ইদানিং আঁতেল শ্রেনীর অনেককেই বলতে শোনা যায় ’দেশ এগিয়ে চলছে।’ কথাটা শুনে মাঝে মাঝে ভাবতে হয় এগিয়ে চলা আসলে কাকে বলে। শামুকও এগিয়ে চলে, গরুর গাড়ীও এগিয়ে চলে আবার মোটরকারও এগিয়ে চলে। এখন তুলনা করা যায় কি যে কোনটি আসলে এগিয়ে চলে? গরুর গাড়ী ঘন্টায় বড়জোর ৪/৫ মাইল যায় অথচ মোটরগাড়ীর গতি কমপক্ষে তার দশগুন। দেখা যায় গরুর গাড়ী চালানোর জন্য কোন লাইসেন্স লাগেনা। কিন্তু মোটরকার চালানোর জন্য লাইসেন্স অত্যাবশ্যক। একটা দেশের এগিয়ে চলার বিষয়ে যদি গরুর গাড়ীর এগিয়ে চলার কথাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয় তবে সেটা কি প্রকৃতই এগিয়ে যাওয়া বলা যায়? বিষয়টি খোলসা করার জন্য নি¤œবর্নিত কিছু বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষন করা যেতে পারে।
দেশের প্রানভোমরা যেখানে সেই রাজধানীর কথাই ধরা যাক। এখানে কোন প্রশাসন, কোন সিস্টেম, কোন পরিকল্পনা কি কার্যকর আছে? সরকার আছে, আইন-শৃংখলা বাহিনী আছে, আমলা-ফয়লা, মন্ত্রী-সান্ত্রী আছে, কিন্তু এই শহরের বাসিন্দারা এইসব থাকার জন্য কোন সুবিধা কি পাচ্ছে? রাস্তায় এক ঘন্টার জায়গায় ৩/৪ ঘন্টা, লক্কড়-ঝক্কড় বাস ও অন্য যানবাহনের প্রানঘাতি অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে অবাধে। অথচ রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ আছে, যানবাহন বিষয়ক ’অথরিটি’ আছে। শহরে রাস্তাঘাট দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর নালা-নর্দমা, খানা-খন্দে ভরা, ড্রেনের আবর্জনার অসহনীয় দুর্গন্ধ, সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট ছয়লাব, সড়কের ওপর মোটরগাড়ীর বেপরোয়া পার্কিং, কোন রকম পার্কিংস্পেস ছাড়াই রাস্তার ওপর বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক-হাসপাতাল, শপিংমল ইত্যাদি কি এটা বোঝায় যে এই রাজধানী শহরে কোন কার্যকর ’অথরিটি’ আছে যারা এই শহরটিকে একটি সুশৃংখল, সুস্থ, শান্তিপুর্ন ও বাসযোগ্য শহর হিসেবে রক্ষনাবেক্ষন করছে?
এই দেশে কতশত নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহন করা হচ্ছে এবং বড় গর্ব করে বলা হচ্ছে ’দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে।’ অথচ ৯৮% প্রকল্প আঠারো মাসে বছর করে এক বছরের কাজ তিন চার বছর লাগাচ্ছে, শ’কোটি টাকার স্থলে হাজার কোটি টাকা খেয়ে ফেলছে। যতটা উন্নয়নখাতে ব্যয় হচ্ছে তার প্রায় ২৫% - ৩০% বিদেশে পাচার হচ্ছে। আইনসংগতভাবেই (??) কিছু ব্যক্তি/গোষ্ঠিকে পাবলিকের টাকা লোপাট করার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। বছরের পর বছর কুইক রেন্টাল নামের বিদ্যুতকেন্দ্রের মাধ্যমে নাকি তা করা হচ্ছে। অথচ সরকার আছে; তার বিভিন্ন মন্ত্রনালয় আছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রতিবছর বাজেটের অংক বাড়িয়ে বিরাট আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। কিন্তু এক টাকার কাজে একশ’ টাকা ব্যয়ের বিষয়ে কখনো তার বক্তব্য তো শোনা গেল না। বছর বছর যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে সে বিষয়েও তাকে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেবার প্রচেষ্টা লক্ষ্যনীয় হলো না। বরং তিনি চার/পাঁচ হাজার কোটি টাকা লুট-লোপাটকে ’সামান্য ব্যপার’ বলে শিবনেত্র হয়ে থাকাকেই পছন্দ করেছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপী লোন গোটা ব্যাংক ব্যবস্থাকে ছ্যারাবেরা করে ফেললেও তাকে তেমন উদ্বিগ্ন হতে দেখা গেলনা। খোদ রাস্ট্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেলেও তার ’সাড়া জাগতেই’ বছর পার হয়ে গেল।
খোদ এই শহরের উল্লেখযোগ্য ২৬/২৭টি খাল নালার অধিকাংশই দখল-ভরাটের কবলে শেষ হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বাইরে সারা দেশব্যপী নদী-নালা, সরকারী খাসজমি, রেলের জমি, বাড়ীঘর, বালু মহাল অবলীলায় দখল বেদখল হয়ে গিয়েছে বা যাচ্ছে। এমনকি গুরুত্বপুর্ন ব্রিজএর সন্নিকটেও অবাধে বালু তুলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঐ ব্রিজকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। এ বিষয়ে সব সরকারের আমলেই এইসব দখলদারদের ব্যাপারে হাতেম তাই-সুলভ উদারতা দেখানোয় কোন সরকারেরই অনাগ্রহ দেখা যায় নি। অথচ সরকারগুলো নাকি অবৈধ কর্মকান্ড প্রতিরোধ করার জন্যই আইন-আদালত স্থাপন করে; শান্তি-শৃংখলা বহিনী পুষে থাকে পাবলিকের কাছ থেকে আদায়কৃত ট্যাক্সের টাকায়।
দেশে পর্যটনের জন্য এত এত আকর্ষনীয় জায়গা থাকার পরও এই খাতে এই ৪৫/৪৬ বছরে কি উন্নতি সাধিত হয়েছে? এই পাশের দেশ সিংগাপুরে ৯০% পর্যটন স্পট কৃত্রিম, মানবসৃষ্ট। অথচ সেখানে মাসে প্রায় দশ লাখ পর্যটক গেলেও হাজার হাজার পর্যটন স্পট থাকা সত্বেও বাংলাদেশে বছরে পাঁচলাখ পর্যটক আসে কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তাহলে এখানে সরকারের ভুমিকাটা কি?
দেশের আইন-শৃংখলা বিষয়ে বোধহয় কিছু না বলাই ভাল। আইন যে কাদের প্রতি নির্মম আর কাদের প্রতি ’হাজি মহসিন’/হাতেম তাই’ সেটা তো দেশবাসী ইতিমধ্যে বেশ ভালভাবেই জেনে গেছে। দেশে যখন তথাকথিত ’নাশকতা’ এবং জিহাদী বই (??) রাখার দায়ে হাজার হাজার ব্যক্তিকে পাইকারী গ্রেপ্তার করে জেলে রাখতে হয়, সেই দেশ কিভাবে এগিয়ে চলে সেটা বেশ গবেষনার বিষয নয় কি?
দেশে ভয়াবহভাবে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির বিষয়ে এমনকি সরকারের গুরুত্বপুর্ন মন্ত্রীদেরকেও সময়ে সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। সরকারগুলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কখনো ’জিরো টলারেন্স’ কখনো ’জিহাদ’ ঘোষনা করে ক্ষমতায় আরোহন করে। কিন্তু সেই সব সরকারের মন্ত্রীরাই স্বীকার করেন যে তারা দুর্নীতিবাজ, চোর। সরকারের এমন কোন বিভাগ নেই যেখানে দুর্নীতি জাঁকিয়ে বসেনি। সাধারন মানুষের ট্যাঁকের পয়সায় যারা বেতন-ভাতা ভোগ করেন, আয়েসী জীবন যাপন করেন, তারাই সেই জনগনকে হীন প্রজা হিসেবে দেখেন। টাকা-পয়সা ছাড়া সরকারের কোন দপ্তর কাজ করানো প্রায় অসম্ভব। কেন, কিজন্য?
সরকার দেশের সকল নাগরিকের জন্য; নিশ্চয়ই কোন বিশেষ শ্রেনীর জন্য নয়। তাহলে সরকার ব্যবসায়ীদেও ন্যায্য অন্যায্য সকল দাবী অবলীলায় মেনে নিলেও যে কৃষক দেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড, সেই কৃষকের বৃহত্তর কল্যানের জন্য কোন পদক্ষেপ কি নিচ্ছে? ব্যবসায়ীরা তিন টাকার দ্রব্য তিরিশ টাকায় বেচতে পারলেও কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মুল্য কি পাচ্ছে? দেশের মোট জনসংখ্যার বড়জোর ৫% ব্যবসায়ীদের জন্য ৭০% জন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি সংসদে থাকলেও ৮৫% কৃষকের জন্য তাদের কোন প্রতিনিধি কি জাতীয় সংসদে আছে?্র সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্নতার দাবী করলেও যারা সেই খাদ্যের উৎপাদক, ব্যবসায়ীদের তুলনায় তাদের কল্যানের জন্য সরকার কি করে? আজও বহু প্রত্যন্ত এলাকায় কেবল যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে কৃষক তার ফসল পানির দামে বিক্রী করতে বাধ্য হয়। সামান্য একটা ব্রিজ-কালভার্টের জন্য তাদেরকে বাঁশের সাঁকো বা ডিঙ্গি নৌকা সম্বল করতে হয় অথচ বহু ফাঁকা জায়গাতে লিংকরোডবিহিীন শুধুমাত্র একটি ব্রিজ সরকারের উন্নয়নের দাবীকে যেন ব্যঙ্গ করতে থাকে। কেন? সরকারের বড় বড় বুলি সত্বেও অকালে বাঁধ ভেঙ্গে কৃষকের ফসল ডুবে ধ্বংস হয়ে যায় অথচ সেই বাঁধ রক্ষার দায়িত্বে যারা তাদেরকে কোন জবাবদিহি করতে হয় না। অসহায় কৃষকের আর্তনাদ বাতাসেই মিশে যায়।
যে দেশে কোন অবকাঠামো বিষয়ক প্রকল্প এক বছরের স্থলে ৪/৫ বছর পর্যন্ত লাগিয়ে দেয়, বরাদ্দের অংক কোন প্রশ্ন ব্যতিরেকে ক্রমাগতভাবে বাড়িয়েই চলে আর সরকার তা উদারভাবে অনুমোদন করে যায় সে দেশ কিভাবে ’এগিয়ে চলে?’ কিভাবে সে দেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হবে বলে গালগল্প করা হয়? যে দেশ সম্পর্কে কবি বলেছেন ’ধন-ধান্য পুষ্পে ভরা’, যা অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ তার সন্তানেরা, যার ’বুকভরা মধু’, সেই দেশকে উন্নত দেশে পরিনত করতে চার যুগ লেগে যেতে পারে? তাই যদি হয় তবে দেশে কি সত্যিই কোন সরকারের প্রয়োজনের বিষয়টি কি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে না? তাদের ও তাদেরঢাকবাজিয়েদের ’দেশ এগিয়ে চলেছে’ এই কথা কি চরম হাস্যকর হয়ে পড়ে না? কোন বিশেষ সরকার নয়, এদেশে সব সরকারই কি প্রকৃত উন্নয়ন বা উন্নয়নের গতি সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছে? তা যদি পেরে থাকে তবে তারা কি এই পাশের দেশ সিংগাপুর বা মালয়েশিয়ার কথা জানে না? একেবারে ধ্বংসস্তূপ থেকে ২৫/৩০ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে জার্মানী বা জাপানের কথা কি তারা জানে না? তাই বলতে হয় যে উন্নয়ন বা উন্নয়নের গতি আসলে কি সে সম্পর্কে আমাদের সরকারগুলোর আসলেই কোন ধারনা আছে, এটা কি প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে পড়ে না?