Monday, August 29, 2016

মনোলগ ১ - আমাদের প্রতিরক্ষা
অতীত ইতিহাস নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি। মনে পড়ে ইতিহাসে বহু রাজ্য-সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের ইতিহাস। যে কোন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা গেছে সংশ্লিষ্ট সেনাবাহিনীর সদস্যদের অদম্য সাহস, আত্মোৎসর্গের মানসিকতা, সুদৃঢ় নৈতিক মান, কঠোর, নিরলস, কঠিন ও কষ্টসাধ্য এক্সারসাইজ, কঠিন ও কঠোর পরিস্থিতিতে তাঁবুতে বাস, অস্ত্র চালনায় নিরন্তর দক্ষতা অর্জনের একান্ত চেষ্টা ইত্যাদি। এসব কারনেই সেই সময়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের তুলনায়  বিশালাকারের সেনাবাহিনীকেও তারা পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। দিগ¦জিয়ী স¤্রাট আলেকজান্ডারের জীবনী পড়ে জেনেছি কিভাবে তিনি মাত্র ৩৫,০০০ সৈন্য নিয়ে পারস্য সম্রাট দারায়ূসের ১,৫০,০০০ সেনার বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। জেনেছি কিভাবে লিওনিডাস মাত্র ৩০০ সৈন্য নিয়ে থার্মোপাইলিতে পারস্য সম্রাট জারক্সেসের ১,৫০,০০০ সৈন্যকে রুখে দিয়েছিলেন। জেনেছি মাত্র ৩৫,০০০ সৈন্য নিয়ে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ ইয়ারমুক যুদ্ধে প্রায় দুই লক্ষ রোমান সৈন্যকে পরাজিত করেছেন। জেনেছি মাত্র ১৫,০০০ সৈন্য নিয়ে কিভাবে ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মোহাম্মদ বাবুর ইব্রাহিম লোদীর ১,৫০,০০০ সৈন্যকে পানিপথের ১ম যুদ্ধে পরাজিত করেছেন। আবার সেই মুসলমানদেরকে দেখা গেছে ৫০,০০০ সৈন্য নিয়ে ক্লাইভের মাত্র ৩০০ সৈন্যের কাছে কিভাবে তারা পরাজিত হয়ে বাংলার স্বাধীনতাকে ইংরেজ বেনিয়াদের হাতে তুলে দিয়েছে।
এসবের মুল কারন খুজতে গিয়ে একটা বিষয় বোঝা গেছে। সৈন্যদের জীবন আর সিভিল নাগরিকদের জীবন একরকম নয়। বিশাল সাম্রাজ্য পতনের আগে দেখা গেছে তার সৈন্যবাহিনী নাগরিক সুবিধা আরাম আয়েশ ভোগ করতে করতে একসময় শান্তিপুর্ন আরামদায়ক আয়েসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেকের হয়ত মধ্যপ্রদেশের পরিধিও যথেষ্ঠ বেড়ে গেছে। ফলে যখন ক্ষিপ্রতা ও কৌশলের অত্যন্ত প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তখন তাদের ভুঁড়ি সামলাতেই হয়রান হতে হয়েছে; যুদ্ধ করবে কিভাবে? এর প্রকৃষ্ট উদাহরন দেখা যায় বাংলায় সম্রাট শাহজাহানের ২য় পুত্র সুজা এবং ৩য় পুত্র আওরঙ্গজেবের যুদ্ধকৌশল ও সামরিক তৎপরতার পার্থক্য দৃষ্টে। মোগল সেনাপতির আগমনের খবর পেয়েই বিলাসব্যসনে নিমজ্জিত সুজা তাড়াড়াড়ি রাজধানী ত্যাগ করে ভাগতে থাকেন এবং শেষাবধি আরাকানের পথে এক নদীতে নৌকাডুবি হয়ে প্রাণ হারান। ভোগলিপ্সা অনেক রাজা-মহারাজার মত তাকেও যুদ্ধের জন্য সম্পুর্ন অযোগ্য ও অক্ষম করে তুলেছিল। অপরদিকে পঞ্চাশ বছরের রাজত্বকালে সম্রাট আওরঙ্গজেব প্রায় পুরো সময়টাই যুদ্ধক্ষেত্রে কাটান এবং সাফল্যের সাথে সকল বিদ্রোহ দমন করেন। সম্রাট আকবরও অমরকোটের যুদ্ধময়দানে তাঁবুর মধ্যে জন্মগ্রহন করেন এবং কঠোর সামরিক শৃংখলার মধ্যে বেড়ে ওঠেন বলেই অত অল্প বয়সে অত বিশাল মোগল সাম্রাজ্যকে সামলাতে সক্ষম হন। তার আসুরিক দৈহিক শক্তিরও পরিচয় পাওয়া যায় তার পুত্র মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের রচিত ’জাহাঙ্গীরনামা’ পুস্তকটিতে। আরো জানা যায় কেবল শৃগালসুলভ চাতুর্যই নয়, সামরিক শৃংখলার মধ্যে বেড়ে ওঠা ছত্রপতি শিবাজীর দৈহিক সক্ষমতা তাকে আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের নায়কে পরিণত করে এবং তিনি প্রবলপ্রতাপান্বিত মোগলদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সফলতার সাথে তার ক্ষুদ্র বাহিনীকে অত্যন্ত কার্যকর এক প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলেন। তাঁর সৈন্যদের নৈতিকতার মানও খুই উচ্চ ছিল বলেই ইতিহাসে জানা যায়। পক্ষান্তরে নৈতিকতার অধঃপতনের পরিনাম কি হয় তা তো আমরা ’ভেতো বাঙালীদের’ হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত, সুপ্রশিক্ষিত ৯৩,০০০ পাকিস্তানী সৈন্যের লজ্জাজনক পরাজয় ও আত্মসমর্পনের মাধ্যমে দেখলাম।
উপরের কথাগুলির তাৎপর্য বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ববহ কি না জানি না। আমাদেরও একটি দক্ষ, কুশলী ও সাহসী সেনাবাহিনী আছে। তবে আগের মত কঠোর জীবনের মধ্যে তারা আছেন কি না সেটা আম জনতা জানে না। ৫৭ জন চৌকস ও নিবেদিতপ্রান অফিসারের মর্মান্তিকভাবে নিহত হবার পর সেনাবাহিনীকে যেভাবে ’সন্তুষ্টিকরন’ করা হয়েছে তাতে দেশের মানুষ কিছুটা হলেও আশংকিত বটে। কারন পৃথিবীর যে কোন সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যখন জীবনের প্রতি মায়া ও আয়েসী জীবনের প্রতি আকর্ষণ তথা ভোগলিপ্সা বেড়ে যায় তখন তাদের পক্ষে কঠিন কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে তা তাদেরকে যত অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেই সজ্জিত করে তোলা হোক না কেন। আমাদের প্রানপ্রিয় সেনাবাহিনীকে আমাদের দেশের জনগন অন্য যে কোন দেশের সেনাবাহিনীর তুলনায় শৌর্যবীর্যে, দক্ষতা, কুশলতায় কখনো খাটো দেখতে চায় না। বর্তমানে সরকার যেভাবে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা প্রায়শঃই বলছে এবং অনুমিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা ও সামর্থ্য বাড়াতে যে ভাবে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র যোগান দিচ্ছে তাতে সরকারকে ধন্যবাদ জানানোর সাথে সাথে আমাদের প্রানপ্রিয় সেনাবাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসাবেই আমরা দেখতে চাই। জানি না আমাদের সে প্রত্যাশা কতটা বাস্তবতাসম্পন্ন।

No comments:

Post a Comment