মুসলমানের ইবাদত
বেশ কিছুদিন আগে আফগানিস্তানের রনাঙ্গনফেরত এক সৈনিকের সাক্ষাৎকার দেখছিলাম ইউটিউবে। সাক্ষাৎকারগ্রহনকারী এক পর্যায়ে তাঁকে প্রশ্ন করলেন আফগানিস্তানে অবস্থানকালে কোন জিনিসটি তাঁকে সবিশেষ প্রভাবিত করেছে। উত্তরে তিনি একটি ঘটনার কথা বললেন।ঘটনাটি এ রকম –
আফগানিস্তানে তখন প্রচন্ড যুদ্ধাবস্থা।কিন্তু অদুরের মসজিদে নিয়মিত আযান শোনা যায়।সেদিন আবার আবহাওয়াও খুবই দুর্যোগপুর্ন।তাঁর তাই ধারনা ছিল সেদিন আর আযান শোনা যাবে না। এই দুর্যোগে কে বেরুবে ঘর থেকে? কিন্তু বিস্ময়ের সাথে তিনি শুনলেন যথাসময়েই সেই মসজিদ থেকে আযান ভেসে আসল। পরিবেশ পরিস্থিতি এতটা বিরূপ এবং ঝুঁকিপুর্ন হওয়া সত্বেও মসজিদ থেকে ঠিক সময়মত আযান দেওয়া হলো, এটা তার কাছে এক বিরাট বিস্ময় ছিল। তিনি পরে সেই মুয়াজ্জিনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেন এত বিপদ ও দুর্যোগ মাথায় নিয়ে তিনি বাড়ী থেকে বেরিয়ে মসজিদে গেলেন এবং আযান দিলেন।তিনি উত্তরে বললেন আল্লাহর এবাদতে আহ্বান জানানোর যে দায়িত্ব তাঁর উপরে আছে, তা তিনি কোন ভাবেই এড়াতে পারেন না; এতে তাঁর যাই হোক না কেন। একজন মুসলমানের এই নিষ্ঠা দেখে তিনি ইসলামের ফিতরাতের প্রতি প্রচন্ড আকর্ষণ বোধ করেছিলেন। অতঃপর ঐ সৈনিককে প্রশ্ন করা হ’ল যে ইসলাম যদি তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করে থাকে তবে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলেন না কেন। উত্তরে তিনি বললেন সাধারনতঃ মুসলিমদের আচার ব্যবহার ও অভ্যাস দেখে তিনি ঐ চিন্তা করেন নি। তাঁর বক্তব্যঃ তিনি কর্মে মুসলিম, তবে ধর্মে নয়।
উপরের ঘটনা থেকে কি মনে হয়?
একজন মুসলমানকে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে আল্লাহর একত্ববাদে এবং হজরত মুহাম্মদ (দঃ)যে শেষ নবী ও রসুল তাতে নিরঙ্কুশ বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়; যাকে ’ইমান’ বলে। নীচের বাক্যটি (কলেমা) পাঠ, বিশ্বাস ও আমল করলে তাকে ইমান বলে। যথা –
আমানতু বিল্লাহি কামাহুয়া বিআসমায়িহি ওয়া সিফাতিহি ওয়া ক্কাবিলতু জামিয়া আহকামিহি ওয়া আরকানিহি। অর্থাৎ আমি বিশ্বাস স্থাপন করলাম আল্লাহর উপর, তার সকল নাম ও গুনাবলীর উপর এবং তাঁর সকল হুকুম আহকামের উপর।
তাকে আরো বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় –
আমানতু বিল্লাহি ওয়া মালায়িকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রাসুলিহি ওয়াল ইয়াওমিল আখেরে ওয়াল ক্কাদরে খায়রিহি ওয়া শাররিহি মিনাল্লাহে তা’লা ওয়াল বা’ছে বা’দাল মাওত।
অর্থাৎ আমি বিশ্বাস স্থাপন করলাম ফিরিশতাদের উপর, আসমানী কিতাবসমূহের ওপর, রসুলগনের ওপর, কিয়ামত ও শেষ বিচার দিনের ওপর আর বিশ্বাস স্থাপন করলাম যে ভাগ্যলিপির ভাল মন্দ আল্লাহর পক্ষ হতে আসে এবং পুনরুত্থান দিবসের উপর (যে দিন প্রত্যেককেই তার জীবৎকালে কৃত কৃতকর্মের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ দিতে হবে)। এরপর মুসলমানকে আরো স্বীকার করতে হয় যে –
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ও রসুল। এর প্রকৃত অর্থ যে একজনকে মুসলমান হতে হলে তাকে আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে উপাস্য বা প্রকৃত মনিব বলে স্বীকার করা যাবে না। যারা উপরোক্ত বিষয়গুলির উপর অকুন্ঠ বিশ্বাস এনছেন তারা এক আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। আর এই দাসত্ব স্বীকার করার পর যিনি প্রভু, তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করার নামই ‘ইবাদত।” এখন এই ‘ইবাদত” বস্তুটি আসলে কি? ইবাদত শব্দটির মুল ‘আব্দ’ যার অর্থ বান্দা বা দাস। সুতরাং মহান স্রষ্টা তথা আল্লাহ সুবহানাহু তা’লার সাথে মানুষ বিশেষ করে মুসলমানের সম্পর্ক মনিব/প্রভু এবং দাসের। তো সেই ইবাদতের বিষয়বস্তুগুলি কি তা আল্লাহ সুবহানাহু তা’লার বানী পবিত্র গ্রন্থ কোরআনের মাধ্যমে এসেছে। আর সেই পবিত্র গ্রন্থের দ্বিতীয় বাক্যটিতেই বলা হয়েছে যে এটা এমনই এক কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই। এবং যারা মোত্তাকী (আল্লাহভীরু) তাদের জন্য (এটি) সঠিক পথপ্রদর্শক।
অতএব যারা ইমান এনেছেন এবং সেই সুত্রে নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী করেন, তাদের জন্য মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা জীবনে চলার পথে বহু কিছুর নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই নির্দেশনাগুলি এসেছে ঐ পবিত্র ঐশী গ্রন্থ কোরআনের মাধ্যমে।আর সেই সকল নির্দেশনাবলী পালন কিভাবে করতে হবে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা রসুল (দঃ)এর হাদিস মারফত ইমানদারগনের কাছে এসেছে।
এখানে দুটি জিনিসকে অতি গুরুত্বপুর্ন বলে বিশ্বাস করতে হবে। মুসলমানরা সবাই জানেন, মানেন এবং দাবী করেন যে তারা ইসলামের অনুসারী।’ইসলাম‘ শব্দটির মুল শব্দ ‘সালাম’ এটা তো সবাই জানেন। এই শব্দটির দুটি অর্থের একটি ‘শান্তি’ এবং অপরটি ‘আত্মসমর্পন’।তো ইসলাম আল্লাহর কাছে সম্পুর্নভাবে আত্মসমর্পন করা। একজন মুসলমানকে তাই উভয় অর্থটিকেই পরিপালন করতে হবে। সেই বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা এরশাদ করছেন -
”হে ইমানদারগন, আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের নির্দেশ মান্য কর; এবং শোনার পর তা থেকে বিমুখ হয়ো না।” (২০:৮)
সকল প্রকৃত মুসলমানই স্বীকার করেন ইসলাম একটি সম্পুর্ন জীবন ব্যবস্থা/বিধান। যদি তাই হয়, তবে উপরোক্ত নির্দেশনা মানতে গেলে কেবল যে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে তাই নয়, জীবনের অন্যান্য যে সকল কর্তব্য কর্ম পালনীয়, সেগুলোকেও পালন করতে হবে।তো আল্লাহ তাঁর প্রতি সম্পুর্ন আনুগত্য করার পর প্রথমতঃ সালাত প্রতিষ্ঠা করা এবং সামর্থ্যবানদের জাকাত দান করার আদেশ দানের পরপরই প্রধানতঃ কতিপয় নির্দেশ প্রদান করেছেন।
যথা –
১. পিতামাতার প্রতি আনুগত্য করা এবং তাঁদের প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাবনত থাকা; বিশেষ করে মাতার প্রতি অধিক ভক্তিমান হওয়া(৮৩,২১৫:২; ৩৬:৪; ২৩:১৭; ৮:২৯; ১৪:৩১)
২. অপরের হক/সম্পদ নষ্ট না করা; অসদুদ্দেশ্যে ঘুষ প্রদান না করা (১৮৮:২)
৩. এতিমের হক/সম্পদ নষ্ট/অত্মসাৎ না করা (১৭৭, ২২০:২; ১০:৪))
৪. সত্য সাক্ষ্য দেওয়া, মিথ্যা না বলা (৮:৫)
৫. মাদক গ্রহন, জুয়া, ভাগ্য গননা, প্রতিমা পূজা না করা (৯০:৫)
৬. ওজনে কম না দেওয়া/বেশী না নেওয়া (৩৫:১৭; ৯:৫৫; ৮৫:৭; ১-৪:৮৩)
৭. মজুতদারী না করা; সোনা-রূপা ও সম্পদ মজুদদারী না করা (৩৪,৩৫:৯)
৮. মুনাফেকি (মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা ও আমানতে খেয়ানত করা) না করা (১৪৫:৪)
৯. পরনিন্দা/গীবত না করা (১২:৪৯; ১:১০৪)
১০. সুবিচার করা (৫৮,১৩৫:৪)
১১. অংশীদারদের (ভাই-বোন ও নিকটাত্মীয়) হক নষ্ট না করা (৭:১১,১২,১৯)
প্রশ্ন হচ্ছে এসব কিছুর বিষয়েই পবিত্র কুরআন শরীফের মাধ্যমে নির্দেশনা এসেছে।কিন্তু মুসলমান কি এগুলো পালন করার ব্যাপারে আন্তরিক? এখন উপরোক্ত বিষয়গুলি পারিবারিক ও সমাজ জীবনে শান্তি ও শৃংখলা প্রতিষ্টা করার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন। কিন্ত মুসলমান আজ ওসব কিছুই বাদ দিয়ে কেবল নামাজ-কালাম, জিকির-আজকার নিয়ে বসে আছে বলেই সমাজদেহে নানা রকম ব্যধি বাসা বেঁধেছে। উপরোক্ত সব কিছুর ৯০% কিন্তু অমুসলিম দেশগুলোতে কার্যকর করা হয়েছে, যে কারনে তাদের দেশে ঘুষ-দুর্নীতি, ঠকবাজি, পরস্বপহরন, নোংরামি-অপরিচ্ছন্নত্, খাদ্যে ভেজাল ইত্যাদি নেই। অথচ এসব গুনাবলীর সব কিছুই মুসলমানদের মধ্যে থাকার কথা; কারন মুসলমানদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলে আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা উল্লেখ করছেন এজন্যই যে --
”তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ দান করবে এবং অসৎ কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে।” (১১০:৩)
উপরোক্ত ‘শ্রেষ্ঠ উম্মত’ মুসলমান কিভাবে হতে পারে যদি আল্লাহ সুবহানাহু তা’লার সকল আদেশ-নিষেধ এবং নির্দেশ-নির্দেশনা পরিপালন করতে না পারে বা না করে?
প্রকৃতপক্ষে মুসলমান যখন ভাল কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে বাধা দেবার ইচ্ছা, তাগিদ বা সাহস হারিয়ে ফেলবে তখন কি তারা ‘শ্রেষ্ঠ উম্মত’ হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে? এমন অবস্থায় কি ভাল এবং সৎ মানুষ সমাজে টিকে থাকতে পারবে যেমন আজকের দিনে দেখা যাচ্ছে? ইসলাম তো কেবল নিজের গা বাঁচানোর ধর্ম নয়; ইসলামের অনুসারীদের তো বলা হয়েছে একটি সমগ্র শরীরের মত, যার কোন এক জায়গাতে আঘাত লাগলে সারা শরীরেই তার ব্যথা অনুভুত হয়।এই ’গা বাঁচানো’র আত্মঘাতি প্রবৃত্তিই কি মুসলমানদের সকল জাগতিক দুর্গতির কারন হয়ে দাঁড়ায় নি?আজ দিকে দিকে মুসলমান জুলুমের শিকার হলেও তাদের পাশের মুসলমান তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে না। দুরে থেকে গা বাঁচিয়ে চলছে।
একজন দাসের কাজ মনিব/প্রভুর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। কিন্তু মুসলমান আল্লাহ সুবহানাহু তা’লার বান্দা/দাস হয়েও কি তার মনিবের আদেশ-নিষেধ মেনে চলছে? এ বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা যে কঠোর ভাষায় এরশাদ করেছেন তা এই ---
” যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ন করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই কাফের। . . . .তারাই জালেম। . . . তারাই পাপাচারী। (৪৪,৪৫,৪৭:৫)
মুসলমান যদি আল্লাহ সুবহানাহু তা’লার নির্দেশনা সম্পুর্নভাবে পালন না করে তবে তাদের সম্মন্ধে আরো এরশাদ হচ্ছে ---
“তবে কি তোমরা এই গ্রন্থের কিয়দংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোন পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে বেখবর নন।” (৮৫:২)
আজ মুসলমান যে বিশ্বের চারিদিকে নানা রকম দুর্দশা ও দুর্গতির শিকার হচ্ছে তা কি উপরোক্ত কারনে নয়?
’কুফর’ শব্দের অর্থ অস্বীকার করা। তো সেই অর্থে যারা কুরআনে বর্নিত আদেশ-নিষেধ, নির্দেশ-নির্দেশনাকে অস্বীকার করে, তারাই কি কাফের নয়? আল্লাহর দেওয়া বিধানকে অস্বীকারকারীদের সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে---
”কাফেররা যেন মনে না করে যে আমি যে অবকাশ দান করি তাদের জন্য তা কল্যানকর।। আমি তাদেরকে অবকাশ দেই যাতে তারা পাপে উন্নতি (?) করতে পারে। বস্তুতঃ তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (৭৮:৩)
আরো এরশাদ হচ্ছে ---
”বস্তুতঃ যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে আমার আয়াতসমূহকে, আমি তাদের ক্রমন্বেয়ে পাকড়াও করব এমন জায়গা থেকে যার সম্পর্কে তাদের ধারনাও হবে না। বস্তুতঃ আমি তাদের ঢিল দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে আমার কৌশল সুনিপুন।” (১৮২,১৮৩:৭)
সারা দুনিয়ার দিকে দৃষ্টি ফেরালে আমরা আজ কি দেখতে পাচ্ছি? পৃথিবী আজ নানা রকম রোগে রুগ্ন হয়ে পড়েছে। টর্নেডো, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, ভুমিকম্প, সুনামি, দাবানল, ভুমিধ্বস, খরা, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি প্রকিৃতিক দুর্যোগ, সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু, করোনা ইত্যাদি মহামারী কি আজ বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে ফেলেনি? এ থেকে কি মুসলমানের শিক্ষা নেবার সময় পার হয়ে যাচ্ছে না?
No comments:
Post a Comment