসেনের পুর্বের অবস্থা ভাল থাকলেও প্রচুর অপব্যয় তাকে গরীবই করে ফেলেছিল। অনেক আক্ষেপ করে সে বলছিল একবার খলিফা হতে পারলে সে অনেক কিছুই করতে পারত। খলিফা হারুনুর রশীদ তাঁর নিয়মিত নৈশভ্রমনকালে আবু হোসেনের এই উক্তি শুনে তাকে কৌশলে প্রাসাদে নিয়ে আসেন। তাকে একদিনের জন্য খলিফা হিসেবে ক্ষমতা দান করেন। আবু হোসেন ভাবতেই পারেনি এরক কিছু হতে পারে। রাত্রে সে জাগ্রত হয়ে তার কামরা ও তার চাকচিক্য আসবাব ইত্যাদি দেখে তার মাথা বিগড়ে যায়। সে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে এলোপাথাড়ি কোপাতে থাকে। তার উন্মাদের মত কোপাকুপিতে বিছানার গদী, বালিম, ঘরের পর্দা ইত্যাদি কেটে যা তা অবস্থা হয়ে যায়। এই যে অবস্থা, এটার সাথে আমাদের 'হঠাৎ-নবাবদের' কি খুব বেশী গরমিল আছে?হঠাৎ-নবাবেরা তাদের 'মেন্টাল ব্যালান্স' ঠিক রাখতে পারেনা। তাই তাদের কাছে ন্যায় ও ৗচিত্যবোধ আশা করা যায় না।

Friday, September 14, 2018

প্রশ্নফাঁসের এই মহোৎসবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং নীতিহীন চরিত্রহীন কুশিক্ষিত একটি শ্রেনী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। তবে এজন্য কেবল এরাই দায়ী ভাবলে বড় ধরনের ভুল হবে। পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র বা এমসিকিউ জাতীয় প্রশ্নপত্র এর আগেও তো ছিল। কিন্তু এখনকার মত মহামারী তো ছিল না। তাহলে এই ধ্বস নামার কারন কি? এই বাংলায়ই একটা প্রবাদ আছে। ’রাজার পাপেতে হয় রাজ্য ছারখার; সুখ নাহি থাকে প্রানে রায়েত প্রজার।’ বিগত ১২/১৪ বছর ধরে এদেশে বিপুল অংশের মানুষের মধ্যে যে নৈতিকতার যে দুর্ভিক্ষ ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যপকতর হয়েছে তা ধারাবাহিক কু-শাসন ও অপশাসনের ফলশ্রুতিতেই ঘটেছে। নীতি-নৈতিকতা ও মুল্যবোধের বিকল্প কোন ধরনের চেতনা বা ্েশ্লাগানের গালভরা বুলি হতে পারে না। ’বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ই হোক আর ’বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ই হোক, নীতি-নৈতিকতা ও মুল্যবোধের ব্যাপারে এর কোন প্রভাব যে এই সমাজে পড়েনি সেটা সাদা চোখেই দেখা যায়। নইলে ক্রমাগত ধারাবাহিকভাবে দেশটি দুর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড করতে পারত না। যারা এখন ’গনতন্ত্র নাই’ বলে বুক চাপড়াচ্ছে, তারা তাদের সময়ে পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের যে প্রশংসনীয় কাজটা করেছিল, পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনীতির পাঁক ঢুকিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। গনতন্ত্রকে ভয়াবহভাবে ঝুঁকিগ্রস্থ করার জন্য বিজয়োৎসবকে প্রতিপক্ষকে হামলার শিকারে পরিনত করা, গ্রেনেড হামলা চালানোকে ঠাট্টার বিষয় বলে ভাবা, মারাত্মক অস্ত্র পাচারে প্রশ্রয় দেওয়া, বিশেষ ভবনের মাধ্যমে প্যারালাল সরকার চালানো ইত্যাকার কর্মকান্ডকে ’নজরআন্দাজ’ করেছে। অবশেষে তত্বাবধায়ক সরকারের অস্তিত্বকেই নানা অপকৌশল করে চরমভাবে ভংগুর করে দিয়েছে। অপরদিকে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা পেয়েই বিশেষ বিশেষ চেতনার নামে ক্রমাগত জাতিকে বিভক্ত করে নানা রকম অপশাসনের দৃষ্টান্ত এমনভাবে রেখেছে যে গত ৮/৯ বছরে কয়েক লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুট, গুম-খুন, নিষ্ঠুরভাবে প্রতিপক্ষকে দমন রাস্ট্রের বিভিন্ন বিভাগকে চরমভাবে দলীয়করন ইত্যাদির মাধ্যমে একটা বিশেষ শ্রেনীকে আংগুল ফুলে বটগাছ হবার সুযোগ করে দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ কেবল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে বিনাপুঁজির ব্যবসাকেন্দ্র ও সাথে সাথে রাজনীতির মল্লযুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে একদিকে যেমন গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে ছ্যারাবেরা করে ফেলা হয়েছে, তেমনি শিক্ষদের মধ্যে নৈতিকতা ও মুল্যবোধেরও কবর রচনা করা হয়েছে। নীতিহীন চরিত্রহীন মানুষ জাগতিক উন্নতিকেই জীবনের মুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে যে কারনে ঘুষ-বানিজ্যের মাধ্যমে হোক আর প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমেই হোক, আর খাদ্যে ভেজাল দিয়েই হোক বা মুনাফাখোরী সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই হোক - মোট কথা যেন তেন প্রকারেন রাতারাতি পকেট ভারি করতে যা কিছু করা দরকার তা-ই করা হচ্ছে। আর এসব করতে একটা শ্রেনী যার মধ্যে উঁচু মানের ডক্টরেট ডিগ্রীধারী থেকে স্কুল-কলেজে পাঠরত শিক্ষার্থী, মুদী দোকানী থেকে শিল্পপতি কেউ পিছিয়ে নেই। এসব কিন্তু দু’একদিনে হয়নি। কিন্তু একদল দলকানা আঁতেল বিশেষ বিশেষ চেতনার নাম নিয়ে ক্রমাগতভাবে এইসব অপকর্মের চুলায় ফুঁ মেরে এসেছেন। আজ যখন চুলোর আগুন চালে ধরেছে তখন তারা নানা নোসখা বাতলাচ্ছেন। শিক্ষানীতি প্রনয়নের সময়েও দেখা গেছে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষার মুল বিষয়গুলোকে কিভাবে অবহেলা করা হয়েছে। কোন ধর্মই যে ভিন্ন ধর্মকে অবজ্ঞা করে না বা কোন ধর্মেই যে খারাপ কাজকে সমর্থন করে না সেটা জানা সত্বেও তথাকথিত প্রগতিশীলতার নামে জাতীয় ও সমাজ জীবনে ধর্মের প্রভাবকে সনিষ্ঠভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছে। অন্য দিকে ’ডিজিটাল’ ’ডিজিটাল’ বলে দেশকে উথাল পাথাল করার বাতিক চললেও সকল কাজে আঠার মাসে, এমনকি চব্বিশ মাসে বছরের এনালগ সিস্টেম ঠিকই চলছে।


তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখে টোটকা ব্যবস্থা নেবার কোন সুযোগ নেই; আর নিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। বরং টপ-টু-বটম নতুন করে দেশপ্রেম ও নীতি-নৈতিকতাকে আরো বহুগুন দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। এবং বর্তমান সরকারী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সকল প্রকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিহাদ ঘোষনা করেছিল তার প্রকৃত ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। নইলে কেবল প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, কোন ক্ষেত্রেই এই জাতির ভবিষ্যত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পরিনতি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।।

Thursday, July 26, 2018

দেশে মামলাজট

দেশে মামলাজট বলে একটা কথা বহুল প্রচলিত হয়েছে। বর্তমানে জটবদ্ধ মামলার সংখ্যা নাকি চৌত্রিশ লক্ষ। এই জটবদ্ধ মামলার ৮০% নাকি জমিজমা সংক্রান্ত। তবে কেন এই জটের সৃষ্টি হয়েছে তা পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় এর বিরাট অংশ একশ্রেনীর মামলাবাজ ব্যক্তি, উকিল, এবং পেশকারের অর্থলোভ এবং ক্ষেত্রবিশেষে খোদ কিছুসংখ্যক বিচারকের অনভিজ্ঞতা ও অন্যবিধ কারনও এর জন্য দায়ী। আমরা জানি বিচারককে ’বিজ্ঞ’ বলে সম্বোধন করতে হয়। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় এই ’বিজ্ঞ’ কথাটার ভেতরেই বেশ সমস্যা রয়েছে। একটি মামলার মেরিট কতটুকু সেটা আরজি ও তার জবাবের মধ্যেই একজন প্রকৃত ’বিজ্ঞ’ বিচারকের প্রথম দৃষ্টিতেই ধরা পড়ার কথা। কিন্তু দেখা যায় যে যে কোন মামলা আসলেই কোন রকম আপাতঃ পরিবীক্ষণ ছাড়াই দিনের পর দিন সেই মামলার তারিখ দিয়ে মামলাবাজ বাদীকে উতসাহিত এবং উকিল, মুহুরী ও পেশকারকে বিবাদীকে দুয়ে নেবার সুযোগ করে দেওয়া হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় কোন একটি জমিসংক্রান্ত মামলা রুজু হলো সাজানো কারন উদ্ভবের ৩০/৩৫ এমনকি ৬০/৬২ বছর পরে ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে। এই দীর্ঘ সময়ে সেই বাদীর সংশ্লিষ্ট জমির দখল তো দুরে থাক, সিএস, এসএ, আরএস, বিএস - কোন খতিয়ানেই তার নাম নেই, কোন দাখিলা নেই। এই দীর্ঘ সময় পরে হঠাত কোথা থেকে কিছু বানানো কাগজপত্র নিয়ে মামলা রুজু করা হয়েছে। এরকম মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে আর এর মধ্যে অনেক বাদী বা বিবাদী মারা গেলেও সেসব মামলার সুরাহা হয় না। বরং মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদেরকে নতুন করে মামলার পক্ষ করে তা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবেই মামলার জট জমে ওঠে। বিচারক বদলী হয়ে যান, হয়ত উকিলও মারা যান; কিন্তু তাদের উত্তরসুরীরা সেই মামলা চালাতেই থাকে। আবার এমনও দেখা যায় যে কোন একটুকরো জমির একবার নাম ও জমা খারিজ হবার পর ৮/১০ বছর খাজনা ইত্যাদি দেবার পর হঠাৎ কিভাবে যেন একরকম ভৌতিকভাবেই সে জমির দাগ-খতিয়ান, চৌহদ্দী বা পরিমান বদলে গেল প্রকৃত মালিকের অজ্ঞাতসারে। কিংবা কানুনগো বা জরিপকারীর ভুলে - তা সে ইচ্ছাকৃতই হোক আর অনিচ্ছাকৃতই হোক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে যে ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয় সেটাও বাস্তব সত্য), সে ভুল সংশোধন করার সহজ বা সুলভে কোন সমাধান নেই। এর জন্য দীর্ঘকালীন মামলায় জড়িয়ে থাকতে হবে, যা অবিশ্বাস্য সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। হ্যাঁ, ভুল হতেই পারে; কিন্তু সে ভুল সংশোধন করার পদ্ধতি এতই জটিল যে সে ধরনের মামলাও মামলাজটের অন্যতম কারন হয়ে থাকে।
এসব বিষয় যদি আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় গুরুত্বের সাথে বিচেনা করা না হয়; যদি প্রকৃত যৌক্তিক কারন ছাড়াই দিনের পর দিন সেই মামলার তারিখ পড়তে থাকে আর সেই মান্ধাতার আমলের আইন দিয়েই এসবের বিচারের (?) সিলসিলা চালু থাকে তবে চলমান মামলাজট কমানোর কোন প্রচেষ্টাই সফল হবে বলে মনে হয় না। মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয় যদি এ ব্যপারে একটু দৃষ্টি দেন তবে এই মামলাজট এবং এর সাথে বাদী-বিবাদীর হয়রানি ও অনর্থক অর্থনাশ - দুটোরই ইতিবাচক সমাপ্তি হতে পারে।

Tuesday, July 3, 2018

Political leaders of Bangladesh - Quality and opportunity

বিশ্বে সম্ভবতঃ বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজ এবং লাভজনক পেশা হচ্ছে রাজনীতি।  যে কোন চাকুরী-বাকরীতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষন, মেধা ইত্যাদি অত্যাবশ্যক। কিন্তু দেখা যায় রাজনীতিই এই দেশে এমন একটি পেশা যাতে উপরোক্ত কোনটিরই দরকার নেই। হ্যাঁ, একটি বিষয়ে বিশেষ গুন থাকা অত্যাবশ্যক এবং সেটা হচ্ছে কিছু গৎবাঁধা মুখস্ত বহুল উচ্চারিত বুলি, গলার জোর এবং মারদাঙ্গায় পটুত্ব। গোলাগুলি চালাতে পারলে আরো ’উন্নতি’। এতে ’নেতা’ হওয়াটা আরো সহজ হয়ে যায়। রাজনীতি অন্যান্য দেশে করে জনগনের সেবা করা দেশকে কিছু দেওয়ার জন্য। এসবই করা হয় দেশকে ভালবেসে, দেশের প্রতি দায় এবং দায়িত্ববোধ থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনটাই প্রয়োজন নেই। কারন এখানে রাজনীতি করা হয় বিনা পুঁজিতে অতি স্বল্প সময়ে কোটিপতি হবার জন্য। বস্তুতঃ অতি স্বল্প সময়ে ধনী হবার জন্য রাজনীতির চেয়ে আর কোন পন্থা এদেশে নেই। একটু লক্ষ্য করলেই এ কথার যথার্থতা মিলবে। দেখুন, ছাত্রাবস্থা শেষ হয়নি; এমন সময়েও ব্যাংকমালিক হওয়া যায়, হেলিকপ্টারে দাওয়াত খেতে যাওয়া যায়, রাজধানী শহরের সবচেয়ে পশ এলাকায় হাইরাইজ বিল্ডিং করা যায় এমনকি বিদেশে সেকেন্ড হোমও করা সম্ভব। কারন রাজনীতি করলেই, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি করলেই এসব যেন আপনাআপনিই এস পায়ের কাছে জমা হয়। যে ব্যক্তি এই কিছুদিন আগে সামান্য বিড়ি চেয়ে খেত, বা চোরাচালানের বাহক ছিল, মাদকের ক্যারিয়ার ছিল, বা এমনকি গাড়ী চুরির সাথেও জড়িত ছিল, রাজনীতিতে আসার পরপরই, অথবা রাজনীতির ব্যক্তিদের সাথে ’গ্লাসফ্রেন্ড’ হবার সুবাদেও শুধু কোটি নয়, হাজার কোটি টাকার মালিক হতে পারে। এটা এ দেশ ছাড়া, যেখানে দিবারাত্র বিশেষ বিশেষ চেতনার ধুয়া তুলে চারদিক ’আন্ধার’ করে তোলা হয়, সেখানে ছাড়া আর কোন দেশে সম্ভব? এখানে রাজনীতিতেও মেধা, যোগ্যতা বা আদর্শবাহী ব্যক্তিত্বও কোন কল্কে পায় না।  একেবারে মৌরসী পাট্টার মত এখানেও জমিদারের ছেলেমেয়েকেই জমিদার হতেই হবে, সে বোবা-কালা-অন্ধ-বধির যেই হোক। এ কারনেই ঠিক যেমন বটগাছের নীচে আর কোন ছোট গাছ বাড়তেই পারে না তেমনি সর্বোচ্চ নেতার ছায়ায় আর কোন নেতা উঠতেই পারে না। অথচ এ সবই করা হয় গনতন্ত্রের নামে। এর কারন সুবিধাবাদের রাজনীতি কেবল সেই তন্ত্রেরই ধারক-বাহক হয়ে তাকে যে তন্ত্র তাদেরকে অবাধ ক্ষমতা চর্চা ও প্রয়োগ করতে কার্যকরভাবে সহায়তা করে।
এবং উপরোক্ত কথাগুলির সত্যতা ও যথার্থতা প্রতিনিয়তই এদেশে দৃশ্যমান। কারন এদেশই এমন একটি দেশ যেখানে কোন রকম পরিকল্পনা ছাড়াই যে কোন কিছু করা সম্ভব। এখানে শহর গড়ে ওঠে কোন পরিকল্পনা ছাড়াই, যা অল্প দিনের মধ্যেই আর বাসযোগ্য থাকে না। ’উন্নয়ন’ পরিকল্পনা করা হয় কোন সুবিবেচনা, দুরদর্শিতা ও সু-পরিকল্পনা ছাড়াই যাতে শত টাকার কাজ হাজারেও শেষ হয় না; বছরের কাজ যুগেও শেষ হয় না। শিক্ষা একটি জাতির মেরুদন্ড হলেও তা নিয়ে গিনিপিগসুলভ এক্সপেরিমেন্ট যুগের পর যুগ চলতেই থাকে আর দেশ একদল তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বেকার শ্রেনী উৎপাদন করে। যেখানে মেধার কোন কদর নেই, অ-মেধাবী/মেধাহীনদেরকে গুরুত্বপুর্ন সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এমনই শাসন-প্রশাসন চলে যে ডাক্তারকে ব্যাংকার, ব্যবসায়ীকে শিক্ষাব্যবস্থার কর্নধার, নকলবাজ ও নীতি-নৈতিকতাহীনদেরকে শিক্ষক ইত্যাদির মাধ্যমে সর্বত্র  ’স্কয়ার পেগ ইন এ রাউন্ড হোল’ অবস্থা সৃষ্টি হয়। প্রকৃত আদর্শ না থাকার ফলেই রাজনীতির নামে যে সুবিধাবদিতা বা ’অপরচ্যুনিজম’ চলে তাতে আজকের ’friend  (বন্ধু) কালকে ’foe (শত্রু)-তে পরিনত হয়। আজকে যা ভাল অবস্থান বদলে গেলে কালকে তা সবচেয়ে অপছন্দনীয় হয়ে পড়ে। হ্যাঁ, শিক্ষা-ই যে সব কিছু সেটা না হলেও মানুষের অন্তর্নিহিত গুনকে বোঝার ক্ষমতা তো অবশ্যই থাকতে হয়, নইলে অতি সাধারন একজন বিড়ি ব্যবসায়ী বা সামান্য একজন সাব-কন্ট্রাক্টরও গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির মালিক হতে পারতেন না। স¤্রাট আকবর নিরক্ষর হলেও তিনি ’রতন’ চিনতেন। তাই তিনি ’আকবর দি গ্রেট’ হতে পেরেছিলেন। কিন্তু ব্যতিক্রম তো আর নিয়ম নয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলির যথার্থতা কতটুকু সেটা আমাদের দেশের সার্বিক অবস্থার দিকে তাকালেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি প্রকৃত কোন কমিটমেন্ট না থাকায়, প্রকৃত ভালবাসা না থাকায় দেশ দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। মাৎসান্যায় প্রবলপ্রতাপে রাজত্ব করে। শাসকদের জবাবদিহিতা বলতে কোন বস্তুর অস্তিত্ব থাকে না। আর এসব না থাকলে গনতন্ত্র গনতন্ত্র বলে যতই গলা ফাটানো হোক, দেশকে অমুক স্তরে তমুক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে যতই বাগাড়ম্বর করা হোক, কোন কিছুতেই দেশের সাধারন মানুষের কোন উপকার হয় না। দেশও উন্নয়নের রাস্তায় গো-শকটের চেয়ে বেশী গতি পায় না।
আজকে এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, এটা তদানীন্তন অধিকাংশ রাজনীতিক নেতা ভাবেন নি। ভাবলে একটা নতুন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পরিচালনা করতে সক্ষম এমন অন্ততঃ একটি শ্রেনী বা গ্রুপ তো তৈরী থাকত। মহামতি (?) লেনিনের ভাষায়, ’Give me thirty professional revolutionaries and I will turn Russia upside down - এই কথাটার মর্মার্থ আমাদের নেতারা উপলব্ধি করতেন। এরকম প্রস্তুতি ছিলনা বলেই সদ্যস্বাধীন দেশটি অনতিবিলম্বেই লুটেরাদের দারুন মৃগয়াক্ষেত্রে পরিনত হয় যা বঙ্গবন্ধুর মত ’monumental'  ব্যক্তিত্বও সামলাতে পারেন নি । ইতিহাস সাক্ষী সম্পুর্ন বিধ্বস্ত জার্মানী বা জাপান সে রকম নেতৃত্ব পেয়েছিল বলেই তারা মাত্র ২৫/৩০ বছরের মধেই সেই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে ফিনিক্স পাখীর মত পুনর্জীবন লাভ করে এবং ঐ সময়ের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক শক্তিতে উন্নীত হয়। এমনকি মহাযুদ্ধোত্তর সোভিয়েট ইউনিয়নও একটি কৃষিপ্রধান দেশ থেকে শিল্পোন্নত পরাশক্তিতে পরিনত হয়। দেশপ্রেমিক, দৃঢ়সংকল্প ডিক্টেটররাও অনেক ক্ষেত্রে এমন উদাহরন রেখে গেছেন যে কারনে প্রথম মহাযুদ্ধে প্রায় সর্বস্ব হারানো জার্মানী ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সাল – মাত্র এই দশ বছরের মধ্যে এমন অকল্পনীয় উন্নতি করে যে তাকে থামাতে আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্সের মত শক্তিকেও বিপুল ক্ষতির শিকার হতে হয়। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার উদ্গাতা লেনিনের মৃত্যুর পর জোসেফ স্ট্যালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে ৪/৫ মাস আগেই সমাপ্ত করেছেন এবং তাঁর দেশকে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের প্যারালাল একটি শক্তিতে পরিনত করেছেন। তাদের লক্ষ্য সুদুর হলেও ছিল সুনির্দিষ্ট। তাই তাদের কাছে সময়ের মুল্য ছিল সবচেয়ে বেশী, যার জন্য তাদের কাজকর্ম ছিল ’Race against time’।  আর আমাদের দেশে? স্বাধীনতার দু’তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে এক নির্মম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়। হতে হয় ’তলাবিহীন ঝুড়ির’ তকমাধারী এক ছ্যারাবেরা দেশ। আজও এক বছরের কাজ শেষ হতে চার/পাঁচ বছর লেগে যায়, হাজার টাকার প্রকল্প কোটি টাকা খেয়ে ফেলে। অথচ ’উন্নয়নের জোয়ারে’ দেশ ভেসে যাচ্ছে বলে আমরা নিজেরা নিজেদের পিঠ নিজেরাই চাপড়াই। এসবই ঘটে তখনই যখন অদুরদর্শী, অ-দেশপ্রেমিক, অ-জনবান্ধব এবং অদক্ষ নেতৃত্ব সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়।
উপরোক্ত কথাগুলি হয়ত অনেকের কাছেই অগ্রহনযোগ্য এমনকি কট’ও লাগতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা তাতে বদলায় না। আজ স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছরেও আমাদের দেশ যে কেবল ’উন্নয়নশীল’ তকমা পেল এতে খুশী হবার চেয়ে দুঃখিত হওয়ারই কথা। কিন্তু আমাদের স্বভাব বৈপরীত্যের কারনে আমরা দেশ ডিজিটাল বলে গর্ব করি অথচ আমাদের আঠার মাসে নয় বরং চব্বিশ মাসে বছর হচ্ছে এটা মনে আসে না।

Friday, June 29, 2018

বৈষম্য দূরের আশা জোগাচ্ছে না বাজেট

বৈষম্য দূরের আশা জোগাচ্ছে না বাজেট ---জনাব তুহিন ওয়াদুদের এই লেখাটির প্রেক্ষিতে বলতেই হয় এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে যদি সত্যিকারের কোন আদর্শ থাকত তবে এ অবস্থা হবার কোনই কারন ছিলনা। কিন্তু বাস্তব অবস্থা দৃষ্টে আজ একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে এদেশের স্বাধীনতার পেছনে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার স্পৃহা কতটা ছিল সেটা নিশ্চিত বলা না গেলেও অবাঙালীদের সম্পদ লুটপাট এবং এদেশের কিছু সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদীদেরকে তাদের স্থলাভিসিক্ত করা যে উদ্দেশ্য ছিল সেটা অস্বীকার করার বোধহয় আজ উপায় নেই। নইলে যে আদমজী জুটমিল নিয়ে বাঙালীদের এত গর্ব, এত ক্ষোভ যে এই সোনার ডিম পাড়া রাজহংসটির সব ডিম পাকিস্তানীরা নিয়ে যাচ্ছে আর তা দিয়ে তাদের রাস্তাঘাট সোনা দিয়ে বাঁধাচ্ছে, সেই আদমজী জুট মিল এই বাঙালী পুঙ্গবদের হাতেই তেরশ' কোটি টাকা দেনা মাথায় নিয়ে ডুবে যেত না। স্বাধীনতার পরপরই যে অবাঙালীদের সহায়-সম্পত্তি ব্যপক লুটপাট হয়ে গেল, কোন রকমের সু-আদর্শের অনুপস্থিতিই যে তার জন্য দায়ী ছিল সেটা আজ অকাট্য বাস্তব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের মধ্যে কোটিতে হয়ত একজনও নেই যিনি সত্যি কথাটা বলবেন। এই যে উত্তরাঞ্চলের দারিদ্রের বর্তমান অবস্থা সেটা দুর করার জন্য কোন সরকারই কি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছে? আজও যে নিচ্ছে না সেটা তো জনাব তুহিনের লেখায়ই ফুটে উঠেছে। কিন্তু কেন এই অবস্থা, যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধেই এদেশের মানুষ প্রানপণ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল?
স্বাধীনতার পেছনে সঠিক আদর্শের যে ঘাটতি ছিল সেটার ফলশ্রুতিতে আজ এদেশ দুর্নীতির পঙ্কে প্রায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে দেশের তরুন সমাজ আজ ধুঁকছে। সর্বত্র ন্যায়, সত্য ও সাম্যতার প্রকট অভাব। অথচ ঐসমস্ত অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতেই তো মুক্তিযুদ্ধ, নয় কি? আদর্শের উপস্থিতিতে দেশকে মানুষ কি দিতে পারে সেটা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখেছি। তিনি বলেছেন যে সদ্য পাওয়া পাকিস্তানে অফিস নেই, চেয়ার নেই, টেবিল নেই তবু মানুষ তাঁবুতে সামান্য একটা দুটো ভাঙ্গা টেবিল নিয়ে অফিসের কাজ করেছেন। স্টেশনে টিকিট না পেয়ে ট্রেনে চড়ে মানুষ টিটি-কে টিকেটের টাকা দিয়েছে। দুর্নীতি যেন ভোজবাজির মত উধাও হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দেখা গেল যে হরিল্লুটের মচ্ছব। কিছুদিন আগে সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহেবের লেখায় দেখেছি যে লোক কম ভাড়ায় থাকার জন্য গোপীবাগের ঘুপচি ঘরে থাকতো, বাজারের থলে হাতে বাসের হ্যান্ডেলে ঝুলে যাতায়াত করত, স্বাধীনতার পরে তিনি দেখেছেন সেই লোক মীরপুর কি মোহাম্মদপুরে বাড়ীর মালিক হয়ে তাঁর সাথে বেশ গর্ব করে বলেছে যে তিনি এখন বাড়ীর মালিক। এর পরে বঙ্গবন্ধুর আমলে যাদেরকে তিনি বিশ্বাস করে জাতীয়করনকৃত মিল-কারখানার প্রশাসক হিসেবে বসিয়েছিলেন, তারা সেই সব মিল-কারখানার যন্ত্রপাতি পর্যন্ত বিক্রী করে দিয়ে নিজেদের পকেট ভর্তি করেছে। অতি দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে তাঁকে বলতে হয়েছিল 'লোকে পায় সেনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। ' এসবই ছিল আদর্শহীনতার বিষময় ফল। এসব অবস্থার কি আজো কোন পরিবর্তন হয়েছে? হ্যাঁ, অনেকেই বলবেন যে দেশ তো 'এগিয়ে চলেছে।' সত্যিই, দেশে পদ্মা সেতু হচ্ছে, বড় বড় ফ্লাইওভার হয়েছে ও হচ্ছে, ডিপ-সী পোর্ট হচ্ছে। তবে যদি গত ১০/১২ বছরের তথ্যগুলো দেখা যায় তবে দেখতে হয় ৫০/৬০ হাজার কোটি টাকার শোয়ার বাজার লুট, ব্যাংকের খাণখেলাপীর অংক লাখো কোটি টাকার উপরে উঠেছে; কয়েকটি ব্যাংক ঘোরতর লুটপাটের কারনে লালবাতি জালিয়েছে আর সরকার সেগুলোকে কোরামিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। এমনকি রাস্ট্রীয় ব্যাংকের কোষাগার থেকেও অনায়াসে আটশ' কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেল কিন্তু তার উদ্ধারের আর কোন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলো না। আবার তার তদন্ত রিপোর্টটিও আলোর মুখ দেখতে পেল না। এরপর দেখা যাচ্ছে হাজার টাকার প্রজেক্ট দশ হাজার টাকা খেয়ে ফেলছে এক বছরের জায়গায় ৪/৫ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে বাড়িয়ে। দেশে প্রায় পঁয়ষট্টি লাখ বেকার যার মধ্যে বিশ লাখ শিক্ষিত বেকার। ঐ লুটপাট হওয়া অর্থ দিয়ে আরো ৪/৫ টা পদ্মা সেতু বানানো যেত। নতুন নতুন শিল্পে বিনিয়োগ করে লাখো বেকারের বেকারত্ব ঘোঁচানো যেত। এসবই কি আদর্শহীনতার বিষময় ফল নয়? যে বৈষম্য এই ছোট্ট দেশটিতে ক্রমবর্ধমান, সে বৈষম্যও প্রকৃত কোন আদর্শের অভাবেই ঘটছে। তাই মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সাহস নেই যে তিনি কোটারী স্বার্থের বাইরে গিয়ে প্রকৃত জনবান্ধব কোন বাজেট দেবেন। এত এত লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা লুট হয়ে গেছে, লাখো কোটি টাকা খান-খেলাপী হয়ে পড়েছে, কিন্তু অর্থমন্ত্রী তাদের নাম পর্যন্ত সংসদে উচ্চারন করার ক্ষমতা রাখেন না। স্বাধীনতার পর বাইশ পরিবার বেড়ে বাইশ হাজার পরিবার হয়েছে। বিদেশে সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া ইত্যাদি হয়েছে। আগে মানুষ রাজনীতি করত মানুষের কল্যানের লক্ষ্যে। তাঁরা ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানোর ব্রত নিয়েই রাজনীতি করতেন। আর আজ? আজ নাকি সংসদে ৭৫% - ৮০% ব্যবসায়ী, যারা কয়েক কোটি টাকা খরচ করে নমিনেশন কেনেন আর ইলেকশন (?) করেন। তারপর সেই বিনিয়োগের দশগুন উসুল করেন সংসদ বা মন্ত্রী হয়ে। কিন্তু স্বাধীন দেশে বঞ্চিত, শোষিত মানুষের কি লাভ হয়েছে?