Tuesday, December 20, 2016

জমির ব্যবহার ্ও আমাদের করনীয়

প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ নিয়মিতভাবে জাতীয় দৈনিকগুলির পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে। সেই সংগে ”নিরাপদ সড়ক চাই” – এ বিষয়ে সভা-সমাবেশ-সিম্পোজিয়াম্ও সমান তালে চলছে। আসলে সভা সিম্পোজিয়ামের চেয়ে কাজ যে অনেক বেশী গুরুত্বপুর্ন সে কথা আমাদের অনেকেই বুঝতে চান না যার ফলে আমরা যা চাই তা খুব কমই পেয়ে থাকি। 
আসরা সবাই চাই আমাদের এই ঢাকা নগরটা ”তিলোত্তমা” হোক। একথা শুন্ওে আসছি বোধ হয় এক যুর্গেও বেশী দিন থেকে। কিন্তু তিলোত্তমা দুরে থাক, অনেকেই বলছেন যে ঢাকা শহর অচিরেই বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। কেন? কারন আর কিছুই নয়। কারন আমাদের কাজের চেয়ে কথা অনেক অ-নে-ক বেশী। 
আমরা জানি যে আমদের এই ছোট্ট দেশটায় জমির পরিমানের চেয়ে লোকসংখ্যা বহুগুনে বেশী। কিন্তু আমরা কি সে বিষয়ে কখন্ও চিন্তা ভাবনা করে দেখেছি? অথচ জমির ব্যবহার ্ও অপব্যবহারে আমাদের তুল্য কেউ বোধহয নেই। যে সব দেশ অনেক জমির মালিক, তার্ওা উপরের জমির ব্যবহার সীমিত করে মাটির নীচের জমি কাজে লাগাচ্ছে। কারন তারা জানে যে মাটির নীচে ঘরবাড়ী দোকানপাট নির্মান করা গেল্ওে কোন খাদ্য-শষ্য আবাদ করা যাবেনা। আর আমরা উদারভাবে উপরের জমির চরম অপব্যবহার করেই চলেছি। নীচে কয়েকটি উদাহরন দ্ওেয়া যেতে পারে। 
১. আমরা আমাদের লোকসংখ্যার তুলনায় জমির পরিমান শোচনীয়ভাবে কম এ কথা জানা সত্ব্ওে হাজার হাজার একর জমি প্লট করে বিক্রী করার অবাধ সুযোগ দিচ্ছি। জমি ব্যবহারে আজ পর্যন্ত কোন নীতি আমরা তৈরী করতে পারলাম না। যে হারে চাষযোগ্য জমি অপব্যবহার হচ্ছে তাতে হয়ত অচিরেই আমরা তীব্র খাদ্যসংকটের মধ্যে পড়ব।
২. আমরা রাস্তার উভয় পাশে নিরবিচ্ছিন্নভাবে দোকানপাট, টংঘর ইত্যাদি গড়ে উঠতে দিচ্ছি। এমনকি হাই্ওয়ে পর্যন্ত এরকম নিরবিচ্ছিন্ন দোকানপাট, টংঘর বানিয়ে দোকান বসানো অবাধে চলছে। অথচ বিশ্বে কোথ্ওা হাই্ওয়ের পাশে দোকান বসানোর কোন উদাহরন একমাত্র কোন অসভ্য দেশ ছাড়া প্ওায়া যাবেনা। 
৩. এই রকম নিরবিচ্ছিন্ন দোকানপাট, টিনের ছাপড়া, টংঘর প্রভৃতি বসানোর ফলে রাস্তায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। অসংখ্য আদম সন্তান অকালে ভবলীলা সাংগ করছে আর আমরা সভা-সেমিনার করেই আমাদের দায়িত্ব পালন করে আত্মতুষ্টি লাভ করছি॥ 
৪. যেখানে যত পুকুর, নালা, ডোবা ছিল সেগুলো ভরাট করে দোকানপাট, বাড়ীঘর তৈরী করছি আর একদিকে জলাবদ্ধ হয়ে অপর দিকে বাড়ী হেলে পড়ে বা ধ্বসে গিয়ে নিজের এবং অপরের জীবন ধ্বংস করছি। 
এসব অব্যবস্থা ্ও অদুরদর্শী কর্মকান্ড ত্যাগ করে আমরা সুচিন্তিত সুপরিকল্পনার মাধ্যমে এই শহরটিই নয়, পুরো দেশটিকে একটি সুন্দর দেশ গড়ে তুলতে পারি। সে জন্য নীচে কয়েকটি সুপারিশ ভেবে দেখার জন্য সকলকে সবিনয়ে অনুরোধ করছি। 
ক. প্লট করে জমি বিক্রীর চিন্তা মাথা থেকে সম্পুর্ন ঝেড়ে ফেলতে হবে। বরং ৬৫০ থেকে ১৭৫০ ব.ফু.-এর ফ্ল্যাট বিশিষ্ট পনের/ষোল তলা এ্যাপার্টমেন্ট ভবন তৈরী করে বিত্তভেদে (উচ্চ, নিম্ন, মধ্য ্ও নিম্নবিত্ত) দরকার হলে হায়ার পারচেজ ভিত্তিতে বিক্রী/বরাদ্দ করা যেতে পারে। 
খ. রাস্তার পাশে দোকানপাট বানাতে দিয়ে মুফতে পয়সা কামানোর লোভ ত্যাগ করতে হবে। রাস্তার পাশে অন্তত: পনের ফুট জায়গা খালি রেখে সমান্তরালভাবে কমপক্ষে পনের ফুট প্রশস্ত ঘাসের জমি রাখতে হবে যার মধ্যখান দিয়ে চার ফুট সিমেন্টে বাধানো ফুটপাথ থাকবে। ঐ চার ফুট সিমেন্ট বাঁধানো ্ফুটপাথের নীচ দিয়ে ড্রেন নির্মান করতে হবে। রাস্তার সাইডে রেইন-্ওয়াটার চ্যানেল থাকবে যাতে বৃষ্টির পানি সহজে রাস্তা থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। 
গ. এই রকম দুরত্বে রাস্তার উভয় পাশে পাচ/ছয় তলা শপিং মল বা শপিং সেন্টার বানানো যেতে পারে যাতে নীচের তলায় রড, সিমেন্ট, হার্ড্ওয়ার প্রভৃতি ভারী মালপত্রের দোকান থাকবে এবং উপরে অন্যান্য পন্যের দোকান থাকবে। এরকম প্রত্যেক শপিং সেন্টারের নীচে অন্তত: দুই তলা পার্কিং প্লেস থাকবে। এই সব শপিং সেন্টার একটার থেকে আর একটার দুরত্ব এক কিলোমিটার বা এর কাছাকাছি হতে পারে। রাস্তার উভয় পাশের শপিং সেন্টারগুলি দু’তলা বা তিনতলা লেভেলে উপর দিয়ে সংযুক্ত করলে রাস্তা পারাপারের বিপদের ঝুক্ওি অনেকাংশে কমে যাবে। টংগী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত মেইন রোডের পাশেই লাগাতার দোকানপাট থাকার কারনেই রোড ডিভাইডার অহেতুক হয়ে পড়েছ্;ে কারন এক মাইলের মধ্যেই বোধহয় ১২/১৪টা জায়গায় কাটতে হয়েছে। এখান দিয়ে হরদম লোক যাতায়াতের কারনে যানবাহন চলাচলে যেমন গুরুতর বিঘœ ঘটছে তেমনি মানুষের জানমার্লেও বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। এরকম শপিং সেন্টার হলে লোকের রাস্তা পারাপারের পয়েন্ট অনেক কমে আসবে। তাতে যানবাহন চলাচলে গতি আসার সংগে সংগে জানমালের ক্ষতির আশংক্ওা কমে যাবে। 
 ঘ. এক তলা দু’তলা কোন বাড়ী না রেখে মেইন রোড থেকে অন্তত: ১৫/২০ ফুট দুরে পুর্বোক্তভাবে কমপক্ষে ১০/১২ তলা এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরী করা উচিত যাতে প্রত্যেক ফ্লোরে কমপক্ষে ১০টি ফ্ল্যাট থাকে। এইসব বিল্ডিং-এর নীচে প্রয়োজন অনুসারে দুই থেকে তিন তলা বেসমেন্ট থাকবে পাকিং-এর জন্য। এভাবে বসবাসের জন্য জমির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করলে গাছপালা লাগানোর জন্য যথেষ্ঠ জায়গা খালি প্ওায়া যায়।
ঙ. ্ওইসব খালি জায়গায় ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ব.ফু. এরিয়া বিশিষ্ট পুকুর তৈরী করা যেতে পারে যেগুলি মাছ চাষের সুযোগ সৃষ্টি করা ছাড়্ওা বর্ষাকালে পানি সংরক্ষনাগার হিসাব্ওে কাজ করবে। ্ওইসব পুকুরের মাটি দিয়ে ছোট ছোট টিলা তৈরী করা যাবে যাতে বিভিন্ন ফুলজ, ফলজ ্ও বনজ গাছপালা লাগানো যাবে যা আমাদের বিষময় পরিবেশকে অনেকটা দূষণমুক্ত করব্।ে কেবল তাই নয়; ঢাকা শহর অচিরেই যে গুরুতর পানীয়জল সংকটে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন যে ভূ-উপরিস্থ পানি আমাদেরকে পেতেই হবে যদি আমরা তীব্র পানীয়জল সংকট এড়াতে চাই। 
প্রকৃতপক্ষে কেবল আব্দুল্লাপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যšত, এমনকি শহরের অন্যান্য এলাকায়্ও, একটানা রাস্তার ধারে যে কাচা-পাকা-টিনের দোকান ্ও টংঘর বসানোর সুযোগ দ্ওেয়া হয়েছে তাতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। উপরে বর্নিত শপিং সেন্টার বানাতে পারলে আমরা যে রকম ঢাকা শহর চাই তার অনেকখানিই পুরন হবে বলে দৃঢ় আশা করা যায়। হ্যাঁ, একটি বিষয় সমস্যা বোধ হতে পারে। লোকজন তাদের বর্তমান অবস্থান থেকে সরতে চাইবে কি না। এবিষয়ে আমাদের জনপ্রতিনিধিরা ্এবং স্থানীয় নেতারা গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখতে পারেন। আমরা তো দেখলাম বিশ্বকাপ ক্রিকেট দেখতে আসা মানুষের মধ্যে ”নতুন ঢাকাইয়া সিংগাপুর” দের্খাও ইচ্ছ্ওা কম প্রবল ছিলনা। সুন্দর জিনিষ আমরা সবাই চাই। তাই সাধারন মানুষকে রেড্ওি, টিভি এবং অন্যান্য মাধ্যমে মোটিভেশন করতে হবে; তাদেরকে এই ব্যবস্থার উপকারিতা বোঝাতে পারলে তাদের আপত্তি থাকবেনা বলেই আশা করা যায়। আর এই বিরাট কাজে সরকারী বেসরকারী অংশগ্রহনের ভিত্তিতে সহজে করা সম্ভব বলেই আমার ধারনা। এতে সংশ্লিষ্ট সবার লাভ। এতে যারা রিয়াল এস্টেট ব্যবসায়ে আছেন তারা, বানিজ্যিক ব্যাংকগুলি বিপুল ব্যবসা করতে পারে। পাশাপাশি সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সাথে সাথে ব্যয়িত অর্থ সমবন্টনের সুযোগ্ও করে দিতে পারে॥ সেই সাথে আমরা যে পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে অবস্থান করছি র্তাও অনেকখানি ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারে। বস্তুতঃই এই চিন্তাকে বাস্ত-বায়ন করতে পারলে যে কতদিকে আমরা লাভবান হবো তা যারা একটু দুরদৃষ্টিসম্পন্ন তারা সহজেই বুঝতে পারবেন। 

No comments:

Post a Comment