প্রশ্নফাঁসের এই মহোৎসবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং নীতিহীন চরিত্রহীন কুশিক্ষিত একটি শ্রেনী ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। তবে এজন্য কেবল এরাই দায়ী ভাবলে বড় ধরনের ভুল হবে। পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র বা এমসিকিউ জাতীয় প্রশ্নপত্র এর আগেও তো ছিল। কিন্তু এখনকার মত মহামারী তো ছিল না। তাহলে এই ধ্বস নামার কারন কি? এই বাংলায়ই একটা প্রবাদ আছে। ’রাজার পাপেতে হয় রাজ্য ছারখার; সুখ নাহি থাকে প্রানে রায়েত প্রজার।’ বিগত ১২/১৪ বছর ধরে এদেশে বিপুল অংশের মানুষের মধ্যে যে নৈতিকতার যে দুর্ভিক্ষ ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যপকতর হয়েছে তা ধারাবাহিক কু-শাসন ও অপশাসনের ফলশ্রুতিতেই ঘটেছে। নীতি-নৈতিকতা ও মুল্যবোধের বিকল্প কোন ধরনের চেতনা বা ্েশ্লাগানের গালভরা বুলি হতে পারে না। ’বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ই হোক আর ’বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ই হোক, নীতি-নৈতিকতা ও মুল্যবোধের ব্যাপারে এর কোন প্রভাব যে এই সমাজে পড়েনি সেটা সাদা চোখেই দেখা যায়। নইলে ক্রমাগত ধারাবাহিকভাবে দেশটি দুর্নীতিতে বিশ্ব রেকর্ড করতে পারত না। যারা এখন ’গনতন্ত্র নাই’ বলে বুক চাপড়াচ্ছে, তারা তাদের সময়ে পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের যে প্রশংসনীয় কাজটা করেছিল, পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনীতির পাঁক ঢুকিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। গনতন্ত্রকে ভয়াবহভাবে ঝুঁকিগ্রস্থ করার জন্য বিজয়োৎসবকে প্রতিপক্ষকে হামলার শিকারে পরিনত করা, গ্রেনেড হামলা চালানোকে ঠাট্টার বিষয় বলে ভাবা, মারাত্মক অস্ত্র পাচারে প্রশ্রয় দেওয়া, বিশেষ ভবনের মাধ্যমে প্যারালাল সরকার চালানো ইত্যাকার কর্মকান্ডকে ’নজরআন্দাজ’ করেছে। অবশেষে তত্বাবধায়ক সরকারের অস্তিত্বকেই নানা অপকৌশল করে চরমভাবে ভংগুর করে দিয়েছে। অপরদিকে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা পেয়েই বিশেষ বিশেষ চেতনার নামে ক্রমাগত জাতিকে বিভক্ত করে নানা রকম অপশাসনের দৃষ্টান্ত এমনভাবে রেখেছে যে গত ৮/৯ বছরে কয়েক লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার, ব্যাংক-শেয়ার বাজার লুট, গুম-খুন, নিষ্ঠুরভাবে প্রতিপক্ষকে দমন রাস্ট্রের বিভিন্ন বিভাগকে চরমভাবে দলীয়করন ইত্যাদির মাধ্যমে একটা বিশেষ শ্রেনীকে আংগুল ফুলে বটগাছ হবার সুযোগ করে দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ কেবল স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে বিনাপুঁজির ব্যবসাকেন্দ্র ও সাথে সাথে রাজনীতির মল্লযুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে একদিকে যেমন গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে ছ্যারাবেরা করে ফেলা হয়েছে, তেমনি শিক্ষদের মধ্যে নৈতিকতা ও মুল্যবোধেরও কবর রচনা করা হয়েছে। নীতিহীন চরিত্রহীন মানুষ জাগতিক উন্নতিকেই জীবনের মুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছে যে কারনে ঘুষ-বানিজ্যের মাধ্যমে হোক আর প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমেই হোক, আর খাদ্যে ভেজাল দিয়েই হোক বা মুনাফাখোরী সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই হোক - মোট কথা যেন তেন প্রকারেন রাতারাতি পকেট ভারি করতে যা কিছু করা দরকার তা-ই করা হচ্ছে। আর এসব করতে একটা শ্রেনী যার মধ্যে উঁচু মানের ডক্টরেট ডিগ্রীধারী থেকে স্কুল-কলেজে পাঠরত শিক্ষার্থী, মুদী দোকানী থেকে শিল্পপতি কেউ পিছিয়ে নেই। এসব কিন্তু দু’একদিনে হয়নি। কিন্তু একদল দলকানা আঁতেল বিশেষ বিশেষ চেতনার নাম নিয়ে ক্রমাগতভাবে এইসব অপকর্মের চুলায় ফুঁ মেরে এসেছেন। আজ যখন চুলোর আগুন চালে ধরেছে তখন তারা নানা নোসখা বাতলাচ্ছেন। শিক্ষানীতি প্রনয়নের সময়েও দেখা গেছে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নামে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষার মুল বিষয়গুলোকে কিভাবে অবহেলা করা হয়েছে। কোন ধর্মই যে ভিন্ন ধর্মকে অবজ্ঞা করে না বা কোন ধর্মেই যে খারাপ কাজকে সমর্থন করে না সেটা জানা সত্বেও তথাকথিত প্রগতিশীলতার নামে জাতীয় ও সমাজ জীবনে ধর্মের প্রভাবকে সনিষ্ঠভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছে। অন্য দিকে ’ডিজিটাল’ ’ডিজিটাল’ বলে দেশকে উথাল পাথাল করার বাতিক চললেও সকল কাজে আঠার মাসে, এমনকি চব্বিশ মাসে বছরের এনালগ সিস্টেম ঠিকই চলছে।
তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখে টোটকা ব্যবস্থা নেবার কোন সুযোগ নেই; আর নিলেও সমস্যার সমাধান হবে না। বরং টপ-টু-বটম নতুন করে দেশপ্রেম ও নীতি-নৈতিকতাকে আরো বহুগুন দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। এবং বর্তমান সরকারী দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সকল প্রকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিহাদ ঘোষনা করেছিল তার প্রকৃত ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। নইলে কেবল প্রশ্নপত্র ফাঁস নয়, কোন ক্ষেত্রেই এই জাতির ভবিষ্যত ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পরিনতি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।।