মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি জাপান সফরে গিয়ে বাংলাদেশকে জাপান বানানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন যা শুনে যেমন খুবই ভাল রাগল তেমনি কয়েকটি প্রশ্ন জাগল মনে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্ভবতঃ ভুলে গেছেন যে জাপানীরা কখনো রাতে ভোটের প্রহসন করেনি। জাপানে প্রধানমন্ত্রী পেছন দরজা দিয়ে ভোট করে গালগল্প করবেন যে মানুষ তাকে ’বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে’- এটা তারা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না। তারা এটা কল্পনা করতে পারে না যে দেশের সাধারন পাবলিকের টাকায় পোষা আইন-শৃংখলা বাহিনী কোন বিশেষ দলের পাইক-বরকন্দাজ হিসেবে কাজ করবে আর ভোটের বাক্স ভোটের আগের রাতেই ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ভরে ফেলবে। পরের দিন মানুষ যাতে ভোট কেন্দ্রেই যেতে না পারে তার জন্য যা কিছু করার করে রাখবে।
তাদের আত্মসম্মানবোধ তুলনাহীন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভুলে গেছেন জাপানে একবার একটি বিমান দুর্ঘটনার দায় নিয়ে বিমানমন্ত্রী নিহতদের স্বজনদের কাছে ক্ষমা চেয়ে কেবল পদত্যাগই করেন নি; আত্মহত্যা করেছিলেন। আর তাঁর মন্ত্রীসভার এক গুরুত্বপুর্ন সদস্য বেপরোয়া বাস চালকের হাতে দু’জন শিক্ষার্থী প্রান হারালে তিনি দন্ত বিকশিত করে বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রতি বছর লঞ্চডুবিতে শত শত লোক বেঘোরে মারা গেলেও তার কোন বিবেকদংশন বোধ হয় নি।
জাপানে দুর্নীতি বিষয়টি প্রায় অজানা। আর বাংলাদেশে দুর্নীতি বিষয়টি দেশের নামের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঘুষখোরী তাদের কাছে একটা ঘৃন্য ব্যাপার। আর বাংলাদেশে সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন প্রায় তিনগুন করারপরও তাদের ঘুষখোরী প্রায় লেজেন্ডারী মাপের। জাপানে ব্যাংক থেকে খাণ নিয়ে কেউ তা ফেরত না দেবার কথা হয়ত কল্পনাও করে না। আর এই দেশে খাণখেলাপীদেরকে রাস্ট্র ’প্রণোদনা’ দিয়ে থাকে তা ফেরত না দেবার জ্ন্য। তাছাড়া একটি উন্নয়নশীল (?) দেশ হওয়া সত্বেও এই দেশ থেকে যেভাবে বিদেশে টাকা পাচার হয়, এমনকি রাস্ট্রীয় ব্যাংক থেকে যে টাকা চুরি হলো, সেটা জাপানে কল্পনা করা যায়?
তাদের সততা ও সত্যবাদিতার কোন তুলনা হয় না। জাপানে কোন মন্ত্রী জনগনকে কখনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এটা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুজলেও মিলবে না। আর এদেশে রাজনীতি মানেই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া। যে যতটা দক্ষতা ও চাতুর্য্যরে সাথে এটা করতে পারে তিনি ততটাই ঝানু রাজনীতিক।
জাপানীরা সময়ের মুল্য যেভাবে দেয় তার সম্পুর্ন বিপরীত চিত্র এই বাংলাদেশে। এখানে সময় ও মানুষের জীবন সবচেয়ে সস্তা। তাদের কোন প্রকল্প বরাদ্দ বাজেট ও মেয়াদের চেয়ে এক টাকা বা এক ঘন্টাও বেশী হয় না। আর আমাদের দেশে প্রকল্পের মেয়াদ ও বাজেট বাড়েনি এমন প্রকল্প কল্পনা করা যায় না। তারা বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহন করে জনগনের সুখ-সুবিধা কতটা বাড়বে সেই ভাবনা থেকে। আর আমাদের প্রকল্প গ্রহন করা হয় কতটা কিকব্যাক আসবে সেই ভাবনা থেকে। দু’পাশে কোন রাস্তা নেই অথচ বেশ সাইজের একটা কালভার্ট নির্মান করা হয়েছে - এটা জাপানে সম্ভবতঃ যাদুঘরেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারা নিজেদের সুখ-সুবিধা বাড়ানোর আগে জনগনের সুখ-সুবিধা বাড়ানোর জন্যই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। আর বাংলাদেশে ’আপনা বাঁচলে বাপের নাম’ - এটাই নীতি। আগে নিজের পকেট ভরো তারপর অন্যেরটা চিন্তা ক’রো। কত বড় লজ্জার বিষয় যে গরীব মানুষের রিলিফের চাল এখানে জনপ্রতিনিধি (?) নামক বাটপাড়দের ঘরে আগে ওঠে আর সরকার তার নামকা ওয়াস্তে বিচারের প্রহসন করে থাকে। এটা জাপানে কেউ চিন্তা করতে পারে?
জাপানীরা কতটা সৌজন্যবোধের অধিকারী সেটা তারা এই দেশেও বিভিন্ন সময়ে প্রমান করেছে। তারা কেউ কাউকে অসম্মান করে অপমান করে কথা বলা মনেও আনতে পারেনা। আর আমাদের নেতারা বিরোধীদের ব্যক্তিগতভাবে গালাগালি না করে, তাদের বাপদাদার শ্রাদ্ধ করে কথা বলতেনা পারলে দলে তার মানই থাকে না। বিরোধীদের গালাগালিতে যে যত বেশী পটু, তার মর্যাদা দলনেতা-নেত্রীর কাছে ততটাই বেশী।
সর্বোপরি জাপানীরা তাদের দেশকে যতটা ভালবাসে তার তুলনায় এদেশের মানুষ যে কতটা দেশপ্রেমিক তা তাদের দৈনন্দিন কাজেকর্মে প্রমানিত। বিশেষ চেতনার নাম করে হেন অপকর্ম নেই যা এরা করে না। জাপানীদের সৌন্দর্যপ্রিয়তা বিশ্ববিদিত। তারা দেশকে একটা ফুলবাগান করে রেখেছে। আর আমাদের দেশের মানুষের স্বভাব হচ্ছে যা কিছু সুন্দর আগে তার দফারফা করা। রাস্তাঘাটে, বাস-ট্রেন স্টেশনে বা অন্য পাবলিক প্লেসে ময়লা আবর্জনা ছড়িয়ে রাখা তারা চিন্তাও করতে পারে না। আর আমাদের দেশে ময়লা-আবর্জনা এমনকি ঘরের পাশের নর্দমাও ভর্তি করে রাখলেও আমাদের কোন বিকারবোধ হয় না।
জাপানীরা দেশের আইনের প্রতি যে রকম শ্রদ্ধাশীল, আমরা দেশের আইনের প্রতি তার চেয়ে অধিক পরিমানে অশ্রদ্ধাশীল। তারা আইন মেনে আনন্দ পায় আর আমরা আইন ভেঙ্গে কেবল আনন্দই পাই না, বরং বিরাট গর্ববোধ করি। আমাদের আইন প্রণেতারাই আইনের মাথায় পা দিয়ে চলতেই ভালবাসেন। তাদের ধারনা আইন যদি ভাঙতেই না পারি তবে আর ক্ষমতার দাপট দেখাবো কিভাবে?
তো আরো অনেক বিষয় আছে যা বাংলাদেশী জাপান প্রবাসীরা ভাল জানে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁর দেশকে জাপান বানানোর কথা বলেছেন তখন এসব বিষয় মনের কোনে জেগে উঠেছে। বস্তুতঃ পিঠে একাধিক কুঁজ নিয়ে চিত হয়ে শোবার হাস্যকর চেষ্টার মতই মনে হয়েছে। তবে উপরে যা বলা হয়েছে তা যদি সত্য না হয় তবে নিশ্চয়ই এ অধম ক্ষমাপ্রার্থী। --- ৩১/৫/২০১৯ইং
No comments:
Post a Comment