এদেশে প্রায় সর্বক্ষেত্রেই অযোগ্যতা, অদক্ষতা, কর্তব্যকর্মে গাফিলতি, কেবল জ্বি-হুজুরী করে চাকুরী বজায় রাখা এবং সেই সাথে দুরারোগ্য দুর্নীতির দগদগে ঘা বিরাজমান। এর উদাহরন ভুরি ভুরি। রাস্তা বানানো হবে বিশ্বের সবচেয়ে অধিক ব্যয়ে কিন্তু সে রাস্তা ৬/৮ মাসের মধ্যেই খানাখন্দে পুর্ন হয়ে যাবে এবং বছরের মধ্যেই পুনরায় মেরামতের দরকার হবে। বিল্ডিং বানানো হবে কিন্তু বছর না ঘুরতেই তাতে ফাটল দেখা দেবে, পলেস্তারা খসে পড়বে, এমনকি নির্মানকালেই অনেক সময় তা মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ে কারো কারো মৃত্যুও ঘটাবে। রাস্তায় সর্বনি¤œ মানের নির্মান সামগ্রী, বিটুমিনের বদলে পোড়া মবিল, রডের বদলে বাঁশ বা বাঁশের কঞ্চি ইত্যাদি ব্যবহার করা হবে। রাস্তা বানানো হবে কিন্তু তার বাঁকগুলো হবে এক একটি মৃত্যুফাঁদ। তাছাড়া সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার বিভিন্ন জায়গাতে পানি জমবে, পানি সরে যাওয়া বা বেরুনোর কোন পথ থাকবে না। এই অবস্থা এমনকি এই রাজধানী শহরেও। রাস্তা নির্মান ও মেরামত এই দেশে এক আলাদীনের চেরাগ। হাজার টাকায় যে রাস্তা নির্মান সম্ভব, সে রাস্তা নির্মানে ব্যয় হয় লাখ টাকা। এরপর সেই রাস্তায় যখন ছোটখাট খানাখন্দ তৈরী হয় তখনই যদি তা মেরামত করা হয় তবে জনগনের বহু অর্থ বেঁেচ যেত। পাকিস্তান আমলেও দেখেছি একটি ট্রাকে কিছু বালি, পাথর, বিটুমিন ও রোডরোলার নিয়ে রাস্তার সুপারভাইজার/ইন্সপেক্টর রাস্তা পরিদর্শনে বেরুত। ছোটখাট গর্ত ইত্যাদি তাৎক্ষনিকভাবে মেরামত করে ফেলত। এটা উন্নত দেশের শহরগুলোতেও দেখেছি। কিন্তু এই দেশে রোড ইন্সপেক্টর/সুপারভাইজার আছে কি না, থাকলে তাদের কাজটি কি জানা যায় না। কারন যতদিন ঐসব ছোটখাট খানাখন্দ বড় বড় গর্ত বা পুকুর তৈরী না করবে ততদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন নড়চড় নেই। কারন বড় ধরনের গর্তগেঁড়ে তৈরী না হলে বড় রকমের ফান্ড পাওয়া যাবে না আর তার থেকে পকেট ভারী করার সুযোগও পাওয়া যাবে না। আর এসবই জনগনের সরকার (??) ও প্রশাসন অবাধে চলতে দেবে।
শহরের রাস্তার ওপরে ফুটওভারব্রিজ বানানো হবে কিন্তু তা এত উঁচুতে যে একটু কমজোর মানুষের পক্ষে তাতে ওঠার উপায় থাকবে না। এত উঁচু করার কারন? ১৭/১৮/২০ ফুট উঁচু কাভার্ডভ্যান চলাচলের জন্যই এটা করা হবে। এই কাভার্ডভ্যান কতটা উঁচু করা যাবে তারও কোন সীমা নেই। অথচ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য দুনিয়ার কোথাও বোধহয় সাড়ে চার মিটারের বেশী উঁচু ফুটওভারব্রিজ নেই।
এখানে বাসের অনুমোদিত সিটসংখ্যা কত তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। ইচ্ছামত চল্লিশ সিটের জায়গায় পঁয়তাল্লিশ/ছেচল্লিশ সিট করা হয়েছে। অধিকাংশ বাসে ঠিকমত পা-ই আঁটে না। কিন্তু কেউ দেখার নেই। অধিকাংশ বাসের ব্যাক লাইট নেই, নেই সাইড ইন্ডিকেটর। ৯৫% ভাগ বাসের বডি ছালবাকলা ওঠা, এদিকে ওদিকে টোপ খাওয়া ও বেঁকেচুরে যাওয়া বেপরোয়া ঘষাঘষি ও পাল্লাপাল্লিতে ঠেলা-ধাক্কার জন্য। ২০/২৫ বছর বা এরও বেশী পুরানো এসব বাসেরও ভাড়া ইচ্ছামত নির্ধারন করা যাতে কেবল মালিকদের স্বার্থই বজায় থাকে। এসব ক্ষেত্রে সরকারও বিআরটিএ-র ভুমিকা জমিদারের লাঠিয়াল কোতোয়ালের চেয়ে বেশী কিছু নয় কারন তারা কেবল মালিকদের স্বার্থই দেখে। জনগনের কোন মুল্য নেই তাদের কাছে।
শহরের আবাসিক এলাকায় খোলা ড্রেন থাকে এটা উন্নত বিশ্বের কোথায় আছে জানা নেই; তবে এই শহরের মডেল টাউন (??!!) নামক এলাকায়ও এটা আছে। অথচ আবাসিক এলাকায় রাস্তায় কোন ওয়াকওয়ে বা ফুটপাথ নেই। যারা এই রকম শহরের প্ল্যান করেছে, তাদের মগজে আসলে কি পোরা আছে সেটাই প্রশ্ন। যে দেশের মানুষ সুযোগ পেলেই নিয়ম-কানুন, আইন-বিধি ভঙ্গ করতে পারঙ্গম, সেই দেশে খোলা ড্রেন রেখে শহর প্ল্যানাররা কাদেরকে তুষ্ট করার চেষ্টা করেন সেটাও এক বিরাট প্রশ্ন বটে। ইদানিং হাইরাইজ ভবনগুলোর অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা নিয়ে বড় রকমের হৈচৈ হচ্ছে। এর কারন সম্প্রতি এফ, আর, টাওয়ারে অগ্নিকান্ড। এর পরপরই গুলশান ১নং মার্কেটে অগ্নিকান্ড। এখন সব হাইরাইজ ভবনের অগ্সি প্রতিরোধ ব্যবস্তা তদারক করার হিড়িক পড়ে গেছে। অথচ এই সব হাইরাইজ বিল্ডিংগুলো রাতারাতি তৈরী হয়নি। এসব বিল্ডিং নির্মানকাজে সংশ্লিষ্ট বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে কি না, সব রকমের সেফটি ব্যবস্থা আছে কি না সেসব যাদের তদারক করার কথা তারা কেউ তাদেও দায়িত্ব পালন করেনি। তারা টেবিলে বসে হয়ত কেবল পকেট ভারী করার তালেই ছিল। অথচ এখন বাড়ীর মালিকদেরকে সব কিছুর জন্য দায়ী করা হচ্ছে। সম্ভবতঃ তুঘলোকি ব্যবস্থা বোধহয় এটাকেই বলে। কিন্তু যাদের চরম গাফিলতির ফলে এতগুলো অমুল্য প্রান চলে গেল তাদের কি হবে, বা আদৌ কিছু হবে কি না সেটা কেউ জানে না।
শহরে বাড়ী নির্মান করারও কোন মাথামুন্ডু নেই। একটি আধুনিক শহর গড়তে আগে তার ইউটিলিটি সার্ভিসসমূহ নিশ্চিত করতে হয়; তার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হয়। কিন্তু সরকারের সে সব দিকে কোন ধারনা নেই। সরকার কেবল আছে বাড়ী নির্মাতাদের কাছ থেকে কতটা ট্যাক্স-ভ্যাট আদায় হলো সেটা নিয়ে। ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ নেই পানি নেই গ্যাস নেই, কিন্তু বিল ঠিকই আসবে, ক্ষেত্রবিশেষে জরিমানাও দিতে হবে; কিন্তু সেবা নামক যে দায়িত্ব ও কর্তব্য সরকারের থাকে সেটার কোন খোঁজ নেই। সেই সেবা নিতে গেলে আবার উপরিও দিতে হবে। এ সব ব্যপারে কোথাও কোন অভিযোগ করার সুযোগ নেই কারন আপনার আমার কথা কেউ শুনবে না। কারন আপনি আমি যে ”প্রজা”। যেখানে একটি স্বাধীন দেশে নাগরিকদের কথার প্রধান্য থাকার কথা, যে দেশ স্বাধীন হয়েছে সাধারন মানুষের সুখ-সুবিধা, নিরাপত্তা ও আইনসম্মত অধিকার সংরক্ষনের লক্ষ্যে, সেই দেশে এখন পাবলিক সার্ভেন্টগন ’পাবলিক মাস্টার’। যে রাজনীতিকগন দেশের সাধারন মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সংসদে গেছেন, সেই রাজনীতিকদের কাছে জনগনের কোন মুল্য নেই কারন তাদের ভোটের জন্য সেই রাজনীতিক নেতাদের অপেক্ষা করতে হয় না। তারা সংসদে গিয়ে কেবল তাদের নিজেদের ও ’মামাদের’ স্বার্থই দেখেন। জনগনের ট্যাঁকের টাকায় তাদের সবার বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধার অন্ত নেই, কিন্তু সাধারন মানুষ তাদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগের জন্য কারো কাছে ফরিয়াদ জানাতে পারে না। তাদের ট্যাঁকের টাকায় ব্রিজ-কালভার্ট হয়, দালান-কোঠা হয়; কিন্তু সেখানে যে হরির লুট হয়, দশ টাকার কাজ শত টাকা খেয়ে ফেলে, সাধারন মানুষের অশেষ দুর্ভোগ সৃষ্টি ক’রে এক মাসের কাজ এক বছর লাগায়, তাতে নেতা-নেত্রী বা আমলা-ফয়লাদের কোন মাথাব্যথা নেই, কোন জবাবদিহিতাও নেই। অথচ এই দেশকে একটি গনতান্ত্রিক, সুশাসিত ও শ্রেনীবৈষম্যহীন দেশ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা শেখ মজিবুর রহমান। আর আজ সেই বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙ্গিয়ে তার স্বপ্নের সম্পুর্ন উল্টো দিকে চলছে এই হতভাগা দেশ। সংখ্যাতাত্বিক তিলিসমাতি দিয়ে মানুষকে বোঝানো হচ্ছে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এখন ১৮০০ ডলার অর্থাৎ প্রায় দেড় লাখ টাকা। অথচ এই সেদিন খবর বেরিয়েছে দেশের মাত্র তিনজন খাণ খেলাপীর কাছে বাঁধা আছে বাইশটি ব্যাংকের মুলধন। ওদিকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে প্রকাশ দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ এখনও দারিদ্রসীমার নীচে, যাদের মাথাপিছু আয় মাসিক ষাট ডলারেরও কম। বিশ্বে এই দেশ, যেটির উন্নত বিশ্বের স্তরে পৌঁছুতে আরো ২০/২৫ বছর লাগবে বলে খোদ সরকারই বলছে, সেই দেশটিতে ধনবৈষম্য বিশ্বে সর্বোচ্চ। ধনীর সংখ্যাবৃদ্ধির হারও বিশ্বে সর্বোচ্চ। জাতীয় আয় ও প্রবৃদ্ধি অনুপাতে বিদেশে অর্থ পাচারেও এই দেশ নাকি বিশ্বে এক নম্বরে। অথচ এই দেশটি চালাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় টৈটুম্বুর এক সরকার। প্রশ্ন হলো যদি সত্যিই এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার হয়ে থাকে তবে তারা কি বঙ্গবন্ধুর চেয়েও বেশী চেতনা ধারন করে? বঙ্গবন্ধু কি এই রকম একটি দেশের কথা ভেবেছিলেন যেখানে সেই উপনিবেশিক আমলের সকল কলকব্জা সকল মেশিনারী বহাল থাকবে, বিশেষ চেতনার দোহাই দিয়ে নাগরিক ও শাসকগন সেই প্রাচীন গ্রীসের এথেন্সের মত প্লেবিয়ান ও সিনেটরদের মত বিভক্ত থাকবে; দুর্নীতি, দুষ্কর্ম, লুটপাট, খুন-ধর্ষণ, মাদকের রমরমা ব্যবসা ইত্যাদি সগৌরবে বহাল থাকবে? এসবই যদি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বিষয় হয়ে তাকে তবে আর কিছু বলার থাকে না। কিন্তু তা যদি না হয় তবে বঙ্গবন্ধুর কন্যাকেও হয়ত ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এক সময়। কারন কোন কিছুই এ নশ্বর পৃথিবীতে চিরস্থায়ী নয়।
একথা সর্বজনস্বীকৃত যে শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। কিন্তু সেই শিক্ষাকে, বলা চলে পুরো শিক্ষাব্যব¯থাকে লেজেগোবওে অবস্থায় আনা হয়েছে তার মধ্যে নোংরা রাজনীতি ঢুকিয়ে। এই অতিসম্প্রতি একজন প্রখ্যাত চেতনাসমৃদ্ধ সাংবাদিকও প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারের রাজনৈতিক চেতনায় ’ওভারস্যাচুরেটেড’ ব্যক্তিবর্গকে উপাচার্য পদে নিয়োগ কেন? তাদেরকে তো এমপি মন্ত্রীও করা যেতে পারে। উক্ত প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে শিক্ষাব্যবস্থাকে কোথায় নামিয়ে আনা হয়েছে। একজন শিক্ষক সবার শিক্ষক। তাঁর কাছে কোন শিক্ষার্থীই অপছন্দের হতে পারে না; তিনি কোন শিক্ষার্থীর প্রতিই পক্ষপাতমুলক আচরন করতে পারেন না। তিনি সবারই নমস্য। কি›তু দলবাজ শিক্ষকের কাছে কি সেটা আশা করা যায়? একইভাবে স্কুল-কলেজে রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকে সভাপতিপদে নিয়োগ দিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্তার মেরুদন্ডকেই ক্যান্সারাক্রান্ত করে ফেলা হয়েছে। বিশ্বে কোন দেশ যখন বিশেষ করে শিক্ষাব্যব¯থা ও বিচারব্যব¯থার মধ্যে রাজনীতি ঢুকিয়ে ফেলে, তখন আর যাই হোক একটা সুস্থ জাতি আশা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। রাজনীতি সত্যমিথ্যা অনেক কিছুকেই আত্মস্থ করে; কিন্তু শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থায় মিথ্যার কোন স্থান থাকতে পারে না। থাকলে যা হয় সেটাই আমাদের এই দেশে হয়েছে। লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত (?) বেকার জনসম্পদের পরিবর্তে জন-দায়ে পরিনত হয়েছে। অথচ শিক্ষা নিয়ে আমাদের আঁতেল সমাজ ও নেতানেত্রীরা বড় বড় বুলি আউড়েই যাচ্ছেন।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনালয় ও দপ্তরে যারা উঁচু উঁচু পদে আছেন তাদের দায়-দায়িত্ব সঠিক কি, সেটা জানা মুশকিল। কারন রাস্তাঘাট, দালান কোঠা নির্মান, বিদ্যৎ উৎপাদন ও বিতরন ব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রন ও বাঁধ নির্মান, আইন ও বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে যারা আছেন তাদের কোন জবাবদিহিতা নেই। যারা সরকারী মিল কলকারখানার মাথায় বসে আছেন তাদেরও কোন জবাবদিহিতা নেই। জাতীয় এয়ারলাইনস বাংলাদেশ বিমান বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। পুরো ব্যাংক ব্যবস্থা একেবারে নড়বড়ে; লাখো কোটি টাকা লুট-লোপাট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এসব জায়গায় অপচয়, অপব্যয়, লোকসান ইত্যাদি থামানোর কোন প্রকৃত উদ্যোগ দেখা যায় না; বরং এই সব অনিয়ম, অপচয়, লোকসানের দায় পাবলিকের উপর কর বাড়িয়ে পুরন করা হয়। যারা এসবের জন্য দায়ী তাদের কিন্তু বেতন-ভাতা সুযোগ-সুবিধার কোন কমতি কখনো হয় না।
পুর্ব প্রসঙ্গে ফিরে যাই। একথা সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাুও স্বীকার করে যে দেশে প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ যান্ত্রিক যানবাহন আছে যার মধ্যে মটরকার, বাস-ট্রাক, মিনিবাস, হিউম্যান হলার ইত্যাদির সংখ্যা প্রায় ২৫/২৬ লাখ। সেই সাথে এটাও বলা হচ্ছে যে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত ও আধা প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত চালক আছে বড়জোর ১৮/১৯ লাখ। তাহলে ৭/৮ লাখ মটর যান কারা চালাচ্ছে? নিশ্চয়ই প্রশিক্ষনবিহীন হেলপার-কন্ডাক্টর-ক্লিনার। যেমন সেদিন ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার নায়ক বাসটির চালক ছিল একজন ক্লিনার। সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাই জানে যে দেশে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত বাস-ট্রাক চালকের বিরাট অভাব রয়েছে। কিন্তু এটা জানা সত্বেও সরকারের বানিজ্য ও অর্থ মন্ত্রনালয় ঢালাওভাবে বাস-ট্রাক-হিউম্যান হলার ইত্যাদি আমদানীর অবাধ সুযোগ দিচ্ছে। তারা এটাও জানে যে এত এত মটরযান চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট অবকাঠামো নেই দেশে। তা সত্বেও এই কর্মটি তারা করেই যাচ্ছে। এই সব যানবাহন রাস্তায় চর্লা জন্য যারা ক্লিয়ারেন্স দেয়, সেই বিআরটিএ-ও সমানে যে কোন রকম যানবাহনের জন্য চলাচলের লাইসেন্স উদারভাবে বিতরন করছে। এত লাখ যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস ইত্যাদির জন্য যে তদারকির দরকার তা করার জন্য তাদের জনবল কতটা সেটা কোন বিবেচনায় নেই কারো। সরকারের বা বাস-ট্রাক মালিকদেরও কোন উদ্যোগ নেই দেশে আরো দক্ষ চালক বানানোর জন্য যথেষ্ঠ সংখ্যক মটর ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার খোলার। তাহলে ১৮/১৯ লাখের উপরে যে সব মটরযান, সেগুলো চালাবে কারা? নিশ্চয়ই মন্ত্রী-সান্ত্রী, এমপি বা আমলা-ফয়লারা নয়? কিন্তু তবুও এই অরাজকতা কাদের স্বার্থে চলছে? যারা এদেশে তাদের মটরযানের ব্যবসা আরো আরো বিস্তৃত করতে মরিয়া তারা নয়তো? সব দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয়, সাশ্রয়ী ও জনবান্ধব যে রেল ব্যবস্থা, সেটা দেশে চালু করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার যে আন্তরিক উদ্যোগ, সে সবেও যে সব বাধাবিঘœ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তার পিছনেও ঐ মহলটি তৎপর নয়তো? এসব বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে কেবল দক্ষ চালকের অভাব, অসংখ্য মটরযান, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, হেলপার-ক্লিনারের গাড়ী চালানো ইত্যাকার বিষয়ে মায়াকান্না করে কোন লাভ হবে কি?
যে কোন উন্নত দেশে রাস্তায় যানবাহন নামানোর আগে বিবেচনায় নেওয়া হয় কিভাবে চলমান অবকাঠামোগত পরিস্থিতিতে কতসংখ্যক মটরযান মোটামুটি সহজভাবে কত সংখ্যক যাত্রীকে নিরাপদে পরিবহন করতে পারে। যেমন সিংগাপুরে শুনেছি যে কেউ ইচ্ছা করলেই মটরকার রাস্তায় নামাতে পারে না। প্রতি বছর সেখানে রাস্তার ক্যাপাসিটি বিবেচনায় নিয়ে যতসংখ্যক যানবাহন নামানো হয়, তত সংখ্যক রাস্তা থেকে উঠিয়েও নেওয়া হয় সেসব যানের বয়স বিবেচনা করে। সম্ভবতঃ তিন বা চার বছরের বেশী বয়সী গাড়ী সেখানে চলতে দেওয়া হয় না। এজন্যই সেখানে এমআরটি (মাস র্যাপিড ট্র্যান্সপোর্ট) ব্যবস্থা এতটা গুরুত্ব সহকারে বাস্তবায়িত করা হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে একটি লোকালিটিতে কতসংখ্যক মানুষ বাস করতে পারবে তারও সীমা নির্ধারিত থাকে। যে কেউ ইচ্ছা করল আর অমনি কোনদিকে না তাকিয়ে যে কোন জায়গায় বিরাট বাড়ী ফেঁদে ফেলল, এরকম হবার সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের দেশে এসবের কোন বালাই নেই, কারন একটাই। যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন তাদের এসব বিষয় নিয়ে ভাবার কোন সময় বা ইচ্ছা কোনটাই নেই। তারা কেবল আছেন ’কিসে কড়ি আসে দু’টো’ - এই চিন্তায়। দেশকে সম্ভাব্য স্বল্প সময়ে উন্নতির স্তরে পৌঁছানোর জন্য যে ধরনের সরকার ও প্রশাসন সে ধরনের সরকার ও প্রশাসন যদি পাওয়া যেত তবে আজকের স্তরে পৌঁছাতে অর্ধ শতাব্দী লাগত না।
তাই বলতেই হয় যে কেবল চালক বা মটরগাড়ীর ফিটনেসের ব্যাপারই নয়, আরো অনেকগুলো ফ্যাক্টর এই সব অব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা ও প্রানহানির জন্য দায়ী। এক্ষেত্রে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা স্ব-স্ব জায়গায় তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার ফলেই যাবতীয় সমস্যার উদ্ভব এবং জনভোগান্তি। অবশ্য সে দায়িত্ব ও কর্তব্য কি এবং তা পালন করার জন্য কি ধরনের যোগ্যতা থাকা দরকার সেটা যেহেতু এদেশে অধিকাংশই - সে আমলাই হোক আর রাজনীতিকই হোক - জানে বলে মনে হয় না, তাই কোন পুলটিশমার্কা ফর্মুলায় এই সমস্যার সমাধান করার আশা করা নিতান্তই আহম্মকি ছাড়া আর কিছু নয়। --- ২৮/৩/২০১৯ইং
No comments:
Post a Comment